সৌরভ দাস: সাংবাদিকতা নিয়ে পাঁচ বছর পড়াশোনা ও অবশেষে সাংবাদিকতায় কাজ করার সুবাদে লেখালিখির অভ্যাস থাকেলও, লেখা তেমন ভাবে হয়ে ওঠে না। কারণ ভিডিও সম্পাদক হওয়ার জন্য সারাদিন ভিডিও নিয়ে কাটাছেঁড়া করতে করতেই সময় চলে যায়। কিন্তু আজ কলম ধরতে খানিকটা বাধ্য হলাম। পশ্চিমবঙ্গ বা সর্বোপরি ভারতবর্ষের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে।

যাক আসল কথায় আসা যাক। আপনাদের ৩৪ বছরের বাম শাসনের কথা মনে পড়ে? ডানপন্থীরা হয়তো বলবেন মনে থাকবে না আবার! সাঁইবাড়ি, মরিচঝাঁপি, ধানতলা, বানতলা, ছোট আঙ্গারিয়া, সূচপূর, কি হালের সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম। এইসব কীর্তিই তো বামেদের, তাই না? যদি আমি বলি, আচ্ছা পশ্চিমবঙ্গে হওয়া সর্বপ্রথম আর্থিক কেলেঙ্কারির কথা মনে আছে? সেখানেও ডানপন্থীরা হয়তো বলবেন, মনে থাকবে না আবার। ‘সঞ্চয়িতা’ সেও তো বামেদের আমলে। মানে এক কথায় যা কিছু অসামাজিক, নোংরা কাজকর্ম সবই বামেদের আমলে শুরু হয়েছে। এ কথা অস্বীকার করব না। সম্ভবত যে সব কারণে পশিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এগুলি ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম।

কিন্তু এবার যদি আমি প্রশ্ন করি তৃণমূল সরকার সাত বছরে কি কোনও দুর্নীতি করেনি? নারদা-সারদার মতো স্ক্যাম কি হয়নি? তৃণমূলপন্থীরা বলবেন, কেন আপনার উন্নয়ন চোখে পড়ছে না? রাস্তাঘাট আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। অস্বীকার করব না, তা বলে রাজনৈতিক হিংসার বলিও যে অনেক মানুষ হয়েছেন বা এখনও প্রতিদিন শিকার হচ্ছেন, সেটাও কোনও ভাবে অস্বীকার করা যাবে না। ঠিক এখানেই তৃণমূলপন্থীরা বলবেন, ও মশাই ‘মরিচঝাঁপি’র কথা কি আপনি ভুলে গেছেন? বাচ্ছা ছেলে, এখনও ঠিক মত সব কিছুই জানো না, তৃণমূলের সমালোচনা করছো কোন সাহসে? না এটা কোনও গল্প নয়, সত্যই ঘটেছে আমার সঙ্গে। কিন্তু সত্য হল যিনি আমায় প্রশ্নটি করেছিলেন তাঁর বয়স আনুমানিক ৩৬-৩৭ হবে, আর ‘মরিঝাপি’র ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭৮ সাল নাগাদ। বাকিটা আপনারাই হয়তো বুঝতে পারছেন।

তাঁকে আরও বলেছিলাম পঞ্চায়েত নির্বাচনে যা কিছু ঘটেছে, সাধারণ মানুষ হিসাবে আপনি কি বলবেন ভোট সুস্থ ও সার্বিক ভাবে হয়েছে? উত্তর পেলাম, ‘কোথায়? নির্বাচনের ফলাফল দেখে নাও। তৃণমূল ভোট বাড়িয়েছে, চারিদিকে যা উন্নয়ন হয়েছে মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ভোট না দিলে তৃণমূল কি এত ভোটে জিততো? আসলে বিগত বছরগুলিতে তৃণমূল চারিদিকে যেভাবে উন্নয়ন করেছে, মানুষ খুশি হয়ে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছে। দেখে নিও ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনে ৪২টা আসনের মধ্যে ৪২টাই পাব।’

আমি বলেছিলাম, ‘ও হ্যাঁ, আমি ভুলে গিয়েছিলাম আপনাদের উন্নয়ন তো আবার রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল। নমিনেশন জমা দেওয়ার দিনগুলোতে, ভোটের দিন অস্ত্র নিয়ে বুথের বাইরে, আর গণনার দিন গণনা কেন্দ্রে। এখন আবার গাছেতেও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে ‘উন্নয়ন’ ঝুলছে। আমি উত্তর পেলাম, ‘সব থেকে বেশি নির্বাচনের দিন কর্মী মরেছে আমাদের। এসব বিরোধীদের চক্রান্ত। তুমি তাহলে জানো না বামফ্রন্ট ৩৪ বছরে কীভাবে ভোট করেছে। সাধারণ মানুষ শান্তিতে বাড়িতে পর্যন্ত থাকতে পারত না। এখন সবাই শান্তিতে নিজের বাড়িতে থাকতে পারে। ২ টাকা কেজি দরের চাল পেয়ে দু বেলা দু’মুঠো পেট ভরে খেতে পায় এটা কি উন্নয়ন নয়?’

হ্যাঁ অবশ্যই। ১৯৯০ সালে নির্বাচনে ৪০০ জন ২০০৩ সালে ৪০ জন মারা গেছেন। ২০১৮ তে তার পরিসংখ্যান তুলনামূলক ভাবে অবশ্যই কম। কিন্তু ডিজিটাল ইন্ডিয়া ‘এরা’র মধ্যে দাঁড়িয়েও ভোট পরবর্তী হিংসার বলিতে যে কত মায়ের কোল কোল খালি হল সেটাও কি উন্নয়ন? এর উত্তর আমি পাইনি এখনও। কিছুটা রেগে গিয়েই আমায় উনি রিপ্লাই দিয়েছিলেন, তুমি ৩৪ বছরকে ভুলে গেলে কি করে? ৩৪ বছরে বামফ্রন্ট হয়তো অনেক খারাপ কাজ করেছিল। তাই মানুষ তাদেরকে সরিয়ে আপনাদেরকে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। আপনারাও যদি একই কাজ করেন তাহলে আপনাদের ও বামফ্রন্টের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়? এর উত্তরও অধরা।

বছর বছর ভোট আসবে ভোট যাবে। সাধারণ মানুষকে পরিশ্রম করেই খেতে হবে। একদিন কাজে না গেলে কোনও রাজনৈতিক দলই খাওয়াতে আসবে না। বরং বড় বড় লিডাররা নিজেদের সম্পতি বাড়াতেই থাকবে। সাধারণ মানুষের ভাগ্যে হয়তো জুটবে তাদের খেয়ে ফেলে দেওয়া কিছু উচ্ছিষ্ট। বাংলার রাজনীতি আমাদের মাতৃভূমি এর আগে এত রক্তাক্ত হতে আমাদের প্রজন্ম অন্তত দেখেনি। আসুন না অঙ্গীকার করি সবাই মিলে, রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে সুন্দর বাংলা গড়ে তুলি।