বিশেষ প্রতিনিধি, কলকাতা: রাজ্যসরকারের আশ্বাসে সোমবার থেকে গণপরিবহণে অচলাবস্থা কিছুটা কাটবে বলে আশায় বুক বেঁধে ছিলেন সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েও রুজির তাগিদে পথে বেরনো সাধারণ মানুষ। কিন্তু দিনের শেষে সেই আশা পর্যবসিত হল হতাশায়। ভাড়া নিয়ে অচলাবস্থার জেরে রবিবার থেকেই পরিষেবা বন্ধ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল একাধিক বাস মালিক সংগঠন। সেই মত রবিবার সকাল থেকে শহরের রাজপথ থেকে কার্যত উধাও হয়ে যায় বিভিন্ন রুটের বেসরকারি বাস। পরিবহণ দপ্তরের হিসাবে এই ক’দিন গড়ে আড়াই হাজার বেসরকারি বাস পথে নামছিল। এদিন  থেকেই বসে গেছে তার অধিকাংশই। মঙ্গলবার থেকে বাসের সংখ্যা আরও কমতে পারে বলে আশঙ্কা। অন্যদিকে মঙ্গলবার থেকে মেট্রো রেল চালানোর ব্যপারে রাজ্য সরকারের সঙ্গে মেট্রো কর্তৃপক্ষের বৈঠকে ফলপ্রসূ কোনও সিদ্ধান্ত না হওয়ায় আশু মেট্রো পরিষেবা শুরু হওয়ার সম্ভাবনাও কার্যত বিশবাঁও জলে বলে প্রশাসনিক কর্তাদের অভিমত। সব মিলিয়ে রাজ্যের মানুষের নিত্যকার যানযন্ত্রণা আগামীদিনেও অব্যাহত থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বেসরকারি বাস মালিক সংগঠন যদিও এই অচলাবস্থার জন্য ভাড়া নিয়ে রাজ্য সরকারের অনড় মনোভাবকেই দায়ী করেছেন। ভাড়া না বাড়িয়ে বেসরাকরি বাস পিছু ১৫ হাজার টাকা করে ভর্তুকি দেওয়ার কথা সরকার ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করেছেন বাস মালিকেরা। রবিবারই তারা বাস বন্ধ করার কথা ঘোষণা করেছিলেন। সেই অনুযায়ী সোমবার সকাল থেকেই বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছে শহর ও শহরতলির প্রায় সমস্ত রুটে। যার ফলে সকালে অফিসের পথে বেরিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হয়  নিত্যযাত্রীদের। অন্য ছবি দেখা যায় উত্তর ২৪ পরগনার বারাসত বাসস্ট্যান্ডে। সেখানে বাস চালানো নিয়ে শ্রমিক–মালিকদের মধ্যে রীতিমতো বচসা বেঁধে যায়। সোমবার সকালে বারাসত বাসস্ট্যান্ড থেকে বাস চলাচল শুরু হলেও পরে বাসের সামনে বসে পড়ে তা বন্ধ করে দেন বাসমালিকরা। এরপরই শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকদের বিবাদ বেঁধে যায়। শ্রমিকদের দাবি, অতিরিক্ত মুনাফার জন্য সরকারকে ব্ল্যাকমেল করছেন বাসমালিকরা। মালিকদের পালটা দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে রোজ ঘর থেকে টাকা দিয়ে বাস চালাতে হচ্ছে। তা বোঝার ক্ষমতা নেই শ্রমিকদের। বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে যাত্রীদের। বাসস্ট্যান্ডে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন তাঁরা। সরকারি বাস চললেও যাত্রীর সংখ্যার তুলনায় তা ছিল নিতান্তই কম।

এদিকে মেট্রো চলাচল ফের শুরু করার বিষয়ে আলোচনা করতে কলকাতা মেট্রো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এদিন রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বৈঠকে যোগ দেন স্বরাষ্ট্রসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়, পুলিশ কমিশনার অনুজ শর্মা, পরিবহণসচিব প্রভাত মিশ্র এবং ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মা। কলকাতা মেট্রোর পক্ষ থেকে এই বৈঠকে ছিলেন সংস্থার জেনারেল ম্যানেজার মনোজ জোশী ও চিফ অপারেটিং ম্যানেজার সাত্যকি নাথ। সেখানে মেট্রো রেলের তরফে স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দেওয়া হয় রাজ্য সরকার যেভাবে চাইছে সেই ফর্মুলা মেনে এখনই পরিষেবা শুরু করা সম্ভব নয়। তবে শুধুমাত্র জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি বা করোনা যোদ্ধাদের জন্য পরিষেবা শুরু করা যেতে পারে। মেট্রো রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমাদের কর্মীর সমস্যা আছে। সীমিত সংখ্যায় মেট্রো চালাতে পারব। আমাদের তরফে রাজ্য সরকারকে সব কিছু জানানো হয়েছে। রাজ্য সরকার রেল মন্ত্রকের সঙ্গে কথা বলবে। রেল মন্ত্রক, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের কাছ থেকে নির্দেশ এলে পরিষেবা দেওয়া সম্ভব।’

রেল মন্ত্রক আগামী ১২ অগস্ট পর্যন্ত লোকাল-সহ প্যাসেঞ্জার ট্রেন পরিষেবা স্থগিত রেখেছে। তার মধ্যে মেট্রোও রয়েছে। তবে কোনও রাজ্য যদি চায়, তা হলে পরিষেবার দেওয়ার বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে রেল মন্ত্রক সূত্রে।

রাজ্য সরকারও মেট্রো কর্তৃপক্ষের কথা মেনে নিযে আপাতত বিশেষ মেট্রো চলাচলে সম্মতি দিয়েছে। এদিন নবান্নে এ বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমরা মেট্রো কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরিষেবা চালু করতে। সবার জন্য পরিষেবা চালু করতে। কিন্তু মেট্রো এখন সীমিত পরিষেবা চালু করতে চাইছে। সরকারি কর্মী বা জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যাঁরা যুক্ত তাঁদের মেট্রো চড়ার সুযোগ দেওয়া হবে। সেটা চালু করলেও অনেকে মেট্রোয় চড়ার সুযোগ পাবেন। তা হলে বাস ফাঁকা হবে। সেখানে অন্যরা সুযোগ পাবেন। ওঁরা একটা অ্যাপও তৈরি করছেন।’  কিন্তু এই ভাবে মেট্রো চলাচল শুরু হলেও পরিবহণ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলে ওয়াকিবহাল মহলের অভিমত। লকডাউনের আগে কলকাতা মেট্রোতে দৈনিক গড়ে ৬-৭ লক্ষ মানুষ যাতায়াত করতেন। এদের মধ্যে এক থেকে দুই শতাংশ জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। বাকিদের কী হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here