galpo

ফাল্গুনের শুল্কাদশমীর এই রাতে জলধরের জন্যে নিখিলের বাড়ির পথ মোটেও দুর্গম নয়৷ তাছাড়া, জলধরের বাড়ি থেকে নিখিলের বাড়ি পর্যন্ত পথ-বা কতটুকু? এইটুকু পথ, পোয়াটেক মাইল তো নাই, তার চেয়েও অনেক কম- বরং, প্রায় ‘ডাকেরই মাথায়’৷ জলধরের বাড়ির পরে পাইকবাড়ি৷ পাইকবাড়ির শারিকী গেরস্তদের ঘরদোর শেষ হলে সামনে যে-রাস্তা- সেই রাস্তার ওপারে নিখিলের বাড়ি৷ পাইকবাড়ি একদম যেমন ডাকের মাথায়, নিখিলের বাড়ি তা নয় এই জন্যে- জলধরের বাড়ির সামনে যে-খাল, সেই খাল নিখিলদের বাড়ির সামনে দিয়ে সোজা যেমন গেছে; আবার, ওই বাড়ির সীমানা ঘেঁষে পাইকবাড়ির সামনে দিয়ে ডাইন দিকেও গেছে৷ সেই খালটা বড়৷ এই দুই দিকের খালের কোনায় বাড়ি হওয়ায় জলধরের বাড়ি থেকে নিখিলের বাড়ি আর পুরোপুরি ঠিক ডাকের মাথায় না৷
এখন শুল্কপক্ষ, রাত্রির দশটার একটু বেশি বাজে হয়তো৷ জলধর কান পেতে শুনেছে, প্রায় সব সময় বাংলাদেশের কোনও-না-কোনও সেন্টারের গান বাজতে থাকা খুড়তো ভাই গুণধরের টেনজিস্টারে তখন খবর হচ্ছিল৷ সারাদিনে এই একটু সময় যখন আর কোথাও গান থাকে না, তখন গুণধরের টেনজিস্টারে খবর বাজে৷ গুণধর ভাত খেতে বসলেও তার পাশে টেনজিস্টার খোলা থাকে, প্রায়শ গান বাজে৷ টাট্টিতে যাওয়ার সময়ও পারলে বগলে বাঁধিয়ে করে ওটা নিয়ে যায়৷ উঠানের উপর এতক্ষণ যে চাঁচটায় গুণধর শুইয়ে শুইয়ে আকাশের তারা গুনছিল, সেখানে বাজছে রেডিয়োটা৷ তাতে খবর হচ্ছে৷ এই চান্সটা জলধর ইচ্ছে করে নিয়েছে৷ জলধর জানে, সে বের হওয়ার সময় চাঁচে চিৎ হয়ে আকাশে পা তুলে টেনজিস্টার বুকে নিয়ে যদি গুণধর গান শুনত, তা হলে তাকে জিজ্ঞাসা করত, যাও কোতায় ও জলদা? হয়তো জলধর বলত, যাই নিখিলের বাড়ি৷ অথবা, তা বলত না৷ সে জানে না৷ হা, জলধর জানে সে নিখিলের বাড়ি যাওয়ার কথা বলত এই জন্যে যে, এরপর গুণধর জিজ্ঞাসা করলে বলতে পারত যে, সারাদিনের খাটনিতে সে ভুলে গেছে যে, বাগেরহাট থেকে আসার সময় নিখিল খুড়া বলে দিয়েছিল বাড়ি যে, তার বাড়ি যাইয়া বলতে, সে আইজ রাত্তিরে আসপে না৷ জলধর জানে এরপর আর কোনও প্রশ্ন করত না গুণধর৷

galpoকিন্তু জলধরের ভয় অন্যখানে৷ সে আজ একটা শয়তানি করেছে৷ ইচ্ছে করেই৷ কিন্তু এখনও জানে না যে, এই শয়তানির ফল ফলবে কি না৷ আর এও জানে না, তাতে তার কাজের কাজ কিছু হবে কি না৷ হয়তো এই যে সে একটু দেরি করেই নিখিল খুড়ার বাড়ি যাইতেচে, যাইয়া যদি দেখে বাগেরহাট থেকে বাড়ি চইলে আইচে নিখিল খুড়া, তাইলে হবে কেমন? যদি যাইয়া দেখে তার দেয়া এই সংবাদ অন্য মানুষের কাছে থেকে জেনে গেছে ললিতা৷ তাইলেও-বা হবে কেমন?
আকাশে চাঁদ, মেঘ নেই৷ সব পরিষ্কার, কোনও ঘোলা ভাব নেই৷ শুক্লাদশমীর এই রাত, এই বসন্ত কাল৷ প্রচুর হাওয়ায় গাছের পাতা খুব নড়ছে৷ এত কিছুর ভিতরে, এই প্রকৃতিতে এইটুকু জায়গা যেতে যেতে জলধর আসলেই ভিতরে ভিতরে একটু ভয় পাচ্ছিল৷ এইটুকু পথ, জীবনে এতবার পাড়ি দেওয়া, হেঁটে-যাওয়া এইটুকু পথ এইমুহূর্তে তাকে বেশ ভীত করে তুলেছে৷ যদিও সে জানে, অন্তত এইটুকু জানে, ভিতরে ভিতরে ওইটুকু জানাই তার একমাত্র ভরসা, ললিতা তাকে ফেরাবে না!
