telkupi

Highlights

  • এত পরিদর্শন, এত আলোচনা তবু ১৯৫০-১৯৬০ সালে তোলা কোনও ছবি পাওয়া যায় না। সেই ১৮৭২ সালে তোলা বেগলার সাহেবের ছবিগুলিই সম্বল
  • হাজার বছরের বাংলার ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল সংস্কৃতির বীরত্ব, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, শিল্প-সংগীত শুধু নীরবে জলের তলায় শুয়ে আছে
  • বড়রা গ্রামপঞ্চায়েতের অন্তর্ভুক্ত তেলকূপি গ্রামের আয়তন বর্তমানে ৬৫২.৮৩ হেক্টর। বর্তমানে মাত্র ৮১টি বাড়িতে ৫১০ জনের বাস
  • দামোদরের পারে তেলকূপি ঘাটে যখন পৌঁছলাম, দেখতে পেলাম সমস্ত প্রতিকূলতা এবং মানুষের অবহেলা অগ্রাহ্য করে ভগ্নদশায় দাঁড়িয়ে আছে একটিমাত্র দেউল

শিবানন্দ পাল: ১৯৫৭ সালে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সময় তেলকূপি সংলগ্ন এলাকায় ডিভিসি কর্তৃপক্ষ যখন পাঞ্চেত জলাধার তৈরি করে, সমগ্র এলাকা জলমগ্ন হয়। জলের তলায় চলে যায় তৎকালীন জেগে থাকা তেলকূপির ১৯টি দেউল এবং তাদের ভগ্নাবশেষ। ১৯৫০ সালে পাঞ্চেত ড্যাম তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল। ঘুরিয়ে দেয়া হয় দামোদরের গতিপথ। ফলে দামোদরের জলে ভেসে যায় রাঢ়বঙ্গের দক্ষিণ অংশের বহু গ্রাম। পুরুলিয়া তার সাথে যুক্ত হয়। জলের তোড়ে বহু ঘরবাড়ি ভেসে যায়। বহু মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। তেলকূপি ডুবতে থাকে।

পুরনো ভগ্নস্তূপ, ঐতিহাসিক ছবির ভিত্তিতে অনুমান করা যায়, পূর্বে কী অবস্থা ছিল। মন্দিরে জল ঢুকতে শুরু করলে সেই সময় গ্রামবাসীরা স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়েছিলেন। খবর পৌঁছেছিল খোদ আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়াতে। বিষয়টি সম্পর্কে সরজমিনে খোঁজখবর করবার জন্য তারা অনুমতি চায় ভারত সরকারের কাছে। মন্দির পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজন ছিল সাময়িক জল অপসারণের। তারপর অনেকেই মন্দির পরিদর্শন করেন। অনেক কথাবার্তা আলোচিত হয়। এত পরিদর্শন, এত আলোচনা তবু ১৯৫০-১৯৬০ সালে তোলা কোনও ছবি পাওয়া যায় না। সেই ১৮৭২ সালে তোলা বেগলার সাহেবের ছবিগুলিই সম্বল।বেগলার সাহেবের তোলা ছবিতে মন্দিরগুচ্ছের ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ১০, ১২, ১৫ নম্বর মন্দিরগুলি দেখা যায় অক্ষত অবস্থায়। অথচ এখন সেগুলি নিশ্চিহ্ন। বর্তমানে অর্ধনিমজ্জিত অবস্থায় যেটি দেখা যায়, মানে আমরা যেটি দেখলাম, সেটি বেগলার সাহেবের চিহ্নিত ১০ নম্বর মন্দির। আরও পড়ুন… তেলকূপি নাকি প্রাচীন তৈলকম্পা রাজ্য, রাজত্ব করতেন শিখর বংশের রাজারা [পর্ব ১]

