রাজেশ সাহা, কলকাতা: মঙ্গলবার সকাল ১১টা বেজে ৩০মিনিট। মিঞাবাগান বাস স্ট্যান্ডের কাছে বেলেঘাটা মেইন রোডের ওপর বাণি বিদ্যামন্দির স্কুল। মাধ্যমিক পরীক্ষার সিট পড়ায় স্কুলের ভিতরে ও বাইরে ছাত্রী ও অভিভাবকদের ভিড়। পড়ুয়াদের নিরাপত্তায় মোতায়েন রয়েছেন পুলিশ কর্মীরাও। নিরাপত্তা ব্যবস্থার তদারকি করতে স্কুলে পৌঁছলেন খোদ বেলেঘাটা থানার ওসি প্রদীপ ঘোষাল। এমন সময় থানার বড়বাবুর চোখ পড়ল স্কুলের বাইরে ইউনিফর্ম পরে ভয়ার্ত মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এক ছাত্রীর ওপর। বিষয়টি সন্দেহজনক ঠেকায় নিজেই এগিয়ে গিয়ে ওই ছাত্রীর কাছে জানতে চাইলেন কোনও সমস্যা হয়েছে কিনা। কাচুমাচু মুখে বড়বাবুকে ওই ছাত্রী জানায়, সে পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড খুঁজে পাচ্ছে না। বোধহয় বাড়িতে ফেলে এসেছে। তার বাড়ি ফুলবাগান এলাকায় বলেও জানায় সে। এদিকে বাংলা পরীক্ষা শুরু হতে আর মাত্র আধ ঘন্টা মতো বাকি। কি করবে ভেবেই বিচলিত হয়ে পড়েছে ওই ছাত্রী।

চোখের সামনে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী অসুবিধায় পড়েছে দেখে হাত গুটিয়েও বসে থাকতে পারেননি প্রদীপ বাবু। তাঁর অধস্তন পুলিশ আধিকারিককে দ্রুত নির্দেশ দেন ওই ছাত্রীর বাড়ি থেকে তার এডমিট কার্ড নিয়ে আসতে। ওসির নির্দেশ পেয়ে বেলেঘাটা থানার পুলিশ রওনা দেয় ফুলবাগানের উদ্দেশ্যে। এদিকে অনিশা সিং নামের ওই ছাত্রীকে নিয়ে স্কুলের ভিতরে যান ওসি প্রদীপ ঘোষাল। স্কুল কর্তৃপক্ষকে গোটা বিষয়টি জানিয়ে অনুরোধ করেন, এডমিট আসতে দেরি হলেও যেন তাকে পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হয়। পুলিশের অনুরোধে সাড়া দেয় বাণি বিদ্যামন্দিরের শিক্ষিকারাও। পরীক্ষার হলে নিজের নির্দিষ্ট আসনে গিয়ে বসে অনিশা। যদিও পরীক্ষা শুরুর দশ মিনিট বাকি থাকতেই পুকিশের তত্বাবধানে অ্যাডমিট পৌঁছে যায় যথাস্থানে।

অন্যদিকে উত্তর কলকাতার এক রাস্তায় বাগবাজার মাল্টিপার্পাস স্কুলের এক ছাত্রী আটকে পড়েছে খবর আসে শ্যামবাজার ট্রাফিক গার্ডে। কর্তব্যরত এক ট্রাফিক সার্জেন্ট গোটা বিষয়টি দ্রুত নজরে আনেন উর্ধতন কর্তৃপক্ষের। খবর পেয়ে বিন্দুমাত্র অপেক্ষা না করে নিজের গাড়িতেই ছেড়ে দেন শ্যামবাজার ট্রাফিক গার্ডের ওসি রাজকুমার সিং। খোদ বড়বাবুর গাড়িতে করে আটকে পড়া ওই ছাত্রীকে কয়েক মিনিটের মধ্যেই হলি চাইল্ড স্কুলে পৌঁছে যেন কর্তব্যরত ট্রাফিক সার্জেন্ট। সময়ের আগেই নিজের নির্ধারিত আসনে বসে ভালো ভাবে পরীক্ষা দিতে পারে ওই ছাত্রী।

এদিনই দুপুর সাড়ে তিনটে নাগাদ নারকেলডাঙ্গা মেইন রোডে টহলরত পুলিশ আধিকারিকদের নজরে আসে, রাস্তার ওপর পড়ে রয়েছে একটি পরিত্যক্ত স্কুল ব্যাগ। টহলদার পুলিশ আধিকারিকরা ব্যাগটি সংগ্রহ করে থানায় নিয়ে এসে পরীক্ষা করেন। পুলিশ সূত্রে খবর, ব্যাগটির ভেতর থেকে ফতেমা খাতুন নামে এক মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর অ্যাডমিট কার্ড এবং রেজিস্ট্রেশন কার্ড পাওয়া যায়। অবিলম্বে ওই ছাত্রীকে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রগুলি ফেরত দিতে থানার আধিকারিকদের মধ্যে শুরু হয় জোর তৎপরতা। ফতেমা খাতুনের বাড়ি খুঁজে পেতে বিস্তারিত খোঁজ খবর শুরু করে নারকেলডাঙ্গা থানার পুলিশ। এরপর প্রায় ঘণ্টা দুয়েক নারকেলডাঙ্গা থানা এলাকার প্রত্যেকটা পাড়া ধরে ধরে রীতিমত এলাকা চোষে ফেলেন পুলিশকর্মীরা। ফলস্বরূপ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ৮৯/ এইচ/ সি নর্থ নারকেলডাঙ্গা রোডে হদিস পাওয়া যায় ওই পরীক্ষার্থীর বাড়ির। এরপর তার বাড়িতে গিয়ে রাস্তায় ফেলে আসা ব্যাগ পৌঁছে দেন নারকেলডাঙ্গা থানার ওসি। প্রথম দিনেই পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে অ্যাডমিট কার্ড এবং রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট হারিয়ে ফেলে ততক্ষনে প্রায় শোচনীয় অবস্থা হয়ে গিয়েছিল ফতেমা খাতুন নামে ওই মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর। ‘পুলিশ কাকুদের’ থেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এভাবে ব্যাগ ফিরে পাবে, তা স্বপ্নেও ভাবেনি ফতেমা।

কয়েক দিন আগেই কলকাতার পুলিশ কমিশনার অনুজ শর্মা ট্যুইট করে ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্য বার্তা দিয়ে বলেছেন, পরীক্ষার্থীদের কোনও রকম সমস্যা হলেই বিনা সঙ্কোচে লালবাজারের কন্ট্রোল রুমে তা দ্রুত জানাতে। এই জন্য কয়েকটি হেল্পলাইন নম্বরও প্রকাশ করেছেন পুলিশ কমিশনার। নম্বরগুলি হল 9432610446/ 9874903465/ 9432610443/ 9432624365। পাশাপাশি ডায়াল করা যাবে ১০০ নম্বরেও। নিয়ম অনুযায়ী আজ থেকে এলাকায় উচ্চস্বরে মাইক বাজানো নিষেধ। আইন অমান্য করে কোথাও উচ্চস্বরে মাইক বাজানো হলেও দ্রুত পুলিশকে জানাতে পরামর্শ দিয়েছেন পুলিশ কমিশনার অনুজ শর্মা। এছাড়াও পুলিশের তরফে প্রকাশ করা হয়েছে একটি মেডিকেল হেল্পলাইন নম্বর -9830079999।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here