মহানগর ওয়েবডেস্ক : আদি বনাম নব্য, পুরাতনের সঙ্গে নতুন মুখদের লড়াই ও মন কষাকষি। এই ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের বিগত কয়েক বছরের মাথা ব্যথার মূল কারণ। যার জন্য বারবার জেলা নেতৃত্বদের ধমক দিতে হয়েছে তৃণমূল নেত্রীকে। কিন্তু তাতেই কিছু লাভ হয়নি। এরই সঙ্গে দেখতে দেখতে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন ২০২১। ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে বিজেপি, তার উপর আমফান, রেশন দুর্নীতি ও দলের শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের অভাব ভাবাচ্ছিল দলনেত্রীকে। সেই কারণেই এদিন কালীঘাটে তৃণমূলের সাংগঠনিক স্তরে আমূল রদবদলের সিদ্ধান্ত নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেইমতো এদিন যুব নেতা ও আদি নেতাদের সংমিশ্রণে ও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ রদবদল করে ২১-এর নির্বাচনের আগে দলকে ঝাঁকাতে চাইলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

এদিন বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলনেত্রী। যেমন, তৃণমূলের যে জেলা পর্যবেক্ষক পদ ছিল তা তুলে দেওয়া হল। এরই সঙ্গে নতুন পদ হিসেবে আনা হল চেয়ারম্যান পদ। একাধিক জেলায় যেখানে আদি এবং নব্যের লড়াই সেখানে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি যুক্ত নেতাকে বিশেষ দায়িত্বে নিয়ে আসা হল। যেমন উদাহরণস্বরূপ- হাওড়া সদরের জেলা সভাপতি পদে থাকা মন্ত্রী অরূপ রায়কে সরিয়ে আনা হল লক্ষ্মীরতন শুক্লকে। অপরদিকে রাজীব ব্যানার্জী হাওড়ার আরও এক নেতা, যার সঙ্গে অরূপ রায়ের দ্বন্দ তাঁকে নিয়ে আসা হল রাজ্য কমিটিতে। এই বিষয়ে রাজনৈতিক মহলের ধারণা, এর দ্বারা দলনেত্রী জেলায় স্বচ্ছ ভাবমূর্তিকে নিয়ে এলেন আর আদি ও নব্যেরে দ্বন্দকে মেটানোর চেষ্টা করলেন। এছাড়াও সদর হাওড়ায় দুটি বিধানসভাতে অবাঙালি ভোটের একটা প্রভাব রয়েছে সেটাকেও নেত্রী গুরুত্ব দিয়েই সভাপতি পদে এনেছেন লক্ষ্মীকে।

রাজনৈতিক মহলের কাছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল ছত্রধর মাহাতোর নাম। যিনি কিনা আনুষ্ঠানিকভাবে তৃণমূলে যোগদান করেননি। কিছুদিন আগেই জেল থেকে মুক্তি পেয়েই বুথ স্তর ঝাড়গ্রামে রাজ্যের শাসক দলের হয়ে কাজ করছিলেন। তাঁকে আনা হয়েছে রাজ্য কমিটিতে। বিধানসভা ভোটকে সামনে রেখেই দলনেত্রী রাজ্য কোর কমিটি, স্টিয়ারিং কমিটি, সমন্বয় কমিটি ও দলের রাজ্য কমিটির সৃষ্টি করেছেন। যার মধ্যে  একটি রাজ্য কমিটি গড়েছেন তিনি যাতে রয়েছেন ছত্রধর মাহাতো। এই কমিটিতে রয়েছেন অরূপ বিশ্বাস, ববি হাকিম, সুব্রত বক্সী, শুভেন্দু অধিকারী । সেই কমিটিতে এবার বড় মুখ ছত্রধর মাহাতো। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত প্রিয় জায়গা হল জঙ্গলমহল। কিন্তু সেই অঞ্চলেই গত লোকসভা নির্বাচনে ভরাডুবি হয় তৃণমূলের। আর সেই কথাই ভাবাচ্ছিল নেত্রীকে। তাই জঙ্গলমহলকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে ছত্রধর মাহাতো, চুড়ামণি মাহাতোর মত নেতাকে রাজ্য কমিটিতে নিয়ে এলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

এরই সঙ্গে ৪৫ বছরের বয়সের নীচে একাধিক নেতাকে জেলার সভাপতি করে বিশেষ দায়িত্বে এনেছেন মমতা। মহুয়া মৈত্র, শ্যামল সাঁতরা, পার্থপ্রতিম রায়ের মত নতুন মুখকে জেলার দায়িত্বে এনে বিশেষ নজির গড়েছেন তিনি। সূত্রের খবর, উত্তর ২৪ পরগনা হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে প্রেস্টিজ ফাইট। কারণ সেই জেলায় বিজেপির হয়ে রয়েছেন তৃণমূলের প্রাক্তন সেকেন্ড ইন কম্যান্ড বর্তমানে বিজেপি নেতা মুকুল রায়, তার পুত্র শুভ্রাংশু রায় ও সাংসদ অর্জুন সিং। তাদের সঙ্গে লড়াইয়েও ২০২১ বিধানসভাতে উত্তর ২৪ পরগনা থেকে বিশাল আসন পাওয়ার লক্ষ্যে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তর ২৪ পরগনারকে জেলা হিসেবে কাজের সুবিধার্থে বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন দলনেত্রী। জেলা সভাপতি জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের সঙ্গে ওই জেলায় চেয়ারম্যান করা হয়েছে পানিহাটির বিধায়ক নির্মল ঘোষকে। এরই সঙ্গে জেলাতে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যুব নেতা – বিধায়ক পার্থ ভৌমিক ও দীনেশ ত্রিবেদী সহ একাধিক নেতাকে।

আজকের তৃণমূলের এই রদবদলের মূল লক্ষ্য আগামী ২০২১ এর বিধানসভার ভোট। একদিকে গতকাল থেকেই অমিত শাহের নেতৃত্বে দিল্লিতে বিজেপির রাজ্যের নেতা ও সাংসদরা বাংলা দখলের ব্লু প্রিন্ট তৈরি করছেন; তখনই রাজ্যের বর্তমান শাসক দলের এই রদবদল ও নেত্রীর ঝাঁকানি কী ফল দেয় সেটা আগামীদিনে সময় বলবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here