স্থানীয় লোক-গবেষক চেলিয়ামার বাসিন্দা গবেষক সুভাষ রায় সেই সময় অনেক চেষ্টা করেছিলেন, যাতে স্বর্ণময় তেলকূপি অধ্যায়ের যেটুকু অবশেষ পড়েছিল, তাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়। সরকারি কোনও উদ্যোগ ছিল না। সে সময় দেশ সদ্যস্বাধীন হয়েছে। সবাই স্বাধীন দেশের ভাবনায় আনন্দে মেতেছিল। তেলকূপির মন্দিরগুচ্ছ বা তার অবশেষ নিয়ে তখন কারও মাথাব্যথা ছিল না! আরও পড়ুন… তেলকূপির ইতিহাস ঢাকা পড়ে আছে পাঞ্চেত জলাধারের জলের অতলে [পর্ব ২]

তেলকূপির জৈন ব্যবসায়ীরা মূলত তামার ব্যবসা করতেন। পুরুলিয়ার মানবাজারে ছিল তাদের তামাজুড়ি ও তামাখুন নামে দু’টি তাম্র আকরিক খনি। সেখান থেকে তেলকূপি বন্দরে ওই আকরিক নিয়ে যাওয়া হত। তারপর জলপথে তাম্রলিপ্তে। সেখান থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তামা সরবরাহ হত। রমরমিয়ে চলত তাদের ব্যবসা। বন্দরনগরী তেলকূপি তখন ছিল ভীষণ কর্মচঞ্চল। আজ সেই তেলকূপির হতদরিদ্র চেহারা। তেলকূপি এখন পুরুলিয়া জেলার এই অংশে দামোদরের দক্ষিণপাড়ে ছোট্ট একটি গ্রাম। সামান্য কৃষিকাজ আর পশুপালন করে জীবিকানির্বাহ করতে হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের।
নিকটবর্তী শহর রঘুনাথপুর। নিকটতম রেলস্টেশন জয়চণ্ডী। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা তথৈবচ। দিকনির্দেশ স্থানীয় বাসিন্দারাও সঠিক বলতে পারেন না। পথ হারাবার ভয় আছে। রঘুনাথপুর থেকে যে রাস্তা গেছে বান্দা, চেলিয়ামা হয়ে তারাপুর, গুরুডি, বড়রা, সেই রাস্তায় হঠাৎ হঠাৎ দু’একটি অটো দেখা যেতে পারে। তাতে তারাপুর পর্যন্ত যাওয়া যায়। তারাপুর থেকে নদীর ধার দিয়ে নাকবরাবর সোজা খোয়া ভাঙা মাটির রাস্তা প্রায় ২ কিলোমিটার। সঙ্গে গাড়ি থাকলেই ভাল। আরও পড়ুন… তেলকূপির সঙ্গে জড়িয়ে মহাবীর বর্ধমানের নাম, তাঁর নামেই বর্ধমান [পর্ব ৩]

১৯৫৬ পর্যন্ত তেলকূপি বিহারের মানভূম জেলার অন্তর্গত ছিল। তারপর পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার রঘুনাথপুর থানার অন্তর্গত হয়। বর্তমানে তেলকূপি অঞ্চলটি রঘুনাথপুর থানার লালপুর, গুরুন, তারাপুর, জামডি, পাথরবিড়া, ঘরবিড়া এই সকল গ্রামগুলি নিয়ে সমষ্টিত। পুরুলিয়া শহর থেকে অবস্থান ৪৭ কিলোমিটার দূরে। গ্রীষ্মকালে দামোদর যখন শুকিয়ে যায়, তখন নাকি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে বাকি দু’টি মন্দির। বিষয়টি স্পষ্ট নয়। স্থানীয়দের কথায় বিভ্রান্তি আছে। মন্দির নিয়ে তাদের কোনও আগ্রহ নেই। এখানে এসে শুধু দীর্ঘনিশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। আরও পড়ুন… পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে ডিভিসি জানাল পুরুলিয়ার তেলকূপি জলের তলায় [পর্ব ৪]

