কুণাল বিশ্বাস: অভিমন্যুর মতো শ্রবণে সজাগ এক মেধাবী-ভ্রূণ। তার কাছে সরগম শেখার প্রাইমারি স্কুল অবশ্যই মায়ের গর্ভ। উত্তর-পূর্ব ভারত এবং বাংলার তামাম লোকগীতি আহরণ করা একনিষ্ঠ ফকির মৌমাছি আত্মদুর্গ রক্ষায় তৎপর— তাই রক, পপ, ডিস্কো, ক্যাবারে নিয়ে বেশি মাতামাতি হলে বলেই দেন— `ওসব বিদেশি অর্কিড দেশের মাটিতে বাঁচবে না।’ ভ্রূণটি মায়ের পেটে বসেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় প্রবাদপ্রতিম বাবার দিকে। এরকমই এক দম্পতির (মীরা দেববর্মন-শচীন দেববর্মন) একমাত্র ঔরস ও কৃষ্টিজাত সুরটি হল ‘পঞ্চম’— সকলের আর ডি বর্মন!

বালকটি সলিল চৌধুরির সুরে মুগ্ধ। সলিলের সুরে যেন কতকিছু খেলা করে একসাথে। জোয়ার-ভাটা হয়। ভীষণ ছন্দে ঢেউ ভাঙে। মোৎজার্ট, বিটোফেন, বাখ, গগন হরকরা— সকলে একত্রে কী অনায়াসে রয়ে যান সলিলের ভিতর। মুগ্ধ বালক খাওয়া ভুলে যায়। সরেস শচীনদেব সলিলকে চিঠিতে লেখেন— ‘পোলা আমার, চ্যালা তোমার।’

ন’বছর বয়সে ছেলেটি নিজের খেয়ালে এক ধুন বানায়। বিহ্বল শচীনদেব সেই সুর হুবহু ব্যবহার করেন ‘ফান্টুস’ ছবিতে (‘অ্যয় মেরি টোপি পালাটকে আ’)। চাইল্ড প্রডিজি! গুরু দত্তের ‘পিয়াসা’। ফেরিওয়ালা জনি ওয়াকারের কন্ঠে কমেডি গান ‘সার যো তেরা চাকরায়ে’ আদতে বছর ষোলোর টিন-এজার ছেলেটির সুর। এরপর বাবার সহকারী হয়ে ছেলেটি ক্রমশ টের পায় পিতা-পুত্রের চিরায়ত এথিক্যাল দ্বন্দ্ব। শচীনকত্তা দেশজ ফোক আঁকড়ে থাকলেও পঞ্চমের সঙ্গীতবীক্ষার পরিধি বিশ্বজনীন। স্বভাবতই, শক্তি সামন্তের ‘আরাধনা’র পর কেবল বাবার সহকারী হয়ে থাকা অসম্ভব ছিল। ফ্রয়েড বলেছিলেন না— `A man becomes an adult when his father dies.’ সচেতন আয়াসে বাবার কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসেন পুত্র। সুর সতত স্বাধীন!

মেহমুদের ‘ছোটে নবাব’ ছবিতে একক মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবে হাতেখড়ি। উনিশ বছরের ছেলে মালগুঞ্জি রাগে বানালেন— ‘ঘার আজা ঘির আয়ে’ (লতা মঙ্গেশকর)। শচীনদেব শুনে বললেন, `নিজস্বতা কম। সুরে মদনমোহন এবং রোশনের প্রভাব আছে।’ ‘ভূত বাংলা’ ছবিতে দীর্ঘদিনের পাশ্চাত্য সঙ্গীত শোনার অনুরাগ সরাসরি কাজে লাগল। চাব্বি চেকারের ‘কাম অন লেটস ডান্স আগেইন’ গানটির ধাঁচে তৈরি হল ‘আও টুইস্ট করে’। কন্ঠ মান্না দে। এই ছবিতেই কিশোরকুমার গাইলেন ‘জাগো শোনেওয়ালো’।

প্রথম ফলক ‘তিসরি মঞ্জিল’। ভারতীয় মেলোডির সঙ্গে পাশ্চাত্য ক্যাবারের ছন্দ মিশিয়ে ‘ও হাসিনা জুলফোওয়ালি’, ‘আজা আজা ম্যয় হুঁ পেয়্যার তেরা’, ‘তুমনে মুঝে দেখা হো কার মেহেরবান’, ‘ও মেরে সোনা রে সোনা রে সোনা’, ‘দিওয়ানা মুঝসে নাহি’। প্রতিটি গান হিটলিস্টে। খুব তাড়াতাড়ি ছেলেটি মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির নতুন প্রজন্মের আইকন হয়ে গেলেন। সতীর্থ লক্ষীকান্ত-প্যারেলাল অবধি স্বীকার করলেন— ‘ওহ হম সবকো হিলাকে রখ দিয়া।’ ‘এস ডি বর্মনের ছেলে’ পরিচয় ফিকে হয়ে গেল কী দ্রুত। তরুণ শ্রোতারা বরং শচীনদেবকে দেখে বলত, ‘আরডি-র বাবা!’…পুত্রগর্বে খুশি এসডি তবুও নাছোড়।

