পঞ্চসায় কাণ্ডে আদৌ গণধর্ষণ? ধন্দ্বে পুলিশই! গোপন জবানবন্দি দেবে নির্যাতিতা

0
kolkata bengali news

রাজেশ সাহা, কলকাতা: পঞ্চসায়র কাণ্ডে নির্যাতিতা মহিলা আদৌ গণধর্ষণ বা ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন কিনা তা নিয়ে এখনও ধন্দ্বে পুলিশ। এই ঘটনার তদন্তে নেমে পাঁচদিন পর শনিবার রাতে উত্তম রাম নামে এক নীল-সাদা ট্যাক্সির ড্রাইভারকে গ্রেফতার করা হয়। ধৃত এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে জেরায় স্বীকার করেছে বলে দাবি পুলিশের। ঘটনার পর দিন পঞ্চসায়র থানায় গণধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেছিল নির্যাতিতার পরিবার। যদিও তদন্তে নেমে পরিবারের তরফে অভিযোগের বয়ানে একাধিক অসঙ্গতি খুঁজে পায় পুলিশ। লালবাজার সূত্রে খবর, ঘটনার সময় গাড়িতে উত্তম একাই ছিল বলে জেরায় জানিয়েছে সে। অভিযোগকারিণী মহিলাকে গাড়িতে তোলার আগে নয়াবাদে এক বন্ধুর সঙ্গে মদ্যপান করেছিল উত্তম। এরপর ইএম বাইপাসের ধারে বিগ বাজারের কাছ থেকে তাঁকে গাড়িতে তুলেছিল উত্তম। সিসিটিভির ফুটেজ বলছে, বৃদ্ধাশ্রমে ফিরতে অভিযোগকারিণী নিজেই হাত দেখিয়ে গাড়ি থামিয়ে ছিলেন। যদিও পঞ্চসায়রের দিকে না গিয়ে নরেন্দ্রপুরের কাঠিপোতায় গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যায় চালক উত্তম রাম। সূত্রের খবর, গাড়িতে চালকের পাশের আসনে বসে থাকা মহিলাকে অশালীন ভাবে স্পর্শ ও ধস্তাধস্তির কথা স্বীকার করেছে ধৃত। কিন্তু অভিযোগকারিণীকে সে ধর্ষণ করেছিল কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়।

পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনার সময় উত্তম এতোটাই বেশি পরিমাণ মদ্যপান করেছিল যে সব কথা ঠিক করে মনে করতেও অসুবিধা হচ্ছে। পাশাপাশি অভিযোগকারিণী মানসিক ভাবে অসুস্থ হওয়ায় তিনিও একেক বার ঘটনার একেক রকম বিবরণ দিচ্ছেন পুলিশের কাছে। কোনো সময় অনেক কথা মনেও করতে পারছেন না। আবার কখনও অসুস্থতার কারণে ত্রুটিপূর্ণ তথ্য দিচ্ছেন তদন্তকারীদের কাছে। যেই কারণে প্রথম থেকেই তদন্তে যথেষ্ট হোচট খেতে হচ্ছে পুলিশকে। তাই এক্ষেত্রে তদন্তকারী আধিকারিকদের পুরোপুরি ভরসা করে থাকতে হচ্ছে প্রযুক্তি ও মেডিকেল রিপোর্টের ওপরই। অভিযোগকারিণীকে সেদিন আদৌ ধর্ষণ করা হয়েছিল কিনা এ প্রশ্নের উত্তরে লালবাজারের এক কর্তা জানান, “অভিযোগকারিণী নিজেই ঘটনার কথা ঠিক ভাবে বলতে পারছেন না, মেডিকেল রিপোর্ট না এলে এই ব্যাপারে কিছুই স্পষ্ট করে বলা সম্ভব নয়”। কিন্তু ঘটনার সময় গাড়িতে উত্তম যে একাই ছিল তা একপ্রকার নিশ্চিত তদন্তকারী আধিকারিকরা। এই তথ্য যদি সত্যি হয়, তাহলে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৬ডি বা গণধর্ষণের ধারা প্রত্যাহার করে নিতে হবে পুলিশকে। তবে তার জন্য অভিযোগকারিণীর গোপন জবানবন্দির দিকেই তাকিয়ে আছে পুলিশ।

