‘প্রতারককে’ অপহরণ, গ্রেফতার খোদ পুলিশ কর্মী ও বিএসএফ জওয়ান

0
kolkata bengali news

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: টাকার বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েও চাকরি না পেয়ে তার উপর বেজায় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন চাকরি প্রার্থীরা। বারবার চেয়েও ফেরত মেলেনি সেই বিপুল পরিমাণ অর্থ। অবশেষে প্রতারককে বাগে আনতে তাঁকে অস্ত্র দেখিয়ে অপহরণই করে বসলেন তিন জন পুলিশকর্মী ও এক বিএসএফ জওয়ান। যার জেরেই প্রতারক এবং অভিযোগকারী, একসঙ্গে গ্রেফতার হতে হল সকলকেই। এমনই তাজ্জব ঘটনা ঘটেছে কলকাতার বউবাজার থানা এলাকায়। ঘটনাক্রম দেখে চোখ কপালে উঠেছে তাবড় পুলিশ আধিকারিকদেরও। গোটা ঘটনার চিত্রনাট্য বিস্মিত করেছে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দাদেরও।

ঘটনার সূত্রপাত, বেশ কয়েক মাস আগে। অভিযোগ, উত্তর চব্বিশ পরগনার খড়দার বাসিন্দা সৌমেন বসু নামে এক ব্যক্তি গ্রুপ ডি-তে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়েছিলেন লাভপুরের কয়েকজন বাসিন্দার থেকে। যাদের নিকট আত্মীয়রা কর্মরত খোদ পুলিশ বাহিনীতেই। অভিযোগ, চাকরি না পেয়ে বারবার টাকা ফেরত চাইলেও কোনও সদর্থক সাড়া মেলেনি অভিযুক্তের তরফে। এর পরেই ক্ষুব্ধ হয়ে অভিযুক্ত সৌমেন বসুকে জব্দ করার ছক কষেন তিনজন ব্যক্তি। তাদেরকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন আরও তিন জন। পুলিশ সূত্রে খবর, ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে দুজন কলকাতা পুলিশের কনস্টেবল পদে কর্মরত, একজন পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ এবং একজন বিএসএফ জওয়ান। বাকি দুজন তাঁদের বন্ধু বলেই জানা গিয়েছে। মোট ৬জন ব্যক্তি একত্রিত হয়ে বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টে নাগাদ কলকাতার চাঁদনি চকের ই-মলের সামনে অভিযুক্ত সৌমেন বসুকে ডেকে পাঠায়। টাকা নিতে এলে সৌমেনকে আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে জোর করে একটি বোলেরো এসইউভি গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। তাঁকে গাড়িতে তুলেই চম্পট দেয় দুষ্কৃতীদের ওই দল। ভরদুপুরে প্রকাশ্য রাস্তায় এমন অপহরণ দেখে ব্যপক চাঞ্চল্য ছড়ায় এলাকায়। স্থানীয়দের থেকে খবর আসে লালবাজার কন্ট্রোল রুমে। এরপরেই তদন্ত শুরু করে বউবাজার থানার পুলিশ ও লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগ।

পুলিশ সূত্রে খবর, তদন্তের শুরুতেই খতিয়ে দেখা হয় ওই এলাকার একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ। চাঁদনী এলাকার বিভিন্ন রাস্তা থেকে সংগ্রহ করা ফুটেজ খতিয়ে দেখে জানা যায়, অপহরণের পরই দ্বিতীয় হুগলি সেতু ধরে গাড়িটি শহর থেকে পগার পার হয়েছে। তদন্তে একমাত্র ক্লু বলতে সিসিটিভি থেকে পাওয়া যায়, গাড়িটির নাম্বার। জানা যায়, গাড়িটির মালিক আলম শেখ, বীরভূম জেলার লাভপুরের বাসিন্দা। এরপরেই বউবাজার থানার পুলিশ বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে বীরভূমের লাভপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় কলকাতা পুলিশের গুন্ডা দমন শাখা। ইতিমধ্যেই লালবাজারের তরফে খবর পেয়ে সক্রিয় হয় লাভপুর থানার পুলিশও। নাম্বার প্লেটের সূত্র ধরে দ্রুত আটক করা হয় বোলেরো গাড়িটিকে। সেখান থেকেই গ্রেফতার করা হয় গাড়ির চালক শেখ সুলেমানকে। তাকে জেরা করেই হদিশ মেলে বাকি ৬জন অভিযুক্তের। এরপরেই কলকাতা পুলিশের যৌথ বাহিনীর হাতে এক এক করে ধরা পড়ে ৬জন অভিযুক্তই। উদ্ধার করা হয় অপহৃত ব্যক্তি সৌমেন বসুকেও। বাজেয়াপ্ত হয় অপহরণের কাজে ব্যবহার করা বোলেরো গাড়ি এবং একটি সেভেন এমএম পিস্তল। লালবাজার সূত্রের খবর, ধৃতদের মধ্যে লাভপুরের বাসিন্দা মহাম্মদ হানিফ পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কনস্টেবল পদে কর্মরত, এছাড়া মালদার বাসিন্দা শ্যামল মণ্ডল এবং বীরভূমের সাঁইথিয়ার বাসিন্দা জাকির খান দুজনেই কলকাতা পুলিশের কনস্টেবল। পাশাপাশি লাভপুরের বাসিন্দা আমির হোসেন বিএসএফ জওয়ান বলে জানতে পারে পুলিশ। গাড়ির চালক শেখ সুলেমান এবং বাকি ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে বউবাজার থানার পুলিশ। লালবাজারের দাবি, জেরায় নিজেদের অপরাধ কবুল করেছে ধৃত সকলেই।

এই পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু এরপরেই হঠাৎ নয়া মোড় নিতে শুরু করে গোটা ঘটনা। পুলিশ সূত্রে খবর, প্রাথমিক জেরার সময়ই প্রথম সামনে আসে অপহৃত ব্যক্তি সৌমেন বসুর প্রতারণা চক্রের জড়িত থাকার তথ্য। জেরায় ধৃতরা অভিযোগ করে, চাকরি দেওয়ার নাম করে তাদের থেকে প্রায় এক কোটি টাকারও বেশি অর্থ নিয়েছিল সৌমেন। এরপরেই ধৃতদের মধ্যে একজনের অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হয় উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি সোমেন বসুকেও। প্রাথমিক জেরায় সে নিজের অপরাধ কবুল করেছে বলে জানা গিয়েছে। খড়দার বাসিন্দা ধৃত সৌমেন বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২০বি, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ধারায় মামলা রুজু করেছে পুলিশ। পাশাপাশি গ্রেপ্তার হওয়া অপর সাতজনের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনের পাশাপাশি ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৬৫, ৩৮৭, ৪১৯, ১৭০, ১২০বি ধারায় মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে বউবাজার থানার পুলিশ। সব মিলিয়ে ‘প্রতারককে’ অপহরণের অভিযোগে খোদ পুলিশকর্মীর গ্রেফতার হওয়ার ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই ক্ষুব্ধ রাজ্য প্রশাসন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here