ছেলে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের নির্যাস মেখে প্রতিভার অপচয় করছে। নৌশাদ, সলিল, মজরুহ সুলতানপুরী সবাইকেই এসডি অনুরোধ করে যাচ্ছেন পঞ্চমকে বোঝাতে, যাতে সুর হয় আঞ্চলিক। কিন্তু ততদিনে সমকালীন বাকিদের ধরাছোঁয়ার বাইরে পঞ্চম খুঁজে পেয়েছেন নিজের স্বকীয় কক্ষ। ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ ছবির ‘দম মারো দম’ শুনে শচীনদেব ভয়ানক রেগে গেলেন। অথচ, একবারও ভাবলেন না গাঁজাখোর হিপিদের কন্ঠে ভারী রাগসঙ্গীত আদৌ প্রাসঙ্গিক হত কি না। একইসঙ্গে ওই ছবির ‘ফুলোঁ কা তারোঁ কা’ বা ‘কাঞ্চিরে কাঞ্চিরে’ গানে যে ভারতীয় সুরই প্রধান— তা নিয়ে এসডি একটিও বাক্যব্যয় করলেন না। ছেলে অভিমানে নীরব!

এই প্রজন্মের অনেকেই আরডি-কে চেনেন রিমিক্সের হাত ধরে (কাঁটা লাগা, চড়তি জওয়ানি, বাচনা অ্যয় হাসিনো ইত্যাদি)। এর মাঝখান থেকে প্রকৃত রাহুলদেব থেকে যান অধরা—’অমর প্রেম’ ছবিতে কিশোরের ‘চিঙ্গারি কোয়ি ভাড়কে’ (রাগ- ভৈরবী), ‘কুছ তো লোগ কাহেঙ্গে’ (রাগ- খামাজ), ‘মেহবুবা’ ছবিতে কিশোরের গাওয়া ‘মেরে ন্যয়না শাওন ভাদো’ (রাগ- শিবরঞ্জিনী) এবং ওই একই ছবিতে মান্নার গাওয়া ‘গোরি তেরি পায়জানিয়া’ (রাগ- মিশ্র বৃন্দাবনী সারং), ‘বুঢ্ঢা মিল গয়া’ ছবিতে মান্নাকন্ঠে ‘আয়ো কঁহা সে ঘনশ্যাম’ (রাগ- খামাজ), ‘চন্দন কা পালনা’ ছবিতে লতার গলায় ‘ও গঙ্গা মাইয়া’ (রাগ- যোগিয়া)— এমন ভরা ভরা উদাহরণ। অনেকে জানতেনই না, পঞ্চম উস্তাদ আলি আকবর খানের কাছে সরোদ আর ব্রজেন বিশ্বাসের কাছে তবলায় তালিমপ্রাপ্ত। ‘চিঙ্গারি কোয়ি ভাড়কে’ ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম সুর!— হেমন্ত মুখার্জি কখনও এমন কথাও বলেছিলেন শোনা যায়।

রাহুলদেব সুরকার হওয়ার আগে ভাবতেন সাউন্ড রেকর্ডিস্ট হবেন। এশিয়ার সবচেয়ে আধুনিক স্টুডিয়ো তৈরি করে সাউন্ড নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করার স্বপ্ন দেখতেন। ‘ইঁয়াদো কি বারাত’ ছবির ‘চুঁরালিয়া হ্যয় তুমনে যো দিলকো’ গানের শুরুতে বোতলের গায়ে চামচের ট্যাপিং, ‘খুশবু’ ছবির ‘ও মাঝিরে’ গানের শুরুতে প্রিল্যুড হিসেবে ফাঁকা বোতলে জল ভরার আওয়াজ, ‘পড়োশন’ ছবির ‘মেরে সামনেওয়ালে খিড়কি মে’ গানে চিরুনির সাউন্ড কিংবা ‘শোলে’র ‘মেহবুবা মেহবুবা’ গানের শুরুতে ফাঁকা বিয়ারের বোতলে ফুঁ দিয়ে বের করা ‘থুপ থুপ থুপ’ ধ্বনি। অ্যান্ড সো অন…।