সূত্রের খবর, মঙ্গলবারই আলিপুর আদালতে বিচারকের সামনে গোপন জবানবন্দি দেবেন অভিযোগকারিণীর মহিলা। সেখানে অভিযোগকারিণী বিচারককে কি বলেন, তার ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে তদন্তের গতিপ্রকৃতি ও ধৃতের ভবিষ্যৎ। নির্যাতিতার গোপন জবানবন্দি নিয়ে বেশ চিন্তিত রয়েছেন তদন্তকারী আধিকারিকরাও। কারণ মানসিক সমস্যা থাকায় যে মহিলা পুলিশের কাছেই এই ঘটনার সঙ্গতিপূর্ণ বিবরণ দিচ্ছেন, তিনি বিচারকের সামনে কি বলবেন তা নিয়ে যথেষ্ট ধন্দ্ব রয়েছে। যদিও ধর্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ অপরাধের মামলায় অভিযোগকারিণীর গোপন জবানবন্দির গুরুত্ব মারাত্মক বলেই দাবি আইনজীবীদের। বিচারকের সামনে কি বলেন, তার ওপর অনেকটাই ঝুলে রয়েছে তদন্তের ভবিষ্যত। পুলিশ সূত্রে খবর, নির্যাতিতার মানসিক অসুস্থতার কথা মাথায় রেখে, গোপন জবানবন্দি সময় অভিযোগকারিণীর সঙ্গে একজন মনোবিদ চিকিৎসক কেও রাখা হবে পুলিশের তরফে। তবে তদন্তের গতিপ্রকৃতি এই পথেই এগোলে গণধর্ষণের পাশাপাশি অপহরণের ধারাটিও প্রত্যাহার করতে হবে পুলিশকে। কারণ পুলিশ জানিয়েছে, জোর করে গাড়িতে তুলে নয় বরং নিজেই সেদিন হাত দেখে ট্যাক্সিতে উঠেছিলেন অভিযোগকারিণী। সেই ছবি ধরাও পড়েছে পুলিশের সংগ্রহ করা একাধিক সিসিটিভি ফুটেজে। তবে এই বিষয়ে এই বিষয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলেই জানিয়েছেন কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান মুরলীধর শর্মা। সোমবার তিনি জানান, “ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগকারিণীর গোপন জবানবন্দির জন্যই অপেক্ষা করা হচ্ছে, এরপরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সব মেডিক্যাল রিপোর্টের জন্যও আমরা অপেক্ষা করছি”।

সোমবার উত্তমকে ঘটনাস্থলে গিয়ে অপরাধের পুনর্নির্মাণ করেন করেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। ঘটনার দিন অভিযোগকারিণীকে কোথা থেকে তোলা হয়েছিল, কোথায় নির্যাতন চালানো হয় এবং কোন স্থানে ফেলে যাওয়া হয় গোটাটাই খতিয়ে দেখে পুলিশ। সূত্রের খবর সোমবার ধৃতের মেডিকো লিগাল টেস্ট করেছে ফরেনসিক বিভাগ। বিভিন্ন ধরনের শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি সে ধর্ষণ করতে কতটা সক্ষম বা সেদিন আদৌ ধর্ষণে যুক্ত ছিল কিনা তা স্পষ্ট হতে পারে এই পরীক্ষার মাধ্যমে। যা চার্জ গঠনে পুলিশকে যথেষ্ট সাহায্য করবে। তাই এই তদন্তে পুরোটাই প্রযুক্তি এবং মেডিকেল রিপোর্ট এর উপরেই নির্ভর করতে হচ্ছে তদন্তকারী আধিকারিকের। তবে সাম্প্রতিক অতিতে এই মামলার তদন্তে নেমে কলকাতা পুলিশকে যে পদে পদে যথেষ্টই বেগ পেতে হচ্ছে তা স্বীকার করে নিচ্ছেন লালবাজারের একাধিক শীর্ষ কর্তারাও।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here