শয়তানিটা জলধর করেছে৷ ললিতার চোখে ওই ইঙ্গিতটা দেখেছিল, তাই হয়তো৷ হয়তো কী, হতে পারে ললিতা চোখে সে সেই প্রশ্রয় খুঁজেছিল৷ হয়তো পেয়েওছিল৷ যদিও জলধর জানে, তাকে প্রশ্রয় দেওয়ার কথা না ললিতার, তবু আগেপাছে যখন সময় পেয়েছে, ব্যবসার কারণে, ধান কেনার কথা বলতে, সুপারি কেনার হিসাব করতে যখন সে নিখিলের বাড়ি গেছে, তখন তো কতবার কতদিন নিখিলের বউকে এই কথা বলেছে, ও খুড়িমা, দেলা না তোমার বুইনরে৷ হয়তো ললিতা তখন হাতের কোনও কাজে ব্যস্ত৷ কোলের কাছে ছেলে-মেয়ে খেলেছে, হয়তো এক প্যাঁচে পরা শাড়ি উপরের দিক থেকে একটু নেমেই গেছে৷ আর সেই সুযোগে ললিতার শরীরের যতটুকু দেখত জলধর, তাতে তার জীবনের সকল অপ্রাপ্তি আরও তীব্রভাবে ঝরে পড়ত৷ সেটা স্বাভাবিক৷ বড় সুন্দর শরীর ললিতার৷ এমন রং এই গ্রামের কোনও বউয়ের নাই৷ সারাটা শরীর মুখ একই রং৷ যেন ফাল্গুন মাসের জ্যোৎস্না সারাগায়ে লেপটে দিয়েছে৷ না, জলধরের ভাবনাটা ঠিক লাগসই হল না৷ না-হোক, নিজের ভিতরে ভিতরে ললিতার ওই শরীর নিয়ে সে যা বুঝতে চায়- তা অবশ্য ঠিকই বুঝতে পেরেছে৷ না, সেই দিক থেকে ললিতার ওই শরীর সরাসরি জলধরের ভিতরে সেই বাসনা প্রকট করে তোলে না, সে কেন তাকে কাছে পায় নাই৷ পাইল এই আধবুড়ো নিখিল খুড়া৷ ললিতার প্রায় কনুই পর্যন্ত কাদামাখা হাত, যে-হাতে সে ঝুঁকে এইমাত্র রান্নাঘর তার ঢেঁকিঘরের ডোয়া পর্যন্ত লেপে দিয়ে উঠল, তারপর বালতিটা হাতে নিয়ে খালপাড়ের দিকে যেতে যেতে জলধরকে বলল, ‘তোমরাই আনলা না-৷’ জলধর হয়তো এরপর নিজের কোনও মতামত বলত, কিন্তু তার আগেই ললিতা তার শেষ না করা কথা শেষ করল, ‘এক গ্রামে দুই বুন না-আইসকা ভালই হইচে৷’
এসময় ললিতার হাসিতে দাঁতগুলো চেয়ালের অংশিকসমেত বেরিয়ে পড়েছে৷ আর তা জলধরকে আরও উদাস করে তোলে৷ সে জানে এইভাবেই হাসত সুমিতাও৷ সুমিতা ললিতার ছোটবোন৷ এই নিখিল খুড়ার বাড়ির পিছন পাশের মাঠ ধরে ভাসার দিকে মাইলখানেক গেলে ললিতার বাপের বাড়ি৷ আগে কত গেছে সে এই পথে৷ তখন ললিতার বিয়ে হয়নি৷ এই বাড়ির সামনের চার পার হয়ে এই পথ ধরে এমন ধান ওঠা শুকনো মাঠের দিনগুলোতে জলধর কতদিন গেছে সে-গ্রামে৷ জলধর জানে, সুমিতার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সেই দিনগুলোতে ললিতাও পছন্দ করত জলধরকে৷ তার ছোটবোনটাকে জলধরের সঙ্গে মানাবে বেশ৷ তা সত্যি, এখনও যদি নিখিলের সঙ্গে তুলনা করে, তাও তো বটেই৷ জলধরের পেটানো শরীর৷ চোখ নাক সুন্দর৷ জোড়া ভুরু৷ একমাথা চুল৷ একবার তাকিয়ে পড়লে আবার তাকিয়ে দেখতে ইচ্ছা করে৷ ভালঘরের গেরস্ত৷ বাপের সহায়সম্পত্তি তেমন নাই, তাও তো নাই তাদের বাপেরও৷ তবু বাড়িঘরদোর আছে জলধরের, সুমিতা ওই বাড়ি একদম খারাপ থাকপে না, মনে হত ললিতার৷ কিন্তু ললিতার মনে হয়, হয়তো এই গ্রামে তার বিয়ে হওয়ায়ই আর এক বুইনের বিয়ে দিতে চায় নাই বাপ৷ আর নয় হতে পারে, জলধরের বাপখুড়ারাও চায় নাই আমাগো বাড়ির মাইয়া আনতে৷ কিন্তু সে ঘটনায় ললিতাও ভিতরে ভিতরে কষ্ট পেয়েছে৷ কেন না, ললিতা জানে, সুমিতা কষ্ট পেয়েছে৷
ললিতার অমন কথার উত্তরে তখন জলধর আর কী বলে? ভিতরের ঘটনা তো সবই তার জানা৷ তবু খুড়ির সঙ্গে তার ওই বিষয়টা নিয়ে রসিকতা করতে সে ছাড়ে না, ‘হয়- খুড়া ভাইপো দুই বুনরে আনলে তুমিও তোমার ছোডা বুইনরে মাঝেমইদ্যে দেকতে পারত৷’
তা সত্যি৷ কোন পুবদেশে বিয়া হইল বুনডার, কতদিন দেখে না৷ ললিতা বলেছিল, ‘হয়৷ সেয়া পারতাম৷ তারপরও, তোমরা এই গ্রামের মানুষজন ভাল না৷’
‘কেন, খুড়ায় তোমারে সুখে রাহে নাই?’
