সৌরভ দাস: আপনাদের খ্রিষ্টপূর্ব ৩৭১ সালের কথা মনে আছে? মনে না থাকাটাই স্বাভাবিক। ৩৭১ ‘বিসি’তে ভারতবর্ষের গর্ব চাণক্য তথা কৌটিল্য জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে কৌটিল্যের কথা কেন বলা হচ্ছে? সাম্প্রতিক পরিস্থিতির জমিতে দাঁড়িয়ে বলতে বাধ্য হচ্ছি বলতে পারেন।

কৌটিল্যের জন্য এক সময় ভারতবর্ষের নাম জগৎ সভায় উজ্জ্বল হয়েছিল, এটা হয়তো কম-বেশি সকলেরই জানার কথা। নেটিজেনরা হয়ত বলবেন, কেন আজও তো দেশের নাম উজ্জ্বল হচ্ছে ইসরো ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য। হ্যাঁ অবশ্যই হচ্ছে, কিন্তু সারা বিশ্বের মগজে আজকাল আমাদের দেশ নিয়ে যে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তা হল, ভারত সহিষ্ণু নাকি অসহিষ্ণু দেশ? যদি মেনে নেওয়াই যায় যে ভারত সহিষ্ণু দেশ, তবে অনেকেই হয়তো নাক উঁচু করবেন, বেশিরভাগ মানুষই হয়তো সহমত পোষণ করবেন এই বিষয়ে।

কিন্তু কেন সহিষ্ণু বলছি আমাদের দেশকে? আমার ব্যক্তিগত পরিসরে যেটুকু ধরে তাই দিয়ে বিচার করার চেষ্টা করব।

আজ এই প্রতিবেদকটি যখন লিখতে বসেছি, তার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেই অসমে দুই নিরীহ ছেলেকে ‘ছেলে ধরা’ সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়েছে। বারবার তারা নিজেদের পরিচয় দিলেও, গ্রামবাসিরা তাদের কথায় কর্ণপাত করেন নি।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যেতেই পারে এটা অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ। হ্যাঁ, অগ্রাহ্য করার কোনও যুক্তিও আপাতত নেই। অসহিষ্ণুতা তো বটেই। কিন্তু নিজের মনকে একবার প্রশ্ন করে দেখুন, গোটা দেশটাই কি দুর্নীতিতে ভরে যায়নি? রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে কোটি মাইল দূরে সরিয়েই ভাবুন। আপনার টাকা, আমার টাকা নিয়ে দেশ থেকে যারা পালিয়ে যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কোনও পদক্ষেপ না নিলেও আমি আপনি কিন্তু চুপ করে বসেই আছি। একবার হয়তো চায়ের দোকানে বসে এর বিরুদ্ধে মুখ খুললেও ওটা দোকানের গণ্ডি পর্যন্তই সীমাবন্ধ, কোনও আন্দোলনের রূপ নেওয়া তো দুরের কথা। যাই হয়ে যাক না কেন, আমরা অর্থাৎ ‘আম আদমি’রা সবই মুখ বুজে সহ্য করে নেই। তাহলে ভারতকে সহিষ্ণু বলে ঠিক করেছি তো?

২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে বিশাল জনসমর্থন নিয়ে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার পরেই সারা দেশে এই ‘অসহিষ্ণুতা’ শব্দের প্রচলন যেন আচমকাই বেড়ে যায়। কিছু কিছু বলিউডের সুপারস্টার তো বলেই বসেন, ভারতে তাদের পরিবার নাকি সুরক্ষিত নয়। এই বিষয়ে বাংলার জনপ্রিয় নাট্যকার কৌশিক করকে প্রশ্ন করা হলে উনি বলেন; শুধু ভারতবর্ষ না। গোটা বিশ্বে এখন অসহিষ্ণুতা মাথা চাড়া দিয়ে বাড়ছে। যার মুল কারণ, একচেটিয়া অর্থনীতি গোটা বিশ্বকে গ্রাস করতে চলেছে। কাশ্মীরে যখন সেনাবাহিনীর উপর পাথর ছোড়া হয়, সেনা তার পাল্টা জবাব দিলে সকলে গেল গেল রব তোলে। কারণ সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের উপর আক্রমণ করেছে যেটা নাকি কাম্য নয়। মানি, অবশ্যই কাম্য নয়। কিন্তু আইনে ‘আত্মরক্ষা’ নামক একটা বিষয় রয়েছে। যা যে কোনও মানুষকে, যে কোনও পরিস্থিতিতে নিজের প্রাণ বাঁচানোর লাইসেন্স টুকু দেয়। একবার ভেবে দেখুন তো, আর্মিও মানুষ। তাদেরও তো প্রাণ আছে।

ছাড়ুন এসব কথা। সন্ত্রাসবাদী আফজল গুরুর ফাঁসির বিরোধিতা করে যখন জেএনইউ ক্যাম্পাসে থেকে ভারত বিরোধী স্লোগান ওঠে, তখন কি মানুষ তাদের পিটিয়ে মারতে যায়? সেটা হয় না কারণ আমাদের দেশ সহিষ্ণু। অসহিষ্ণু দেশ হলে এটা কি সম্ভব হত?

রাইসিনা হিলে ইফতার পার্টি বন্ধ হওয়া নিয়ে অনেকে বলেছেন এটা নাকি কাম্য নয়। কিন্তু আপনাদের মনে আছে কি জানি না, এপিজে আব্দুল কালামও রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন একবার রাইসিনা হিলে ইফতার পার্টি বন্ধ রাখা হয়েছিল। তখন কিন্তু এই ধরনের কথাবার্তা লোকের মুখে মুখে ঘোরে নি। কিন্তু আজ সবাই মুখ খুলছে।

আসলে এখন সবকিছুর মাপকাঠি হল রাজনীতি। রাজনীতিই ঠিক করে দেয় কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল। রাজনৈতিক নেতাদের জ্বালাময়ী ভাষণ এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্কের যুগে আমরাও যতটা না নিজের মগজের ব্যবহার করি, তার থেকে বেশি প্রভাবিত হয়ে পড়ি। জিনিসের দাম বাড়লে আমাদের পকেট কাঁদে। পরিবারের কারও কঠিন অসুখে ধরলে হাসপাতালের বিলের চিন্তা করেই আমাদের শরীর অসুস্থ হয়ে যায়। এর পরেও তো সবাই চুপই থাকি। এখনও বলব আমার দেশ সহিষ্ণু না?

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here