post edit

সৈকত মিস্ত্রী: একটি আমন্ত্রণে যেতে হয়েছিল বাঁকুড়ার রাঙামাটির গঙ্গাজলঘাঁটি এলাকায়। আদিবাসী বাচ্চাদের একটি উপস্থাপনা। তার সাথে আরও আনুষঙ্গিক পর্বও ছিল। জানতাম না। গঙ্গাজলঘাঁটির একটি অবৈতনিক কোচিং স্কুল পার করে যেতে হল বনগ্রাম অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে। একটা হরীতকী গাছের নিচে শানবাঁধানো চাতালে বসেছিলেন কয়েকজন। শীতের অলস রোদে মাঠে চট বিছানো। তার উপর বসে আছেন অনেকে। ওদের শীতপোশাক আর কিছু সামগ্রী বিতরণ করা হবে। তখনও বেশি লোক আসেননি। অল্প কয়েকজন অপেক্ষা করছেন।
হরীতকী তলায় যে দু’-একজন ছিলেন তাদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলাম। খালি পা, পারিপাট্য-বর্জিত লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম–‘জব কার্ড আছে?’ তিনি জানালেন– ‘হ্যাঁ।’ বললাম, কতদিন কাজ হয়েছে? এর উত্তরে তার স্পষ্ট জবাব, ‘একদিনও না।’ জানলাম, তার জীবিকা চাষবাস। সাঁওতাল পাড়ায় থাকেন। তাদের কাজের দাবির কথা পঞ্চায়েতকে বলেন কি না, জানতে চাইলে আরও কয়েকজন একসঙ্গে জানালেন– ‘না, সেটা জানানো হয় না। ওইটা আমাদের দোষ।’

তিনি টোকেন পেয়েছেন। তাকে কম্বল দেওয়া হবে। নভেম্বর মাস পার করে ডিসেম্বরে পড়েছি। মনে পড়ল, কয়েকদিন আগে অজিতনারায়ণ বসুর মৃত্যুদিন গেল। সারাজীবন গ্রামে বসে গ্রাম পরিকল্পনার কথা বলেছেন। আর স্বনির্ভরতার কথা। গুরুত্বটা টের পেলাম। রাস্তার ওপারেও আরেকটা সাঁওতাল গ্রাম। সব মিলে গ্রামে ৫৮টি ঘর। ছেলেরা শিক্ষিত হয়েছেন। তারা কেউ চাষাবাদ করেন না। বাইরে কাজে যান। কী কাজ? উত্তরটা এল তীব্রভাবে– ‘রাজমিস্ত্রি বা তার লেবারি করতে।’
শানবাঁধানো চাতালে খাটো ধুতিপরা আদুর পায়ের বৃদ্ধ লোকটি দশরথ মূর্মু। জানতে চাইলাম, তার কার্ড আছে কি না? তিনি বললেন, ‘না।’ তিনি সরকারি লোক। পিডব্লিউডিতে মাটা কাটার কাজ করতেন। এখন তার অবসর। তার অফিসার উঁচু জাতের। মাঝি। কথা এগোতে থাকে। আরও লোকজন জড়ো হয়। একজনকে জব কার্ডের কথা বলায় তিনি জানান, তারও কার্ড আছে। কিন্তু কাজ হয় না। পঞ্চায়েত প্রধানের নাম বাপ্পা সিং। মানকোরে থাকে। তার ভাল নাম এদের জানা নেই।

পঞ্চায়েত কোনও কাজ করে না। এলাকার ছেলেরা লেখাপড়া করছে। তাদের কোনও চাকরি নেই। পনেরো বছর আগে বনগ্রাম স্কুলের মাঠে হস্টেল তৈরির কাজ শুরু হয়। আগের সরকার শেষ করেনি। বর্তমান আমলে সেটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত। একটা আইসিডিএসের নীল-সাদা বাড়ি হয়েছে। তাতে কয়েকজন কাজ করেন। আগের সরকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের তুলনা করায় ওদের মতে, ‘দিনকাল আরও খারাপ। আগেও চুরি হত। চুরির সীমাও ছিল। এখন সব চোর। চুরির কোনও সীমা নেই।’
কোনও কাজ নেই। চাকরি নেই। দু’একটা চাকরি এলে মেম্বার ও প্রধানরা তাদের আত্মীয়স্বজনদের দিয়ে দেন। জিজ্ঞেস করতে তারা জানালেন, আগে গঙ্গাজলঘাঁটি গোবিন্দধাম পঞ্চায়েতে তারা যেতেন। প্রধান চার-পাঁচজনকে নিয়ে মিটিং করতেন। এখন প্রধানের কাছে গেলেই, দরজার বাইরে দেখলেই প্রধান বাজখাঁই গলায় চেঁচান– ‘এখানে এসেছিস ক্যান?’ সুতরাং, অভিযোগ কে শুনবে? এসব নিয়ে কেউ কিছু বলেন না? জিজ্ঞেস করায় ধীরেন বাউরি বলেন– ‘কে বলবে। কিছু বললে পুলিশ দিয়ে কেস দিয়ে দেবে। মারবে।’

