পঞ্চসায়র কাণ্ডে ধর্ষণের কথা কবুল ধৃত ট্যাক্সি চালকের, ‘গণধর্ষণের অভিযোগ’ নিয়ে এখনও ধোয়াশা

0
kolkata bengali news

রাজেশ সাহা, কলকাতা: অবশেষে ভাঙতেই হলো। গ্রেফতারের চার দিনের মাথায় পঞ্চসায়র কাণ্ডের অভিযোগকারিণীকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে নিল ধৃত ট্যাক্সি চালক উত্তম রাম। পুলিশ সূত্রে খবর, সোমবারের পর মঙ্গলবারও ধৃতকে সঙ্গে নিয়ে অপরাধের পুনর্নির্মাণ করেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। এদিন রিকনস্ট্রাকশন অব ক্রাইমের দ্বিতীয় পর্বে উপস্থিত ছিলেন কলকাতা পুলিশের ইস্ট ডিভিশনের ডেপুটি কমিশনার রুপেশ কুমার ও পঞ্চসায়র থানার তদন্তকারী আধিকারিকরা। লালবাজার সূত্রে খবর, ধৃতকে ইএম বাইপাস থেকে নরেন্দ্রপুরের কাটিপোতায় নিয়ে গিয়ে সেই রাতে ঠিক কি কি হয়েছিল জানতে চায় পুলিশ। আটক হওয়ার পর থেকে ক্রমাগত “সেদিন এতো মদ খেয়েছিলাম কিছুই মনে করতে পারছি না” গোছের গল্প ফেঁদে গা বাঁচতে চাইছিল উত্তম। যদিও মঙ্গলবার আর সেই কৌশল ধোপে টেকেনি। জেরার মুখে ভেঙ্গে পড়ে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে নেয় উত্তম। তবে লালবাজারের দাবি, এক্ষেত্রে যৌন সঙ্গম হয়নি ঠিকই, কিন্তু মদ্যপ অবস্থায় পেনিট্রেশন করা হয়েছে বলে স্বীকার করেছে ধৃত। ধর্ষণের সংজ্ঞা সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের শেষ রায় অনুযায়ী যা ধর্ষণের মধ্যেই পড়ে বলে মত আইনজীবীদের।

পঞ্চসায়র কাণ্ডের তদন্তে নেমে প্রতি পদে পদে হোচট খেতে হয়েছে পুলিশকে। ঘটনায় নির্যাতিতার পরিবার গণধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করলেও অভিযোগকারিণী মহিলা আদৌ কি গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন? গণধর্ষণ না হলেও ধৃত ট্যাক্সি চালক উত্তম কি তাঁকে ধর্ষণ করেছিল? তদন্তে নেমে পুলিশের কাছে এগুলোই ছিল লাখ টাকার প্রশ্ন। কারণ এই মামলার অভিযোগকারিণী নিজে মানসিক ভাবে অসুস্থ। পুলিশের কাছে একেক বার একেক রকম বয়ান দিয়েছেন তিনি। কখনও আগের কথাই মনে করতে পারছেন না ঠিক মতো। যাকে মনস্তত্ব বিদ্যায় বলা হয় ‘ফ্রাগমেন্টেড মেমোরি’। আবার ধৃতও প্রথম থেকেই নানা ফলের কৌশলের আশ্রয় নিয়ে নিজেকে বাঁচাতে চাইবে সেটাই স্বাভাবিক। ফলে পুলিশকে পুরোটাই মেডিক্যাল রিপোর্ট এবং প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে এগোতে হচ্ছিল। যদিও কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান জানিয়ে দেন, “তদন্তে নেমে এখনো পর্যন্ত উত্তম ছাড়া কোনো দ্বিতীয় ব্যক্তির উপস্থিতির প্রমাণ মেলেনি, সিসিটিভি ফুটেজেও দেখা গিয়েছে উত্তমের গাড়িতে চালকের বাঁদিকের আসনের বসে ছিলেন মহিলা, এই অপরাধের সঙ্গে উত্তম ছাড়া অন্য কেউ জড়িত থাকার কথা ধৃতও জানায়নি”। ফলে নির্যাতিতার পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী গণধর্ষণের যে ধারা ৩৭৬ (ডি) দিয়ে তদন্ত শুরু করা হয়েছিল, তা আদৌ টিকবে কিনা সেই নিয়ে সন্দিহান ছিলেন পুলিশ কর্তারাই। আইনজীবীদের একাংশ জানাচ্ছেন, তদন্ত করে পুলিশ এই অপরাধে অন্য কোনো ব্যক্তির উপস্থিতির প্রমাণ না দিতে পারলে, চার্জশিটে গণধর্ষণের ধারা প্রত্যাহার করতে হবে। এই বিষয়ে কলকাতা পুলিশের জয়েন্ট কমিশনার (ক্রাইম) মুরলিধর শর্মা বলেন, “আমাদের তদন্ত এখনো শেষ হয়নি, কাজেই ধারা প্রত্যাহার করা হবে কিনা এখনই বলা সম্ভব নয়, তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ হলেই বলতে পারব। তবে গণধর্ষণের ধারা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা থাকলেও অভিযুক্তের আজকের স্বীকারোক্তির পর অন্তত ধর্ষণের মামলা যে চলবে, তা একপ্রকার নিশ্চিত তদন্তকারী আধিকারিকদের কথায়।

গত সপ্তাহেই নির্যাতিতার সঙ্গে কথা বলার পর রাজ্য মহিলা কমিশন দাবি করেছিল নির্যাতিতার অভিযোগের বয়ানে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এই মামলায় যেহেতু নির্যাতিতা মহিলা মানসিকভাবে অসুস্থ তাই তার বয়ান আদৌ কতটা যথাযথ এবং আদৌ গণধর্ষণ হয়েছিল কিনা সেই বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকছেই। মঙ্গলবার রাজ্য মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন লীনা গঙ্গোপাধ্যায় টেলিফোনে মহানগরকে জানান, “ধৃত ট্যাক্সিচালক এখনো পর্যন্ত পুলিশকে যতটা অপরাধের কথা স্বীকার করেছে সেটাই আইনের চোখে মারাত্মক দণ্ডনীয় অপরাধ, আমরা পুলিশের কাছে এ বিষয়ে রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছি যা এখনো হাতে আসেনি। সম্পূর্ণ মেডিকেল রিপোর্টও এখনও পাওয়া যায়নি। তাই গণধর্ষণের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত ভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়, তবে আমরাও সত্যের জন্য অপেক্ষা করছি “।

এদিকে মঙ্গলবারই আলিপুর আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে গোপন জবানবন্দি দেওয়ার কথা ছিল নির্যাতিতার। তবে আদালত সূত্রে খবর, এই মামলায় অভিযোগকারিণী মানসিক রোগী হওয়ায় গোপন জবানবন্দির বিষয়ে এসিজেএমের কাছে মতামত চেয়ে ফাইল পাঠিয়ে দেন বিচারক। সূত্রের খবর, এসিজেএম সম্মতি দিয়ে জানিয়ে দেন, এক্ষেত্রে গোপন জবানবন্দির সময় অভিযোগকারিণীর সঙ্গে একজন বিশেষজ্ঞ উপস্থিত থাকলে গোপন জবানবন্দি নিতে আইন অনুযায়ী কোনো বাধা নেই। এরপরই পুলিশকে নতুন করে গোপন জবানবন্দির জন্য সময় চাইতে নির্দেশ দেওয়া হয়। লালবাজার সূত্রের খবর পরবর্তী তারিখের জন্য আলিপুর আদালতে নতুন করে আবেদন জানানো হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here