ললিতা চকিতে জলধরের দিকে মুখ তুলে তাকাল৷ জলধর সুখ বলতে কী ইঙ্গিত করেছে সে সেটা বুঝে নিতে চাইল যেন৷ জলধরও চোখের ওই ভাষা বোঝে৷ সে এমনিতে খালপাড়ের দিকে এগিয়ে গেছিল৷ ললিতা বলল, ‘সুখ আর কী? সুখ থাকলে কী আর পচা কাদা ছানি?’
‘কী কও না কও! তোমার সোনারবরণ হাত, পচা কাদাও এই হাতে সোনা হইয়া যায়৷’
‘হইচে আর রসের কথা কইয়ো না৷ এই বয়সে এত রস থাহে? খুড়ার সোমান বয়সে হইলে আর একফোঁটা রসও বাইয়া পড়বে না৷’
হয়, তা সত্যি৷ হয়তো নিখিল খুড়ার একটু বয়স হয়েছেই৷ শরীরে বয়সের ছাপ পড়ে নাই৷ তা পড়ার কথাও না৷ কিন্তু মাথার চুলগুলান পড়ে গেছে৷ চোখ দুটো বসে যাওয়ায় খুড়ারে আরও বুড়াই দেখায়৷ সেই হিসাব করে ললিতা সুমিতার ছোটদিদি হলেও জলধর সাহস করে তাকে কথাটা বলেই ফেলে, ‘খুড়ায় তোমার সাতে পারে না, না?’
ললিতা হাসল৷
জলধর আবার বলল, ‘কী? কত কতা কও না কেন? তোমার এই আগুন-ভরা ফাগুন বিফলে যায়, খুড়ি!’
‘গেলে করবা কী?’
‘আমাগো এট্টু কইলে তো পারো৷’
ললিতা মাথা নিচের দিক দিয়ে হাসল৷ জলধর জানো, এই ইঙ্গিতে কোনও কাজ হবে কি না৷ শুধু বলল, তোমাগো এই বাড়ির ধারে আসলে মনে হয়, এই পাশের পথ দিয়া তোমার বাপের বাড়ির দিক চইলগা যাই৷ কিন্তু যাইয়া আর হবে কী? তোমার বুইন তো আর নাই৷ সে এহান ওই নাজিরপুর৷’
ললিতা শুকনো হাসল৷
জলধর বলল, ‘গেলাম, খুড়ায় আসলে ছত্তয়ালডারে এট্টু পডাইয়া দিয়োদিন৷ আর নয় আমাগো বাড়ি যাইতে কইয়ো৷’
ললিতা বলল, ‘আচ্ছা৷ কেন, তোমার খুড়ায় যাবে কী জইন্যে? তুমি আর এদিক আসপা না?’
