শংকর রায়: দেশ কাল ও সমাজ চেতনার দীপ্তিতে, বাংলা কবিতায় একজন সুভাষ মুখোপাধ্যায় আছেন, আছেন একজন শঙ্খ ঘোষ। ‘যমুনাবতী’ কবিতার পঙ্‌ক্তি উচ্চারণ করতে করতে আমরা আজীবন পথ হেঁটেছি – ‘নিভন্ত এই চুল্লিতে মা / একটু আগুন দে’। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা, বিনয় চক্রবর্তীর সুরে গেয়ে এসেছি আজ চল্লিশ-বিয়াল্লিশ বছর – ‘মানুষ রে, তুই সমস্ত রাত জেগে / নতুন করে পড়, / জন্মভূমির বর্ণপরিচয় / … / রাজেশ্বরী জননী তোর তাই উপোসে / রাত্রি কাটায় / বোঝে না তোর মুখের ভাষা!’ সমাজচেতনার অনন্য প্রতিভাসে অপর উত্তরসূরি বলা যায় কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত। এঁদের কবিকৃতি তারকা-খচিত ইতিহাস। ইতিহাসটা আগে-পরে কম দীর্ঘ নয়, কম প্রশস্ত নয়।

প্রজন্মান্তরে, এই ওজঃগুণ-টিও বর্তায় প্রধানতম কবি জয় গোস্বামীর বহুবর্ণ কাব্যসম্ভারে। স্মরণ করুণ ‘মা নিষাদ’ : ‘হাতের পদ্ম মাটিতে আছড়ে পড়ে / সে মাটিতে শুধু গহ্বর, গহ্বর’। জেহানাবাদে পিশাচ সন্ত্রাসে রচিত তাঁর দীর্ঘকবিতা – ‘ন হন্যতে’ বা মনে করুন ‘শান্তিকল্যাণ’ – এইসব কবিতায় দধীচির হাড় আছে। এই কবিতার অভিঘাতে হিংস্র প্রশাসকের গিলোটিন-স্ট্যান্ড কেঁপে ওঠে যুগে যুগান্তরে। অগ্নিজ-ধিক্কার ও মাতৃমমতায় কবি, বজ্রশক্তি সঞ্চার করেন শিরদাঁড়ায়। সভ্যতার সহস্র পতনেও উড্ডীন থাকে মানবের জয়-পতাকা, আমরা বলি – জাতীয় কবি।

জনগণনন্দিত এই চলনটিতে বাংলা কবিতার উত্তীর্ণ পর্বে, মাত্র অল্পদিন আগে প্রকাশিত হয়েছিল কবি প্রসূন ভৌমিকের স্ট্রাইকিং কাব্যগ্রন্থ – ‘দ্বেষ’।না বললে হয় না, কবি প্রসূন ভৌমিক, নব্বই দশকের কবিদের এক ঐশ্বর্য। এখন ‘ধানসিড়ি’ জানুয়ারি মাসে প্রকাশ করছেন কবির নতুন কবিতার বই – ‘প্রতিরক্ষা লিখে যাই’। পাঁচ হাজার বছরের গর্বিত ঐতিহ্যের দেশ আমাদের, আমাদের চারিপাশ আজ কী-জানি কীসের অভিশাপে কী-এক কালঘুমে ক্রমেই আচ্ছন্ন হয়ে আসছে। এরকম এক নেতি অবস্থানে দাঁড়িয়ে আমি প্রসূনের প্রতিটি নতুন কবিতা পাঠ করেছি অনেক বার। দেখেছি অবদমিত মানুষের মগজে ভাষা দিতে চেয়েছেন কবি – ‘অনন্ত অশৌচ যেন গ্রাস করে আছে মহাদেশ’ (দরবেশ)। ‘কবিতা লিখি না আমি, প্রতিরক্ষা লিখে যাই রোজ’ (প্রতিরক্ষা)।

