ঢাকঢোল না পিটিয়েই কলকাতা ফুটবলে একটা বিপ্লব করে ফেলেছিলেন অঞ্জন মিত্র

0
anjan mitra

কুণাল দাশগুপ্ত: আজ বাগানে ফুল ফুটবে না। কোনও অঙ্কুর মাথাও তুলবে না। প্রজাপতি যত, আরও একদিন হয়তো গুটিপোকা হয়েই থাকবে। কারণ, অঞ্জন আর বাগানে আসবেন না। বিবর্ণতার আচ্ছন্নে থাকতে হবে সবুজ-মেরুণ তাঁবুকে, কিছুদিন তো বটেই।

চলে গেলেন মোহনবাগানের প্রাক্তন সচিব, ময়দানের নিপাট ভদ্রলোক অঞ্জন মিত্র। বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। বেশ কিছুদিন ধরেই অঞ্জন মিত্র কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন। সমস্যা ছিল তাঁর হৃদযন্ত্রেরও। এর আগে দু’বার তাঁর বাইপাস সার্জারিও হয়। শুক্রবার ভোর তিনটে পনেরো নাগাদ স্তব্ধ হয় তাঁর হৃদযন্ত্র।

১৯৯৫ সালে মোহনবাগান ক্লাবের সচিব হন ধীরেন দের উত্তরসূরি অঞ্জন মিত্র। এমন একটা সময়ে মোহনবাগানের মসনদে বসেন, সামন্ততান্ত্রিক অন্ধতা কলকাতা ফুটবলে রমরমিয়ে চলছে। কর্পোরেট ভাবনা কল্পনার চৌকাঠ পর্যন্ত আসেনি। ব্যক্তি-পূজায় আচ্ছন্ন ফুটবলের মক্কা। মোহনবাগানও তার ব্যতিক্রম ছিল না। অত্যন্ত দূরদর্শী অঞ্জন মিত্র বুঝেছিলেন, এই ভাবধারা বজায় থাকলে গঙ্গার সান্নিধ্যে আসতে খুব বেশিদিন সময় নেবে না ক্লাব। ঢাকঢোল না পিটিয়েই একটা বিপ্লব করে ফেললেন তিনি। কী করলেন? স্পনসর হিসেবে নিয়ে এলেন টাটাকে। সম্ভবত তিনিই প্রথম জার্সিতে কোনও ব্যবসায়িক কোম্পানির জায়গা নির্দিষ্ট করেন। এর পরই কলকাতা ফুটবলের জার্সিতে ঢাকা, ইমামি, খাদিমদের দেখা যেতে লাগল।

ময়দানে পা রেখেই সুপার-ডুপার হিট গেল টুটু-অঞ্জন জুটি। অনেকটা ইস্ট বেঙ্গলের জীবন-পল্টুর মতই। বলতে গেলে, এই জুটির হাত ধরেই মস্তিষ্কের জঞ্জাল সাফ হতে শুরু করেছিল সবুজ-মেরুণে। টুটু-অঞ্জন মানে সাফল্যের স্বরলিপি, সেদিনের মুম্বইয়ের শঙ্কর-জয়কিষণ। শুধু কলকাতাই নয়, ভারতীয় ফুটবলের হেড কোয়ার্টারেও কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছিলেন অঞ্জন মিত্র। প্রশ্ন তুলেছিলেন লাইসেন্স-বিহীন ফ্র‌্যানচাইজির টুর্নামেন্ট আইএসএল-এর যৌক্তিকতা নিয়ে। শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন খোদ ফিফা দপ্তরেও।

আরও একটি কাজের জন্য ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন অঞ্জন মিত্র। পোর্ট ট্রাস্ট-ইস্টার্ন রেলের বিতর্কিত ম্যাচ ঘিরে ফুটবলার কুমারেশ ভাওয়ালের গটআপ-বিরোধী মন্তব্যকে সম্মান জানিয়েছিলেন তিনি। নিয়ে এসেছিলেন মোহনবাগানে, শেষ ম্যাচে ক্যাপ্টেন-ব্যান্ড তুলে দিয়েছিলেন তাঁর হাতে। অঞ্জন মিত্রর মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর শোকের ছায়া নেমে আসে কলকাতা ময়দান চত্বরে। শোকপ্রকাশ করে ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব-কর্তা রাজা গুহ বলেছেন, ‘মহান ব্যক্তিত্ব উনি। দীর্ঘদিন খেলাধুলার জন্য সময় ব্যয় করেছেন, মোহনবাগান ক্লাবের জেনারল সেক্রেটারি ছিলেন। ওঁর মৃত্যুতে বড় শূন্যতা সৃষ্টি হল। আমরা খুবই শোকাহত।’

প্রিয় বন্ধুর এই প্রয়াণে ভেঙে পড়েছেন টুটু বসুও। এক বার্তায় তিনি জানান,

‘এটাই জীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক সকাল আমার জন্য!‌ অঞ্জন নেই ভাবাও আমার পক্ষে অকল্পনীয়। আমার কোনও ভাই–বোন নেই। বাবা বলতেন তাঁর দুই ছেলে। টুটু–অঞ্জন। এই পরিবারেই আমরা বড় হয়েছি। টুটু–অঞ্জন একে অন্যের পরিপূরক। আমাদের কখনও আলাদা করা যায়নি। যাবে না। সেই স্কুল থেকে শুরু। আমাদের বন্ধুত্বের ইনিংস এখনও অটুট। অঞ্জনের শরীরটা হয়ত রইল না। কিন্তু ও থেকে গেল আমার অন্তরের অন্তরস্থলে। তবে ওকে শুধু বন্ধু বলি কেন?‌ অঞ্জন আমার ছোট ভাই। সেই ভাই ক্লাবের সুখে–দুঃখে আমার পাশে আর থাকবে না হয় নাকি!‌ অঞ্জন ছাড়া যেমন টুটু হয় না। টুটু ছাড়া অঞ্জন হয় না। মোহনবাগান ক্লাবে অঞ্জনের যা সাফল্য, তার পিছনে টুটু রয়েছে। টুটুর সাফল্যের পিছনে ঠিক ততটাই অঞ্জন। যেখানে যাচ্ছিস, ভাল থাকিস। শান্তিতে থাকিস।’‌

ক্লাব তাঁবুতে আর দেখা যাবে না অঞ্জন মিত্রকে। তবু মোহনবাগান মাঠের সবুজ ঘাসে কান পাতলে শোনা যাবে রবি ঠাকুরের সেই অমরসৃষ্টি, আসব-যাব চিরদিনের সেই আমি, তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে…।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here