রাজেশ সাহা, কলকাতা : শিয়ালদহ থেকে ডায়মন্ড হারবার, কাকদ্বীপ, নামখানা বা বারুইপুর লোকালে যাতায়াত করা নিত্যযাত্রীদের মধ্যে পার্ক সার্কাস স্টেশন যেন ক্রমেই ত্রাস হয়ে উঠেছে। অভিযোগ, একটু রাত বাড়লেই স্টেশন চত্বর এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা গুলি চলে যায় দুষ্কৃতীদের দখলে। সেই সময় ওই স্টেশন দিয়ে যাতায়াত করা যাত্রীরাও রীতিমতো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, আতঙ্কে ট্রেনে যাতায়াত করছেন মহিলা যাত্রীরা। অভিযোগ দীর্ঘদিনের, সব জেনে শুনেও এখনো পর্যন্ত কোনো সুরাহা করতে পারেনি পুলিশ। তবে সোমবার দোলের দিন চলন্ত ট্রেনে এক মহিলা যাত্রীর উপর প্রস্রাব এবং পাথর ছোড়ার ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ-প্রশাসন। এমন নক্কারজনক ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর অবশেষে মঙ্গলবার শুরু হল পুলিশের তল্লাশি অভিযান। প্রথম দিনেই আটক করা হয় ১৩ জনকে। কিন্তু এই সক্রিয়তার মেয়াদ কতদিন?পুলিশি অভিযান থামলেই আবার যেই কে সেই হয়ে উঠবে পার্ক সার্কাস স্টেশন চত্বর, অভিযোগ নিত্যযাত্রীদের।

সোমবার শিয়ালদহ থেকে ট্রেন ধরে বাড়ি ফেরার পথে পার্ক সার্কাস স্টেশনে আক্রান্ত হন অদিতি দে নামে পেশায় সাংবাদিক এক মহিলা। দোল পূর্ণিমার দিন সন্ধ্যেবেলা ডায়মন্ডহারবার লোকাল এর পেছনের দিকের মহিলা কামরায় উঠেছিল সে। তার অভিযোগ, পার্ক সার্কাস টেশন থেকে ট্রেনটি ছাড়তেই জানালা দিয়ে উড়ে আসে প্রস্রাব ভর্তি প্লাস্টিকের ব্যাগ এবং অসংখ্য পাথর। আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাটি নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে পোস্ট করে প্রথম জানায় সে। অভিযোগকারিণী প্রশ্ন তোলেন, “পাথরের বদলে যদি অ্যাসিড ছোড়া হয়? তাহলে যাত্রীদের সুরক্ষা কোথায়? সন্ধ্যের পর ওই লাইনে যাতায়াত করা রীতিমতো আতঙ্কের হয়ে উঠেছে”। পার্ক সার্কাস স্টেশনের ওপর দিয়ে যাতায়াত করা নিত্যযাত্রীদের অভিযোগ, হামেশাই স্টেশনের আশেপাশের এলাকা থেকে ট্রেনের কামরা লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া হয়। রাত বাড়তেই পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে দুষ্কৃতীদের উৎপাত। পুলিশ সূত্রে খবর, আজ মঙ্গলবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে দুপুরে। সূত্রের খবর, মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে তিনটে নাগাদ পার্ক সার্কাস স্টেশন ছাড়তেই ট্রেনের কামরায় লক্ষ্য করে উড়ে উড়ে আসে পাথর। তার ঘায়ে গুরুতর জখম হন এক মহিলা যাত্রী, ভেঙে যায় তার মোবাইলটিও। এই ঘটনাতেও মঙ্গলবার বালিগঞ্জ জিআরপি থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন ওই মহিলা।

শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখায় দৈনিক যাতায়াত করা যাত্রীদের অভিযোগ, সন্ধ্যের পর থেকেই পার্ক সার্কাস, বালিগঞ্জ, যাদবপুর, ঢাকুরিয়া স্টেশন চত্বর চলে যায় সম্পূর্ণ দুষ্কৃতীদের দখলে। রেললাইনের পাশেই বসে চলে অবাধে মদ্যপান থেকে জুয়ার আসর। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই ঘটনা নতুন নয়, বছরের পর বছর এভাবেই চলছে। সব জেনেও কিছুই জানে না পুলিশ। নিয়ম অনুযায়ী লাইনের দুপাশের এলাকাগুলির নিরাপত্তার ভার জিআরপির হাতে। যা আদতে রাজ্য পুলিশের অধীনে। এই প্রসঙ্গে পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ দপ্তরের এক শীর্ষ আধিকারিক বলেন, “এটি আইন-শৃংখলার বিষয়, যা দেখার কথা জিআরপি থানার পুলিশের, আমাদের নয়”। যদিও নিজেদের গাফিলতির কথা একেবারেই মানতে নারাজ জিআরপি কর্তৃপক্ষ।

সোমবারের ঘটনার পরেই রীতিমতো নড়েচড়ে বসেছে রেলপুলিশ। এদিন সন্ধ্যেবেলা শিয়ালদহ জিআরপি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন অদিতি দে। তার আগেই অভিযোগকারিণীর ফেসবুক পোস্টটি ভাইরাল হয়ে যাওয়ায়, লিখিত অভিযোগের জন্য অপেক্ষা না করে মঙ্গলবার সকাল থেকেই অতি সক্রিয় হয়ে ওঠে জিআরপি এবং রেল পুলিশ। এদিন বালিগঞ্জ জিআরপির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় অভিযোগকারিণীর সঙ্গে। সন্ধ্যা বেলায় তাকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পুলিশ আধিকারিকরা। মঙ্গলবার দুপুরে বিশাল বাহিনী নিয়ে ঘটনা পার্ক সার্কাস স্টেশন এর আশেপাশে যৌথ ভাবে তল্লাশি অভিযান চালায় জিআরপি এবং আরপিএফ। এই তল্লাশি অভিযানে উপস্থিত ছিলেন শিয়ালদহের ডিভিশনের রেল পুলিশ সুপার বিনোদ চন্দ্রশেখর নিজেও।

পুলিশ সূত্রে খবর, শুধু মঙ্গলবারই তল্লাশি অভিযানে বালিগঞ্জ এলাকা থেকে ৮ জন এবং শিয়ালদহের আশপাশ থেকে ৫ জন, মোট ১৩ জনকে আটক করা হয়েছে। এদিন রেল পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, “এবার থেকে রেললাইন চত্বর দুষ্কৃতীদের কবলমুক্ত করতে নিয়মিত তল্লাশি অভিযান চালাবে পুলিশ। অপরাধপ্রবণ এলাকা গুলিকে আলাদা করে চিহ্নিত করে পুলিশের নজরদারি আরও জোরদার করা হবে”। এছাড়াও সন্ধ্যের পরে যাতায়াত করা ট্রেন গুলির মহিলা কামরায় পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন রেল। সোমবারের ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার না হলেও, দু-একদিনের মধ্যেই অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা যাবে বলে আশাবাদী জিআরপি আধিকারিকরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here