‘প্রতিরক্ষা লিখে যাই’ কাব্যগ্রন্থ থেকে এরকম অগোছালো কিছু পঙ্ক্তি উদ্ধৃতি চিহ্নের ভিতর উল্লেখ করছি – ‘গুরুর আদেশে কাল খাতা ও কলম কিনলাম’ (বাঙ্কার)। ‘ইস্যু ঘোরানোর মতো বাঁকা চাঁদ উঠেছে আকাশে’। ‘মিডিয়া হাউস জানে জোছনাকে কখন কীভাবে / কার ওপরে ফেলতে হয়, খেলা ঘুরবে কখন কীভাবে / চাষির ঝুলন্ত দেহ পর্দার পিছনে চলে যায়’ (বেতাল)। ‘বর্তমানে গুপ্তঘরে বসুন্ধরা বাঁটোয়ারা হয়’ (গুপ্তঘর)। ‘প্ল্যান্ট করা সন্ত্রাসের পরে ভাসবে ইসলামিক যোগ / প্রভুর আদেশ মতো রিপোর্টার চ্যাঁচাবে বুম হাতে’ (ফর্মূলা ওয়ান)। ‘টিভিতে সীমান্ত যুদ্ধ, মূল্যবৃদ্ধি তৃতীয় পাতায়’ (অনাথ আশ্রম)। ‘আমি বিজ্ঞাপনে দেখি সুপারস্টার বেচছে ডিটারজেন্ট’ (যাদুঘর)। ‘শাসক সংলাপ লেখে, ডিরেক্টর বানায় সিনেমা’ (ব্লকবাস্টার)। ‘সন্ধ্যায় মজলিশে বসবে খেয়োখেয়ি মাছের বাজার’ (অদৃশ্য রাঁধুনি)। ‘চিকিৎসা মূলত ব্যাবসা, ব্যাধিঘরে লগ্নি করে লোক’ (ব্যাধি)। ‘হারানো বাতির স্তম্ভে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ওঠে সাপ’ (সাপ)। ‘খুনের প্রস্তুতি নিতে রেইকি করে গিয়েছে ঘাতক’ (বর্ণপরিচয়)। ‘কোমরে তাবিজ বেঁধে আত্মরক্ষা করা অসম্ভব’ (প্রতিরক্ষা)। ‘পূজারির ছদ্মবেশে মন্দিরে পিশাচ পুজো করে / পূজন সম্পন্ন হলে বিধাতার অলংকার লুঠ / বিধাতা পাহাড়, গ্রাম, বিধাতা কৃষির বীজতলা / বিধাতাকে কিডন্যাপ করেছে অশনি বাহুবল’ (দরবেশ)। ‘মনের আছে দীক্ষাগুরু মনের আছে একলা তপোবন’ (মহৌষধ)। ‘লাটাই ধরেছে মন, ঘরে তার গোটা মহাকাশ’ (ফর্মূলা ওয়ান)। ‘ধ্রুপদি পুকুরে রোজ আছড়ে পড়ে কলঙ্কিত চাঁদ’ (যাদুঘর)। ‘কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স থেকে তুলে আনে মৃত্যুঞ্জয়ী সুধা’ / গোধূলি আলোয় কেউ পরজন্ম বাঁশরি বাজায়’ (সংকেত)। ‘নতুন গোলাপ ফোটে, কারা দেখতে চাও হাত তোলো /এ বাড়ির গর্ভঘরে ম ম করছে সে ফুলের ঘ্রাণ / প্রতিরাত্রে ভোগারতি…’ (প্রহরা)। ‘ঘরে ঘরে বিদ্রোহের ধুনো জ্বলে, আরতি আজান’ (অক্টোপাস)। ‘… আরশিনগরের কোণে গৃহ / সে শোনায় ভয় হতে অভয়ের গীতিকাব্যবাণী / পিঞ্জরে বিহঙ্গ পায় অন্তহীন ডানার আকাশ’ (অভয়)। ‘এ শরীর বিক্রমের, পিঠে ঝুলছে কবিতা বেতাল’ (বেতাল)।

জাঁ পল সার্ত্রে বলছেন : সময় আসে যখন কলম রেখে লেখক অস্ত্র তুলে নেয়। অক্ষর-শব্দ-বাক্য বস্তুত কবির সেই অস্ত্র, ‘জ্বলন্ত অক্ষর ছোটে, বুলেটের বেশি তার গতি’ (শ্লোক)। ‘গহিন গুম্ফার মধ্যে একা একা গান করছে কেউ’। ‘গ্রন্থটি নির্মিত হল, পেটে তার বিস্ফোরক বাঁধা / স্বরবর্ণ বেঁধে রাখে ব্যঞ্জনের যুক্তবর্ণের ধ্বনি’ (মিলন)। ‘পুলিশি হানায় প্রেস, বাজেয়াপ্ত হল পাণ্ডুলিপি / গ্রন্থটি নিষিদ্ধ হল, কাব্য পৌঁছে গেছে ঘরে ঘরে’ (নিষিদ্ধ)।

‘পাখিরই শিসের সুরে বাক্যগুলি হয়ে ওঠে গান / গুনগুন করতে করতে সহসা ট্রাফিক সিগনালে / এলোমেলো উড়তে থাকে জেলভাঙা কবিতা বাগান’ (মুক্তি)। ‘ভোরে ডাকনাম ধরে শিস দিয়ে পাখি ডেকে দেয় / তার গলা অবিকল মা যেমন ঘুম ভাঙিয়ে দিত’ (গুপ্তকথা)। রূপসি বাংলার ঘাটে তার জন্য স্তন্য ঝরে পড়ে / সেই স্তন্যপান লোভে এসেছেন প্রয়াত কবিরা’ (স্তন্য)।

এহেন গূঢ় পঙ্ক্তি বাংলা কবিতায় খুব সহজলভ্য নয় – ‘অন্ধ পথে পথে খোঁজে চুরি যাওয়া মায়াবী চাদর / বিদ্যাপতি স্নানে যান, পুথি তাঁর ভরে ওঠে শ্লোকে!’ শ্লোক)।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here