এ তথ্য বহুবিদিত। ‘খুশবু’ ছবির ‘ও মাঝি রে’ গানটি তৈরি হবে। গুলজার দৃশ্যবর্ণনা করে চলেছেন পঞ্চমকে। শিশুর মতো একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছেন পঞ্চম— ‘আচ্ছা, এটা কেমন নদী? চওড়া না সরু? আচ্ছা, এটা কেমন ধরনের গ্রামের পাশ দিয়ে যাচ্ছে? সেখানে রোজকার জীবন কেমন? নদীতে অন্য নৌকা দেখা যাচ্ছে কি?’ গুলজার, খানিক ধৈর্য্যচ্যুত, বললেন, ‘তুই সুরটা যেমন ইচ্ছে দে না, আমি শ্যুট করে নেব।’ ‘না গুল্লু, তা হলে গানের depth আসে না।…আচ্ছা, গ্রামে পানচাক্কি থাকে না, তার একটা সাউন্ড করলে কেমন হয়?’ (পানচাক্কি হল জলের ফোর্স দিয়ে চালানো পেশাই কল) অবাক হ’ন গুলজার। পানচাক্কির ডিটেল একজন সুরকারের মাথায় এভাবে আসতে পারে! ‘গুল্লু, দেখবি একটা অলস রোজকার মানডেন জীবন বোঝাতে একটা ঘ্যানঘ্যানে মোনোটোনাস শব্দ খুব সাহায্য করে।’

ছবির আবহসঙ্গীতে চূড়ান্ত নিরীক্ষা। ‘সত্তে পে সত্তা’ ছবির একটি দৃশ্যে অমিতাভ বচ্চন জেল থেকে বেরিয়ে আসছেন। আবহসঙ্গীতে পঞ্চম ব্যবহার করলেন জল নিয়ে গার্গল করার শব্দ। তারপর ‘শোলে’র সেই বিখ্যাত সিকোয়েন্স। ‘চাল্ ধান্নু, আজ তেরে বাসন্তী কে ইজ্জত কা সওয়াল হ্যয়’ বলে টাঙ্গা চালালেন হেমামালিনী। পিছনে ধাবমান গব্বর সিংয়ের ডাকু। পুরো দৃশ্যের আবহসঙ্গীতে শুধু তবলার আওয়াজ। সলিল চৌধুরি জোর গলায় বলতেন— ‘পঞ্চম আরব সাগরের সাইক্লোন, বঙ্গোপসাগরে ঢেউ তুলে, ভারত মহাসাগরকে উত্তুঙ্গ করে, আটলান্টিক-প্যাসিফিকে ছুটেছিল।’

বিধুবিনোদ চোপড়ার ‘১৯৪২— আ লাভ স্টোরি’ ছবির গান রেকর্ড হয়ে গেছে। ছবি তখনও রিলিজ করেনি। কিছুদিন পর সারা ভারত উত্তাল হয়ে শুনবে ‘এক লেড়কি কো দেখা তো অ্যয়সা লাগা’, ‘কুছ না কাহো’, ‘পেয়ার হুয়া চুপকে সে’, ‘রুঠ না জানা তুমসে কহুতো’, ‘রিমঝিম রিমঝিম’। বহুবছর পর ‘Harry Potter and the Prisoner of Azkaban’ ছবির ডিরেক্টর Alfonso Cuarón বিস্ময়াহত স্বীকার করবেন— তাঁর শোনা শ্রেষ্ঠ মিউজিক্যাল ছবি ‘১৯৪২— আ লাভ স্টোরি’।

গালিব বলতেন, ‘একদিন শরাব পানে বিমুখ থাকলে নিজেকে কাফের বলে মনে হয়…।’ ‘স্বেচ্ছাচারী, স্বাধীনচেতা, মদ্যপায়ী ও ভেতো…’— শক্তির পদ্যে একপ্রকার স্বগতোক্তিই ছিল। মদ্যপান প্রসঙ্গে পঞ্চম বলতেন— ‘দিন মেঁ ছুঁয়ো মাত্, রাত মেঁ ছোঁড়ো মাত্!’ অতিরিক্ত লঙ্কা খাওয়া জিভের ছটফটানি থেকে ‘দুনিয়া মেঁ লোগোঁ কো’ গানের ‘হা হা হা হা হা’ এফেক্ট খুঁজে পান তিনি। এভাবেই ‘জিভ’ নামের আপাত-অকুলীন ইন্দ্রিয়টি থেকে তৈরি হয় চক্ষু-কর্ণ গ্রাহ্য দুর্দান্ত শিল্প। রাহুলদেব সুরকে নিয়েছিলেন আত্মার ভিতর থেকে। তারপর জিনিয়াস স্ট্রিক যখন এসেছে, একসেকেন্ডে ব্লাস্ট ঘটিয়েছেন এইভাবে। স্বয়ংসম্পূর্ণ RDX এর মতো…।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here