জলধর ললিতার চোখের দিকে চাইল৷ সে ললিতার চোখের ইঙ্গিতটা ধরতে পারল৷

galpoকিন্তু এটা জলধরের জন্যে এমন কোনও ইঙ্গিত বা সংকেত ছিল না৷ তবু, সে কি হিসাব করেই ঠিক করে রেখেছিল যে, আজকের শয়তানিটা করবে? তা করেনি৷ কিন্তু জলধর জানে, নিজের ভিতরে একবারে ভিতরে কোন তলে নিজের কাছে সেই ইচ্ছাটা ছিল, যদি কখনও সুযোগ হয় তা হলে সুযোগটা নিতে তার দোষ কী? আর ললিতার চোখে, অন্তত জলধর নিজের জন্যে ভেবেছে- সেই ইঙ্গিতটা সে ওই চোখে দেখেই ছিল৷ আর সেই সব মিলে সুযোগটা সামনে আসতেই সে প্রয়োজনীয় শয়তানিটা করেছে৷
অথচ রাস্তাখালের গোড়া নৌকায় থাকতে যখন তালেশ্বরের দিক থেকে জোয়ারের জল ঢুকতে শুরু করছে, তখনও সে জানে না সামনে সুযোগ৷ বরং, তখন সে সামনে বসা রশিদকে বারবার বলছিল, সামনে জোরে নৌকা টানতে৷ জলধর পিছনে বইঢা ধরেছিল৷ এই পালবাড়ির ঘোপ- এই জায়গাটুকু শেষ হলেই সে গুন ধরবে৷ রাস্তাখালের গোড়া থেকে এই জায়গা খালের পাড় খাড়া, আর জলও বেশি৷ এই জায়গা থেকে গুন ধরলে মাঝখানে দুই জায়গায় আবার নৌকায় উঠে পাশের ভারানি খাল পার হতে হবে৷ তার চেয়ে একবারে পালবাড়ি ঘোপ কী তালেশ্বর পর্যন্ত পৌঁছলেই, হয়তো এই জলের রাগ কমবে, তখন গুন ধরলে হবে৷ কিন্তু বেমরতার খালে এখন নিশ্চয় জলের তোড় বেশি৷ এই খালেই যে জোরে জল ঢুকছে! সুমুদ্দুরে আইজ হইচে কী? দড়াটানায় এত জল আইজ ঢোকতেচে কীবিলে (কীভাবে)? জলধর তো এই সব ভাবছিল৷ সামনে রশিদ, জলধরের কথামতো কাজ করে৷ একবার দুইবার ফিরে হয়তো একটা মন্তব্য করবে, ‘ও কা, এই যদি হয় বেগোন, তয় আইজ বাগেরহাট যাইতে যাইতে বিহাল৷’ জলধর এর উত্তরে জোরে বইঠা টানতে টানতে একবার বলেছিল, ‘হ৷’ তা পেছনে বসে জলধরের বইঠা টানার কষ্টটা হয়তো ছেলেটা বুঝলই না৷ রশিদ বরং তখন মূলসমস্যার কথাটাই বলে, ‘তার, ধান বেচতে বেচতে- হাজি সাবের মাইনষেগো মাপতে মপেতে প্রায় সইন্ধ্যা- কী সইন্ধ্যা ঘোনাইয়া যাবে৷’ হ্যাঁ, তা যাবে জলধর জানে৷ আগে রশিদের বাপের সাথে কারবার করত সে৷ এখনও তাই করে বলতে গেলে৷ টাকার ভাগ আর হিসাব রশিদের বাপের সাথেই৷ কিন্তু নাও দুইখান৷ জলধরের সাথে এখন রশিদ আর রশিদের ছোট ভাইটারে নেচে রশিদের বাপ৷ এই কয়দিনের জন্য৷ এরপর ধান কেনায় এট্টু টান পড়লেই হয়তো জলধর আর রশিদের বাপ এক নায়ে৷
এই অবস্থায় পালবড়ির ঘোপ পার হওয়ার পরে জলধর বুঝল, আর পারা যায় না৷ সে নৌকা কূলে নিয়ে রশিদকে বলল পিছনে যেয়ে বসতে৷ তারপর গুন হাতে খালপাড় ধরে প্রায় একহাঁটার টানে তালেশ্বর যেয়ে দেখল, নিখিল খালের পাড়ে না থামিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে আছে৷ জলধর দেখত না৷ কেন না, ডাইনের হাতায় তালেশ্বরের থেকে কচুয়া যাওয়ার এই খালে নৌকার মুখ একটু ঢুকিয়ে দিয়ে থাকলে দেখার কথা নয়৷ জলধর এই সময় নিজের নৌকায় উঠে বসতে চাইছিল৷ ওপার যেয়ে আবার গুন ধরবে৷ এই সময় রশিদের নৌকাটা পাড়ে ভিড়াতে ভিড়াতে আর জলধর গুনের দড়ি ঘোটাতে থাকলে, এই সময় রশিদ জলধরের পিছনের দিকে দেখায়, ‘ও কা, ওই যে নিখিল ভাই৷’
জলধর পিছন ফেরে৷ নিখিলের দিকে দেখে, ‘ও খুড়া?’ এই বলে ডাকে৷ নিখিল সূর্যের দিকে চোখ দিয়ে যেন জলধরকে ঠিক দেখতে পারছিল না৷ অথবা, নৌকার কোনও সমস্যা নিয়ে ক্লান্ত৷ জলধর আবার বলল, ‘ও কা, হইচে কী?’
এই সময়েও জলধরের মাথায় সেই শয়তানি বুদ্ধিটা খেলে নাই৷
নিখিল বলল, ‘আর কইস না, সামনের ভাগে ধান হইচে বেশি৷ এখন নাও তো চলে না, তার এই জায়গায় আসতে আসতে দেখি ওই দিকদা জল ওডে৷’
জলধর জানতে চেয়েছিল, ‘তার এহোন করবা কী?’
‘দেখি৷’
‘ধইন্যো গেছে কোতায়?’ ধন্য মানে সুধন্য৷ নিখিলের বাড়ির কিষান৷ ধানের কারবারে নিখিল তারে কাজে রাখে৷’
‘ধইন্যরে ওপার পঠাইছি- দেখি এট্টা বস্তা পায় নাকি৷ তয় একবস্তা ধান ভইরগা ওই কুদঘাটা থুইয়া যাব৷ আর নয় ওই পাড় পালবাড়ির কেউর ধারে৷’
‘কেন, জল হেছলে হবে না?’
