anti-NRC anti-CAB

সৈকত মিস্ত্রী: মানবসভ্যতার ইতিহাস বাস্তুচ্যুতিতে ভরা। দ্বিজাতিতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা দেশ বারে বারে পেয়েছে স্বজন, স্বভূমি হারানোর যন্ত্রণা। ভিটেমাটিহীন হওয়ার ইতিহাস তার স্বত্তা জুড়ে। সেই পুরনো স্মৃতিকেই একালে ফিরিয়ে আনতে তৎপর বিজেপি সরকার। এনআরসি নামক রাষ্ট্রীয় পীড়নে ইতিমধ্যে গৃহহীন অসমের উনিশ লক্ষ মানুষ। বাস্তুহারা হওয়ার আতঙ্কে আত্মহত্যা করেছেন ত্রিশজনের বেশি মানুষ। দেশের শাসকেরা বলছেন, এ রাজ্যেও নাকি দু’কোটি মানুষকে তারা রাষ্ট্রহীন করবেন।

anti-NRC anti-CABক্ষোভ জমছিল। তার সঙ্গে শাসক-নেতাদের এমন হুঙ্কারে ঘৃতাহুতি পড়েছে। এনআরসি রুখতে আতঙ্কিত মানুষ সংগঠিত হয়েছেন। বহু সংগঠন আর মত-পথের মানুষের সমম্বয়ে গড়ে উঠেছিল ‘এনআরসি বিরোধী যুক্ত মঞ্চ’। তাদেরই উদ্যোগে ১৫ তারিখ উত্তরবঙ্গ থেকে সাগরের পথে এনআরসি-বিরোধী প্রচারের বার্তা নিয়ে হাজার কিলোমিটার পাড়ি জমিয়েছিল তারা। আজ সেই যাত্রারই সমাপ্তি হল মহাসম্মেলনের মধ্যে দিয়ে। আন্দোলন চলবে। এ কেবল একটি কর্মসূচির একটি পরিণতিমাত্র।

anti-NRC anti-CABপার্লামেন্টের শীতকাল অধিবেশন এবার শেষের পথে। প্রতর্কহীন বিল পাশের নেশায় মত্ত কেন্দ্রীয় সরকার আজ পার্লামেন্টে পেশ করেছে সিএবি বা সিটিজেনশিপ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল। যার মূলকথা, দেশের ভূমণ্ডলে থাকাটা বড় নয়। নাগরিকত্ব হবে ধর্মের ভিত্তিতে। এক দেশ, এক ধর্ম, এক ভাষার কারিগররা বিস্মৃত হয়েছেন বহুমত, বহুভাষা-সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক মিথষ্ক্রিয়ায় সমৃদ্ধ এদেশের সংস্কৃতি। দেশের সংবিধানের ভাবনাতেও সকলের সহাবস্থানের নীতি। আজ তাকে অকার্যকর করতে বিজেপি যখন ক্যাব পাসে উদগ্র, তখন ‘মিছিল’নগরীতে আবারও দৃশ্যের জন্ম হল। দেশের বহু প্রান্ত থেকে নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষের সমাবেশর সাক্ষী থাকল এই শহর।

anti-NRC anti-CABভারতের দক্ষিণাঞ্চল থেকে যোগ দিলেন প্রগতিশীল নারী আন্দোলনের নেত্রী কবিতা কৃষ্ণন, আবার কাশ্মীরি মানুষের অধিকারহরণের বিরুদ্ধে চাকরি ছেড়ে দেওয়া আইএএস কন্নর গোপীনাথন। মধ্য ভারত থেকে এলেন তরুণ বামপন্থী ছাত্র ও যুব নেতা কানহাইয়া কুমার। আবার এই রাজ্যের জল-জঙ্গল-জমিরক্ষার নেতৃত্ব আদিবাসী নেতা মিলন মান্ডি, মানবাধিকার সংগঠনের রাজ্যনেতা রঞ্জিত শূর, বা উত্তরবঙ্গের বিধায়ক আলি ইমরান ভিক্টর, মঞ্চের সঞ্চালক প্রসেনজিৎ বসু। সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের গবেষক রিকার্ডো জেডি।