জলাধারের জলে কচুরিপানা ভাসতে দেখে মনে হয়, সময়ের জল শুধু বয়েই গিয়েছে। পাঞ্চেতে জল জমেছে। সরকারি উদাসীনতায় তেলকূপির হয়েছে সলিলসমাধি। শেষ ৩টি মন্দিরের একটির খ্যাতি ছিল নাকি ‘ঘোস্ট টেম্পল অব তেলকূপি’ নামে। গ্রামের মানুষ প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় শুনতে পেতেন মন্দির থেকে ভেসে আসছে কীর্তনের সুর। সেই সুরও বুঝি আজ পাঞ্চেতের জলের তলায় ঢাকা পড়ে গিয়েছে। পুরুলিয়া জেলার সাঁতুড়ি ব্লকের মধুকুণ্ডায় দামোদর নদীতে বারনিং ঘাট শেষকৃত্যের শেষে সাঁওতালদের পবিত্র অস্থিবিসর্জনের ঘাট। স্থানীয়রা তো বটেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে সাঁওতালরা তাঁদের পরলোকগত আত্মীয়দের অস্থিবিসর্জনের জন্য এখানে আসেন। নদীতে তর্পণ করতে গিয়ে কেউ যাতে দুর্ঘটনায় না পড়েন, তার জন্য নদীর একটি এলাকা নির্দিষ্ট করে সংরক্ষণের দাবি করেছেন তাঁরা। দামোদরকে তাঁরা গঙ্গার মতো পবিত্র বলে মনে করেন। আরও পড়ুন… তেলকূপির মন্দির-সমষ্টিতে তিন ধরনের মন্দির দেখেছিলেন বেগলার [পর্ব ৫]

মানভূমের বিভিন্ন স্থানে ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে জৈনদের আগমনের মূলকরিডর ছিল এই তেলকূপি বন্দর। মহাবীরের সঙ্গে এসেছিলেন তাঁর অনুগামী জৈন ধর্মপ্রচারকরা। এখান থেকেই তাঁদের উদ্যোগে পরেশনাথ পাহাড়ের নদীপথ-কেন্দ্রিক যোগ এবং তাম্রলিপ্ত বন্দরের যোগাযোগ নিবিড় হয়েছিল। তারপর নদীমাতৃক বাংলাদেশের একপ্রান্তে অবস্থিত তেলকূপির বন্দর ঘিরে এক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল জৈন ব্যবসায়ীদের বদান্যতায়। জৈন সমাজভিত্তিক সেই সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে এই অঞ্চল সমৃদ্ধ হয়ে গড়ে উঠেছিল। আরও পড়ুন… জঙ্গলের প্রাচীন প্রবাদ: রাজা বিক্রমাদিত্য তেল মাখতে আসতেন তেলকূপিতে [পর্ব ৬]

জৈন বণিকদের পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে মগধ থেকে শিল্পীরা এসেছেন। তাঁরা পাথর কেটে তৈরি করেছেন অসাধারণ শিল্পসমন্বিত এই প্রত্নস্থল। আমাদের চোখে যা দেখলাম, জলাধারের প্রান্তে কাশের জঙ্গলে ঘেরা এক সুবৃহৎ গোচারণভূমি। জলায় নিয়মিত মাছ ধরা হয়। নদীর বুকে বাঁধা আছে ডিঙি। স্থানটির গাম্ভীর্য যতখানি, উদারতা অনন্ত। কালের কপোলতলে অনিবার্য বিলীনতার মহাবিস্ময়ে নিমজ্জমান তেলকূপি বন্দর। পাল-সেন বৌদ্ধ, মোগল, ইংরেজ সব সংস্কৃতির সাক্ষ্য বহন করে অবশেষ অস্থিসার হয়ে ডুবে আছে। হাজার বছরের বাংলার ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল সংস্কৃতির বীরত্ব, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, শিল্প-সংগীত শুধু নীরবে জলের তলায় শুয়ে আছে। আরও পড়ুন… খারবেল থেকে সমুদ্রগুপ্ত ৫০০ বছর, তেলকূপির ইতিহাস অন্ধকারের অবগুণ্ঠনে ঢাকা [পর্ব ৭]