‘না, সামনের দিকদা ধান কিছু পিছনদিক দিচি, কিন্তু এইয়ার পর দেলে পেছনে বইসকা নাও বাওয়া লাগবে না৷’
‘হয়৷ জল ওডচে নিকি?’
‘হয়৷ হেচচি৷ শোন‌, এইয়া করতে করতে বেলা যায় কেথায়৷ ওদিক বাগেরহাটদা বেমরতার খালে জল ঢোকতেচে কী জোরে, কোন সোময় যে যাব? তুই যাইয়া আমার জইন্যে হাজি সাবের মিলে এট্টা সিরিয়াল দিস- কইস আমি আসতেছি৷’
‘হয়৷’ জলধরের মাথায় বুদ্ধিটা এই প্রথম একটু ঝিলিক দিয়ে গেল৷ জলধর জানে, তাতে কোনও লাভ নাই, যদি আগে আগে সে বাগেরহাট পৌঁছাতে না পারে৷ কেন যে আইজ সারাটা এই উজালে পড়ল!
জলধর দেখল, সুধন্য আসছে৷ সে নিখিলকে, ‘গেলাম, ও খুড়া’ বেগুনের দড়ি হাতে পেঁচাতে পেঁচাতে একলাফে নৌকায় উঠে বসে রশিদকে বলল, ‘তাড়াতাড়ি ল, ব্যাডা৷ যেভাবে জল ঢোকতেচে-’ এই খালটার ওপাড়ে আবার ডাঙায় ওঠে জলধর৷ আড়াআড়ি বড় খালটা সোজা চলে গেছে বাগেরহাট৷ খালের পাড় উঁচা৷ পাড়ে প্রচুর একসারে অনেকগুলো নারকেল গাছ৷ পাড় কোথাও ভাঙা, তার উপর দরটানা থেকে এখন জল ঢোকা শুরু করেছে৷ জোয়ার আসছে৷ সে জানে এই জলের তেজ আরও বাড়লে, বেমরতা কি সুলতানপুর যেতে যেতে যখন খাল আরও বড়- স্রোত আরও বেশি, সেই জায়গায় গুন টেনে পিঠের ছাল তুলে ফেলেও খুব সহজে বাগেরহাট পৌঁছানো যাবে না৷ তার উপর নিখিল খুড়া তারে সিরিয়াল দিতে কইচে৷ জলধর মনে হাসল৷
জলধর দড়টানা নদীর কূলে হাজির মিলে যখন পৌঁছল, তখন সূর্য সবে হেলে পড়েছে৷ ইতিমধ্যে অন্য কারবারিদের নৌকাও পৌঁছেছে প্রচুর৷ এইদিকে একেবারে সন্ন্যাসী থেকেও কোনও কোনও নৌকা আসে৷ নৌকা আসে ওইদিকে বিষ্ণুপুর কিংবা যাত্রাপুর থেকেও, ওদিকে ভাসা বা জুচখোলার নৌকাও কখনও কখনও এইখানে দেখেছে জলধর৷ এখানে ধানের দর ভাল পাওয়া যায়৷ হয়তো, আজও কত দূর দূর থেকে নৌকা এসেছে৷
কূলে উঠে জলধর রশিদকে পাঠাল পাউরুটি আর গুড় কিনতে৷ বলেছে, নৌকার ছোট ঠিলাটা ভরে জল নিয়ে আসতে৷ গুন টানতে টানতে জলধর ক্লান্ত৷ তারপর জলধর নৌকা থেকে নেমে নিচে গেল নাম তোলতে৷ জলধরের নাম তুলল ১৫ নাম্বারে৷
তারপর নিখিলের নামটা আর তখনই তুলল না৷ দাঁড়িয়ে থাকল হাজির মিলের ম্যানেজারের কাছে৷ নিজের নৌকার দিকে তাকাল৷ নদীর কূলে যেয়ে হাতমুখ ধুইল৷ আর ভাবল আরও কিছু নৌকা আসুক৷ এই করে একবার যেয়ে ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করল, ‘এখন মাপে কত নাম্বার?’ ম্যানেজার জানাল, ‘সাত৷’ জলধর কীভেবে এদিকে-ওদিকে তাকাল, ‘তার মানে তিনটা-চাইরটা বাজবে আমার তা আসতে?’ তখন ম্যানেজার জলধরকে জানাল, তা হয়তো৷ তাকে দুপুরের খাওয়া খেয়ে আসতে বলল৷ এই সময় জলধরের নিখিলের কথা মনে পড়ল, কিন্তু সে নিখিলের নাম ম্যানেজারকে খাতায় তুলল না৷ রশিদের জন্য দাঁড়িয়ে থাকল৷ রশিদ আসলে তাকে বলল, ‘এখন পাউরুটি খাবি? না, ভাত খাইতে যাবি?’