এবার কাকে ভোট দেবেন? প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে এতক্ষণ ধরে কথা বলা লোকটি জানান– ‘সেটি এখন বলা যাবে না। কাজ নেই, চাকরি নেই। শুধু মুসলমান বাড়ছে। সরকার তো ৯০ শতাংশ মুসলমান করেছে।’ বললাম, মুসলিম তো ২৯-৩০ শতাংশ। লোকটির জবাব, ‘ও তো একই কথা।’ মোদীর কথা জানতে চাইলে তিনি আরও গলা চড়ালেন– ‘মোদী বলেছেন, বাঙাল খেদাও হবে। সব বাঙাল তাড়াবে। মুসলমান তাড়াবে।’ বললাম, বাঙাল তাড়ালে কি সমস্যা মিটবে? তার জবাব, ‘বাঙালরা চলে গেলে সমাধান হবে। আমাদের ছেলেরা সুযোগ পাবে। মোদী ঘর দিয়েছে। এ সরকার কী করেছে?’ আর তিনি কিছু বললেন না। চলে গেলেন। তার নাম জানতে চাইলে অন্যরা বলেন, বামাপদ ধীবর। কাওরাপাড়ায় থাকে। পাশের পুকুর লিজ নিয়ে মাছ ধরে।
এনআরসি হলে সবাই কাগজপত্র দেখাতে পারবেন? জানতে চাওয়ায় ধীরাজ বাউরি বললেন, ‘আগে নীলমাধবের ঘর ছিল। উয়ার কাগজ, রেকর্ড আছে। সেখান থেকে ৫৮ ঘর হয়েছে।’ এরপর আশার কথা শোনালেন ধীরেন, ‘একই বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু মুসলমান, মহাজন বলেছেন। আমরা সাঁওতাল। ওয়ার মতো বলি না। সবাই শান্তিতে মিলেমিশে থাক। অশান্তি ভাল না।’

‘বাঙাল তাড়ালে সব সমস্যা মিটবে না। এতদিন যারা বাস করছেন এদেশে, তাদের তাড়ালে, তারা কোথায় যাবেন?’ বৃদ্ধ বাউরি লোকটি বলছিলেন। তার সহৃদয়তায় চোখে জল এল। তারা পরিবেশ, গাছ নষ্ট করেন না। একবার চাষ হয়। এবারে বর্ষায় বৃষ্টি হয়নি। ভাদ্রের বর্ষায় চাষ কম হয়েছে। তিনি টোকেন পেয়েছেন। কম্বল পাবেন। শান্তিতে থাকবেন। কিছুক্ষণ পরে জাইলো চেপে ধোপদুরস্ত পোশাকের এক সন্ন্যাসী এলেন। দারিদ্র্যের আদর্শ নিয়ে তাঁর বক্তৃতা শুরু হল। বাচ্চারা আপনমনে কথা বলছে। বিরক্ত হলেন সাধুজি।
কিছুক্ষণ পরে দান নিয়ে ওরা ফিরে গেলেন। আত্মনির্ভরশীলতা আর সাবলম্বী গ্রাম পরিকল্পনার বিপরীতে হেঁটে আর একদল নিপীড়িত দেশবাসীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ নিয়ে কোনও মতে ওরা বাঁচবেন। কুৎসিত ক্ষমতাতন্ত্রকে প্রশ্ন নয়, পারস্পরিক বিদ্বেষ-বিষ নিয়ে শাসকেরা চলবে। লাল জামা গায়, নীল জামা গায়। রাজা বদলাবে। এই মুর্মু, ধীবরদের জীবন এই পথে বদলাবে না! পড়ে থাকবে ক্ষোভ, ঘৃণা আর বিদ্বেষ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here