anti-NRC anti-CABআদিবাসীরা বারে বারে উৎখাত হয়েছেন জল-জঙ্গল-জমি থেকে। তারা দরিদ্র। কাগজপত্র তাদের বেশিরভাগেরই নেই। ফলে আবারও তারা উৎখাত হবেন এনআরসি হলে। একই কথার প্রতিধ্বনি শোনা গেল আদিবাসী আন্দোলনের কর্মী শরদিন্দু উদ্দীপনের গলায়। এনআরসি আসলে, দরিদ্র মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। জল-জমি-জঙ্গল আরও লুঠ হবে এবার। মানবসভ্যতার ইতিহাস উদ্বাস্তু হওয়ার মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে। তা হলে আজ কী করে একটা সরকার নিজের দেশের লোককে উদ্বাস্তু বানাতে পারে? এনআরসির প্রথম ধাপ এনপিআর। এ রাজ্যের সরকার মুখে এনআরসির বিরুদ্ধে কথা বলছে, আবার এনপিআর ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা চালাচ্ছে। কেন এ রাজ্যে দু’টি ডিটেনশন সেন্টার হচ্ছে? প্রশ্ন তোলেন এই প্রবীণ মানবাধিকার কর্মী। এনপিআর ২০২০-এর এপ্রিলে শুরু হবে। তিনি আরও আহ্বান করেন, সরকারি লোকেরা সমীক্ষা করতে এলে কোনও তথ্য না দিতে।

anti-NRC anti-CABআলি ইমরান ভিক্টর রাজ্য সরকারের এনপিআর ট্রেনিংয়ের বিরোধিতা করে প্রশ্ন তোলেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কটাক্ষ করে বলেন, ‘তা হলে কি দিল্লিতে তাঁর সাথে মোদী সরকারের কোনও চুক্তি হয়েছে? যে কারণে মুখে এনআরসি-বিরোধিতা করলেও এনপিআরের বিরোধিতা তিনি করছেন না?’

anti-NRC anti-CABদেশবাসী হিসেবে দেশকে তিনি ভালবাসেন, দেশের সেবা করতে সিভিল সার্ভিসেও যোগ দিয়েছিলেন ২০১২ ব্যাচের আইএএস কারনান। কিন্তু গোটাকতক মন্ত্রী আর আমলা মিলে এ কোন দেশ গড়ে তুলছেন? এ কোন জহ্লাদের বধ্যভূমি? সংবিধান ১৪ ও ১৫ নং ধারায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের অধিকার ও সমতার কথা বলে, কিন্তু আজ শাসকেরা কোনও আইন, সংবিধান কিছুই মানেন না। কাশ্মীরের মানুষের অধিকারহরণ করলে তিনি সহ্য করতে পারেননি? গণতন্ত্র মতপ্রকাশ করতে বলে, প্রশ্ন তুলতে বলে– এ কোন গণতন্ত্র, যেখানে প্রশ্ন তোলা যায় না? অভিমান ও একরাশ অভিযোগ উগরে দেন কারনান। প্রতিদিন অধিকারহরণের পরও মানুষ এত সহিষ্ণু হয় কী করে? প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে দেশ বাঁচবে না। যারা বুঝেও গা বাঁচিয়ে আছেন, তারা কথা না বললে, প্রতিবাদ না করলে তাদের দেশদ্রোহী ছাড়া কী বলা যায়?

anti-NRC anti-CABসভার শেষপর্বে আবেগময় ভাষায় সিএবি এবং এনআরসির তীব্র বিরোধিতা করেন কানহাইয়া কুমার। প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লেগেছে, তার তাপ আমাদেরও লাগবে। সময় নেই।
মূল্যবৃদ্ধি তীব্র, দেশের অর্থনীতি ধসে গিয়েছে। মানুষ যন্ত্রণায় আছে। শুধু মোদীর কয়েকজন শিল্পপতি বন্ধু ভাল আছেন। মানুষে মানুষে বিভেদ লাগাতে চাইছে বিজেপি। দরিদ্রের বিরুদ্ধে এই লড়াইতে নেমেছে আদানি-আম্বানির সরকার। লুঠ চলছে। দরকার লড়াই। কানহাইয়ার এই আহ্বান সভায় আলাদা মাত্রা যোগ করে। জাতপাতহীন এক নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্নের কথা বলে শীতের বিকেলে সভা শেষ হয়।

anti-NRC anti-CABএই লড়াই ‘আজাদির’। ক্ষুধা, বিভেদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here