রশিদ বলল, ‘কও কী? এট্টু জিরাইয়া লই, তারপর যাবহানে। ডাকপে কহোন?’
জলধর রশিদকে বলল, ‘এহোন খেয়ে আসলে ধান তুলতে তুলতে পেটের ভাত নাইমা যাইত৷ আর নয়, এট্টু পাউরুটি খাইয়া দুই গ্লাস জল খাইয়া তারপর নয় ধান তুলি৷ তারপর আগে একজন খাইয়া খাইয়া আসতে হবে?’
রশিদের এই এক সমস্যা আর নয় গুণ৷ কোনওকিছু নিয়া কোনও আপত্তি নাই৷ নিজে ইচ্ছাতে কখনও কোনও কথা বলবেও না৷ দাঁড়িয়ে থাকবে৷ বাপে যে জলধর কাকার সাথে এই নায়ে দেচে, যেন জলধর কাকায় যা কবে তাই তার জইন্যে সত্যি৷ ফলে রশিদ বলল, ‘তুমি যা কও৷’
তাই, রশিদকে সঙ্গে নিয়ে নদীর কূলে বসে দুইজনে পাউরুটি খাইল৷ ঠিলায় ভরে আনা হল জল। আগে জলধর গ্লাসে ঢেলে, পরে রশিদ খেয়ে গ্লাসটা ভাল করে ধুয়ে রাখল৷ নৌকা থেকে তারপর দুইজনে ধান নৌকা থেকে তুলতে শুরু করল৷
ধান তোলার শেষসময় রশিদ বলল, ‘ওকা, নিখিল ভাইর নাম তোলা হইছে?’
‘না৷ সে সোমায় ভাবলোম, কিন্তু ম্যানেজারবাবু মনে হয় নাম নেত না৷ যাই এহোন দিয়া আসি- তুই ধানের ধারে থাহিস৷’
ম্যানেজার জানতে চাইল, নিখিলের আসতে কতক্ষণ? জলধর অনুমান করল, এতক্ষণে বেমরতা আইসকা গেচে মনে হয়৷ জলধর তাই বলল৷ ম্যানেজার বলল, ‘নিখিল পঁয়ত্রিশ নম্বরে৷’
জলধর বলল, ‘না, ও ম্যানেজারবাবু, নিখিল খুড়ায় আমারে থোবে না, কহোন কইচেলে৷ তিরিশ নাম্বার দেন৷’
ম্যানেজার দিল৷ বলল, ‘তিরিশ দেলেও রাইত আটটার আগে ওই ধান মাপতে পারব না৷ দেকচো তোরে দেলাম পোনার সেইয়ার পর এইডুক সোমায় এগারহান নাও আইচে৷ এহোন যদি নিখিলের নাও না আসে? তবু দেলাম তিরিশ৷’
জলধর নিজেরমতো হিসাব করল৷ সে জানে আগে দিলে হয়তো বাইশ নাম্বারে দিতে পারত৷ ততক্ষণে যদি না পৌঁছাত নিখিল, হয়তো ম্যানেজারকে বললে নাম আর পিছনে দিত না, তাতেও নিখিল খুড়া হয়তো সন্ধ্যাসন্ধ্যি ধান মাপাইতে পারত৷ কিন্তু এখন রাত্তির আটটা বলেছে ম্যানেজার, হয়তো তারও বেশি হতে পারে৷ তাই হল, নিখিল পৌঁছাল আরও দুই ঘণ্টা পরে৷ পৌঁছে শুনল, তার সন্ধ্যারও পরে মাপতে ডাক পড়বে৷ ততক্ষণে জলধরের ধান মাপা শেষ৷ সে নাও খুলে দেবে৷ নয়তো যাওয়ার সময় আবার উজান ঠেলতে হবে৷ রশিদ বাড়ির জন্য লবণ কেনার নাম করে বিড়ি ফুকতে গেছে৷ নৌকায় ওঠার পর রশিদ আর বিড়ি খাইতে পারবে না৷ ছেমড়ার এই এক নওছল্লা- ওয়ার ছোটভাই জলধরের সামনে বিড়ি খায়, কিন্তু সে খায় না৷
জলধর নৌকায় বসলে নিখিল এসে বলল, ‘জলধর, রাইতে একবার আমাগো বাড়ি যাইস৷ তোর খুড়িরে যাইয়া কইস, কাইল বেয়ানে আসপো৷’
জলধর মাথা নাড়ল৷ তারপর হাসতে হাসতে বলল, ‘আর কিছু কইতে হবে? যদি কয়, খুড়ায় আসল না কী জইন্যে, তহোন কব বাগেরহাটে খুড়ায় এক কেতা পাতাইচে! কী কব?’