১৯৫১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, তেলকূপি গ্রামটিতে মোট গৃহের সংখ্যা ছিল ২৬০টি। জনসংখ্যা ছিল ১৪১৮ জন। আর ২০১১ সালের জনগণনার খতিয়ান দেখে অবাক হলাম। বড়রা গ্রামপঞ্চায়েতের অন্তর্ভুক্ত তেলকূপি গ্রামের আয়তন বর্তমানে ৬৫২.৮৩ হেক্টর। বর্তমানে মাত্র ৮১টি বাড়িতে ৫১০ জনের বাস। ৫০-৬০ বছরে জনসংখ্যা অর্ধেকের বেশি কমে গিয়েছে। আরও পড়ুন… বরাহভূম বা বরাভূম হচ্ছে পুরুলিয়া, তেলকূপি তারই মধ্যে পড়ে… [পর্ব ৮] 

দামোদরের পারে তেলকূপি ঘাটে যখন পৌঁছলাম, দেখতে পেলাম সমস্ত প্রতিকূলতা এবং মানুষের অবহেলা অগ্রাহ্য করে ভগ্নদশায় দাঁড়িয়ে আছে একটিমাত্র দেউল। যেখানে পৌঁছনো গেল সেখান থেকে দেউলটি প্রায় আধ কিলোমিটার দূরে। মাঝখানে মানুষের মাথাসমান উঁচু কাশ আর কুশের ঘাস জঙ্গল। ওখানে নিয়মিত কেউ যায় বলে মনে হল না। ঘন ঘাসের জঙ্গল ভেদ করে যাওয়ার কোনও পথ নেই। দূর থেকেই যখন ফিরে আসব ভাবছি, তখন একপাল গরু এবং ছাগল চড়ানো স্থানীয় মানুষের কাছে জানা গেল গ্রামের আরেক প্রান্তে অন্যদিকে আর একটি ঘাট আছে। সেখানে নৌকা পাওয়া যায়। নৌকায় দেউলের কাছে যাওয়া যেতে পারে। সেখানে যাওয়া হল। আরও পড়ুন… তেলকূপির শাসক তৈলঙ্গদের শুল্ক দিতেন! এই তৈলঙ্গ কে বা কারা ছিলেন [পর্ব ৯]

নৌকা বাঁধা আছে, তবে মাঝিরা কেউ নেই। দুপুরবেলা হয়তো তারা সবাই বাড়ি গিয়েছেন। দেউলের পথ নিশ্চয় জানা আছে মাঝিদের। হঠাৎ হাজির হয়ে সেসব ব্যবস্থা সম্ভব নয়। জলকাদার জঙ্গল, খালি পায়ে, মাথা অবধি আস্তীর্ণ ঘাসবনের পথে এগোতে গিয়ে আবার বিপদে পড়লাম। প্রথমে একটি শিয়াল, তারপর বিশাল কালো রঙের একটি সাপের দেখা পেলাম। আর সাহস হল না। সামনে ঘাসবনের জঙ্গল আরও ঘন। হাতে প্রয়োজনীয় কিছু নেই। অজানাকে জানার আকর্ষণ এখানেই ত্যাগ করতে হল। (চলবে)

আরও পড়ুন… তেলকূপি রাজবংশটি ছিল শরাক জাতি নির্ভর। রাজ্যটি ছোট, কিন্তু স্বাধীন [পর্ব ১০]

আরও পড়ুন… মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাণিজ্যবৃদ্ধির ফলে পাল যুগেই বাংলায় প্রথম ইসলামের আবির্ভাব [তেলকূপি পর্ব ১১]

আরও পড়ুন… বোড়ামের লিপিতে মিলেছে রুদ্রের পুত্রের কথা। পুত্র যুবরাজ, কিন্তু নাম নেই [তেলকূপি পর্ব ১২]

আরও পড়ুন… ১৯৫৮ সালেও দামোদরের গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া তেলকূপির মন্দিরে নিত্যপূজা হত [পর্ব ১৩]

আরও পড়ুন… তেলকূপি অঞ্চলে পাওয়া মূর্তির বেশিরভাগ হিন্দু দেবদেবীদের মূর্তি [পর্ব ১৪]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here