‘অনেক কিছুই বদলেছে, বদলায়নি লাল-হলুদ রংটা’! তাঁবুতে স্মৃতিমেদুর মাজিদ

0
147

সায়ন মজুমদার: ‘মাজিদ, মাজিদ, মাজিদ’! কালো রঙের গাড়িটা লেসলি ক্লডিয়াস সরণির শেষ প্রান্তে পৌঁছনো মাত্রই শব্দব্রহ্ম যেন আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেল। যে কয়েকশো লাল হলুদ সমর্থক মাঠে এসেছিলেন, তাদের ৯৯ শতাংশ তার খেলাই কখনও দেখেননি। তবুও তারা এসেছিলেন ময়দানের বাদশাকে একবার চাক্ষুষ করতে। তুমুল বৃষ্টি উপেক্ষা করেই ঠায় দাঁড়িয়েছিলেন তারা। মাজিদ বিসকরের পা গাড়ি থেকে বেরোতেই পায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন জনা ত্রিশেক সমর্থক। তাদের আবেগকে সামাল দিতে তখন কালঘাম অবস্থা কর্মকর্তাদের।

সমর্থকদের এই আবেগ দেখে অবাক স্বয়ং মজিদ। আনুষ্ঠানিক সাংবাদিক সম্মেলনে বারবার সেই কথাটাই বলছিলেন তিনি। ‘এখনো উন্মাদনা থাকবে ভাবিনি। এয়ারপোর্টের বাইরে এসে এত লোক দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম’ , বলছিলেন বাদশা। কথা অনেকটাই আস্তে বলেন। পাশে বসা জামশিদ নাজিরি তার হয়ে স্পষ্ট করে উত্তর দিচ্ছিলেন মজিদের হয়ে।

প্রায় তিন দশক পর কলকাতায় পা দিলেন। কী পরিবর্তন হয়েছে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের জানতে চাওয়া হলে মজিদ বলেন, ‘অনেক পরিবর্তন হয়েছে। গ্যালারি, ক্লাব একদম নতুন। শুধু লাল হলুদ রংটাই একমাত্র বদলায়নি। এখানে আসতে পেরে খুব ভালো লাগছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি কলকাতায় হয় তো ছিলাম না। কিছু খবর পেতাম। কলকাতার সোনালী মুহূর্ত কখনও ভুলবো না।’

নিজের কেরিয়ারের সেরা কিছু মুহূর্তের কথা জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘মহামেডানের বিরুদ্ধে রোভার্স কাপের ফাইনালে গোল সেরা গোল। দার্জিলিং কাপে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে ম্যাচটা সেরা ম্যাচ। আর আমার সময়ে সুব্রত ভট্টাচার্য সেরা ডিফেন্ডার ছিল।’

বয়স ষাট ছাড়িয়েছে। অনেক কিছুই অসংখ্য স্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছে। তবু এখনও মনে আছে মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, মহম্মদ হাবিব, সুধীর কর্মকার, পেমনাথ ফিলিপ, হরজিন্দর সিংয়ের খেলা।

মজিদ জানান, ‘ইরানে ফিরে যাওয়ার পর বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। পরে বাচ্চাদের ফুটবল শেখানো শুরু করি। বড়দের নিয়ে দল গড়ে টুর্নামেন্ট আয়োজন করি। এতদিন ইস্টবেঙ্গলের ডাকের অপেক্ষা করেছি, ডাক পাওয়ার পর অবশ্য একটু দ্বিধা ছিল। কিন্তু জামশিদ, মনারা (মনোরঞ্জন) ফোন করে ডাকে। সেই ডাক আর উপেক্ষা করতে পারিনি। এখনও ১৬ আগস্টের (১৯৮০) ঘটনা মনে আছে। দুই দলই (মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল) ভালো ফুটবল খেলছিল। হঠাৎ গ্যালারিতে গন্ডগোল, তখন বেশি কিছু ভাবিনি। খেলায় মন ছিল। পরে বাড়ি ফেরার পর পুরো ঘটনা জানতে পারি। খুব খারাপ লেগেছিল। এখনও মনে পড়লে খারাপ লাগে।’

মাজিদ বলে চলেন, ‘প্রথমবার ক্লাবের হয়ে খেলতে নামার সময় ভাবিনি এত সমর্থক আসবে। ধীরে ধীরে বুঝতে পারি ক্লাবের সমর্থকদের আবেগ কতটা। আমরা তো ভারতে পড়তে এসেছিলাম। কখনও ভাবিনি ফুটবল নিয়ে এত দূর এগোব। এখন আমাদের দেশের সবাই ইউরোপে খেলতে চায়, ওখানে পয়সা বেশি। ইরানের ফুটবলের উন্নতি হয়েছে। সেই সময় ১৬টা দল ওয়ার্ল্ড কাপ খেলতো। এখন অনেক বেশি দেশ খেলে। ইরান দল অনেক পরিণত।’

মেসি না রোনাল্ডো, কে সেরা তা জিজ্ঞাসা করলে এক মুহূর্ত না ভেবেই উত্তর, ‘সব দিক দিয়ে বিচার করে মেসি।’

তাঁর কলকাতা ত্যাগ নিয়ে অনেক কথাই শোনা যায়। সে সব নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, ‘আমরা ফুটবলার। সবাই খেলতে ভালোবাসি। খেলার বাইরের রাজনীতি আমাদের স্পর্শ করে না।’ এছাড়া বর্তমান ইস্টবেঙ্গল দলকে শুভেচ্ছাও জানান তিনি। সবশেষে কিছুক্ষণের জন্য মাঠেও আসেন। সমর্থকদের সঙ্গে হাত মেলানোর পাশাপাশি বল পায়ে একটা শটও মারেন। আর সেই মুহূর্তেই গ্যালারি থেকে সেই আশির দশকের মতো শব্দব্রহ্ম ‘মাজিদ, মাজিদ, মাজিদ’।

ছবি- গৌতম ভট্টাচার্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here