নিখিলের মেজাজটা একটু খারাপ৷ কিন্তু জলধর এমনভাবে বলল, এর উত্তরে সে হেসে বলল, ‘হয়, সেইয়াই কইস- আইজ তো ধানে ঘা দেচো৷’
জলধর বলল, ‘এট্টু পরে তুমিও দেবা হানে৷’

galpoনিখিলের আজ রাতে এই না-ফেরার কথাটা বলার জন্যে জলধর এখন নিখিলের বাড়ি যাচ্ছে৷ না, জলধরের বহুদিনের পরিচিত এই পথ মোটেও দুর্গম নয়৷ জলধর জানে, এখন গ্রামে প্রায় কেউ জেগে নেই৷ তার অনেকদিন ধরে রাতের বেলা ললিতার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা একটু বাদেই ফলবে৷ হয়তো ললিতা এখনও নিখিলের পথ চেয়ে বসে আছে৷ অথবা, একঘুম দিয়ে শুয়ে আছে কানখাড়া করে৷
আকাশে দশমীর চাঁদ৷ পাতার ফাঁক দিয়ে রাস্তার আলো পড়ে৷ জলধরের মনে ভয় অন্য- এত রাতে সে যে নিখিল খুড়ার বাড়িতে যাচ্ছে, যদি পাইকবাড়ির সামনে যাওয়ার পর অধীরদা জানতে চায়, সে কোথায় যাচ্ছে? এত রাত পর্যন্ত অধীরদা জেগে থাকে৷ মাস্টার মানুষ৷ হারিকেনের আলোয় টেবিলের চেয়ারে বসে বসে লেখাপড়ার কাজ করে৷ না, সে ভয় হয়তো মুহূর্তে সামলে ওঠা যাবে৷ সে বলবে, নিখিল খুড়ার বাড়ি যাই৷ কিন্তু জলধর নিজের ভিতরে ভিতরে নিজের আজ বিকালে হাজি সাবের মিলের খাতায় নাম তোলার শয়তানি নিয়ে একটু শঙ্কিত৷ আর, আরও একটা ব্যাপার আছে- যদি তা ঘটে?
হা, সেই আশঙ্কাটাই তাকে ভীত করে তুলছে৷ যদি রাত্তির আটটা সাড়ে আটটার পরে ধান মাপা হয়ে গেলে জোয়ারের গোন ধরে সুধন্যকে নিয়ে বাড়ি এসে থাকে নিখিল খুড়া? সুধন্য বইটা টানে ভাল৷ নিখিল খুড়া চলে আসলে, তখন কী হবে? নিখিল তো জানতে চাবে, এহোন কইতে আইচো? তুই তো বাড়ি আইচো সইন্ধ্যাসন্দি?- এই প্রশ্নের কোনও জবাব তার কাছে নাই৷ আর, সে জানে না, যদি নিখিল খুড়া বাড়ি থাকে, তা হলে আজ যে সুযোগের কথা সে ভেবেছিল- সেই সুযোগ গেল৷ সে তো মজিরউদ্দিন চেয়ারম্যানের ঘাটে নৌকাটা বাঁধতে বলেছিল রশিদকে৷ কাল তার বাড়িতে ধান কিনবে৷ জলধর জানে রশিদ তাই করেছে৷ সেই সন্ধ্যার পরপর বাড়ির পিছনের মাঠ পার হয়ে বাড়ি ঢুকে তো একটুক্ষণ জিরিয়ে কী স্নান করে তারপর একবার আসতে পারত নিখিলের বাড়ি৷ তা সে আসে নাই ইচ্ছা করে৷ তা হলে এই রাতে আর হয়তো আসা হত না, তখন যত ইঙ্গিতেই কথা বলুক ললিতা- এই রাত্তিরে আসার কোনও ইঙ্গিত না দিলে আসা হত না, আসা যেত না৷ কিন্তু এখন তার সামনে উপলক্ষ এই একটা, নিখিল খুড়া বাড়ি আসপে না- এই কথা ললিতাকে জানানো৷

galpoনিখিলের বাড়ির কোনায় খালের চারের উপর উঠে চারিদিকে তাকাল জলধর৷ খালের জোয়ারের জলে চাঁদের আলো৷ বাতাস আছে৷ জলধর পায়ে কোনও প্রকার জড়তা না-রেখে চার পার হয়ে নেমে রাস্তা রেখে ডাইনে নিখিলের বাড়ি গেল৷ এইদিকে বাড়ি এই একখানা৷ বাড়ির দুই দিকে খাল৷ দুই দিকের খালের পাড়েই গাছ আর বাঁশঝাড়৷ ডাইনের হাতায় খাল রেখে ঘরের দিকে ঢুকতে গেলে সামনের দিকের খালে ছোট্ট ঘাটলাটা চোখে পড়ে৷ শেষদিন যখন এই বাড়ি এসেছিল ওই ঘাটলার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ললিতা, জলধরের মনে আছে৷
উঠানে খুব নিচু করে টর্চেও আলো ফেলল সে৷ চারিদিকে তাকাল৷ পায়ের দিকে দেখল৷ তারপর প্রায় একই পোতায় রান্নাঘর আর বড়ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ডাকল, ‘ও খুড়ি, ঘুমাও নিকি?’
ললিতা জলধরের গলা শুনেই বুঝল, এটা জলধর৷ আর এ-ও বুঝল, আজ আর নন্দর বাপ আসপে না৷ এইরম জলধরও কোনওদিন ধান বেচে না-ফিরলে নন্দর বাপ জলধরের বাড়িতে বলতে গেছে৷ সেইরম নন্দর বাপের না ফেরার কথা বলতে এসেছে জলধর৷
ললিতা ঘুমজড়ানো গলায় উত্তর নেয়, ‘না- আইসো- তোমার খুড়ায় আসে না- এই ঘুমাই আর জাগি-
‘খুড়ায় আসপে না৷ তালেশ্বর যাইয়া নৌকার সামনের দিক ভার বেশি হইচে- জল ওডতে ছেল৷ সেই যার পর ধইন্যেরে দিয়া বস্তা আনতে পাঠাইচে- সেই সোমায় পাইচে আমারে-’ জলধর কথা শেষ করার আগে ললিতা বলল, ‘এতক্ষণ যহন আসে নাই, তখনই বুজজি-
‘সেইয়াব নাম লেহাইলাম আমি- তখনই ম্যানেজার কইল ধান মাপতে মাপতে রাইত আট্টা-’
ললিতা নিচে-পাতা বিছানায় উঠে বসেছে৷ জলধর মেঝেতে টর্চের আলো ফেলে দেখে৷ মশারি একপাশে বেরিয়ে এসে জলধরের টর্চের আলোতে সে শরীরের উপরের দিকে কাপড় ঠিক করে৷
জলধর তার কথা শেষ করে, ‘খুড়ায় আমারে কইল, আইজ রাইতে তোমার ধারে যাইয়া থাকতে৷ ভয়টয় পাও নিকি?’
‘সেইয়া কই এহোন আসলা- এই মাঝরাত্তিরে৷’
জলধর ললিতার এই কথার ইঙ্গিতটা ঠিক বুঝতে পারল না৷ তার মানে, ললিতা চাইছিল জলধর এই কথা বলতে আরও আগে কেন এল না৷ নাকি, জলধর এই মাঝরাত্তিরে কেন এসেছে?
জলধর বলল, ‘হয়- যা কও- দেকলাম স্বামীর জইন্যে কেন উতলা হও তুমি?’
‘আর উতলা?’
জলধর ললিতার কাছে হাঁটুমুড়ে বসেছে৷ মেঝেতে টর্চের আলো ফেলে সেই আলোতে ললিতার ঘুমজড়ানো মুখ দেখে৷ বাম ঘাড় থেকে চুল মুখের একপাশে এসেছে৷ জলধর অন্ধকারে হাতটা বাড়িয়ে ললিতার চুল সরাতে সরাতে বলল, ‘কেন এই নিশি রাইতে খুড়ার জইন্যে উতলা না হইলে আর কার জইন্যে হবা? তোমার কেষ্টঠাউর আচে নিকি?’
‘তুমি যা কও৷’ কিন্তু জলধরে হাতটা সরাল না ললিতা৷ জলধর এই-যে চুল সরিয়ে দিয়েছে তা নিয়ে কোনও আপত্তিও করে না, জলধর বোঝে৷ জলধর বলল, ‘ছওয়াল মাইয়া দুইটা ঘুমাইচে?’
‘হু, কহোন।’
‘কহোন? তয় তুমি জাইগ্গ রইচো কেন, খুড়ি?’
‘খুড়ি?’ ললিতা হাসল৷ জলধর জানে এই হাসির অর্থ৷
‘খুড়ি না তয় কী? ললিতা-’
‘যা মনে লয়, কও৷’
‘দেলা না তোমার বুইনডারে’
‘তা তোমার কোনও কিছু বাইদ্দা আচে?’
‘তুমি জানো না- তোমরা কেউ জানবা না, জানবে না আমার বাপেও৷’
‘কী?’
‘আমার দুঃখ-’
‘কী দুঃখ?’
‘সেয়া যে কীবিলে বুজাই৷ তোমারে দেইক্কা সেই দুঃখ আরও উতলাইয়া ওডে৷’ বলে জলধর ললিতার হাত ধরে তার বুকের মাঝখানে রাখল, ‘এই জায়গায়৷ তোমারে দেইক্কা সেই দুঃখ বাড়ে৷ তোমারে দেইক্কা সেই দুঃখ জুড়াই৷’
‘সেইয়া নাকি?’
‘হয় রে খুড়ি৷ তোমারে না দেখলে পাগল হইয়া যাইতাম৷’
‘হয়৷ পুরুষ মানুষ- তোমাগো কোনও ঠিক নাই৷’
‘না- তুমি বোঝ না? বোঝ না আমারে দেইক্কা? ও খুড়ি, বোঝ না?’ বলে জলধর ললিতার কাছে ঘেঁষে গেল৷ একটু আগে চুল ও ঘাড়ে যেখানে হাত দিয়েছিল, প্রায় সেখানেই হাত দিয়ে, হাতটা একটু নামিয়ে ললিতার গলার কাছে এনে টানল৷ তারপর নিজের মাথাটাও এগিয়ে দিল, ‘হয় রে খুড়ি-।’
ললিতা বাধা দিল না৷ জলধর জানে আর বাধা দেবে না ললিতা৷ ললিতা শুধু বলল, ‘এইরম সংবাদ দেয়ার জইন্যে এই রাইতে আইচো, না?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here