একমাস সময় চেয়ে সিবিআইকে মেল রাজীবের, পাল্টা দ্বিতীয় নোটিশের সিদ্ধান্ত সিবিআইয়ের

0
1171

রাজেশ সাহা, কলকাতা: সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্স। শনিবার দিনভর রাজ্যবাসীর নজর পড়ে ছিল এখানেই। এদিন সকাল থেকেই সকলের মনে একটিই প্রশ্ন, রাজীব কুমার কি আসবেন সিবিআইয়ের মুখোমুখি হতে? পুলিশ থেকে রাজনৈতিক মহল বা আমজনতা, সকলেরই কৌতূহলি চোখ ছিল টিভির পর্দায়। কিন্তু দিনের শেষে সকলকে হতাশ করে গরহাজির থাকলেন কলকাতার প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার। এদিন সকাল থেকেই সিজিও কমপ্লেক্সের সিবিআই দফতরে চলে আসেন সিবিআইয়ের একের পর এক উচ্চপদস্থ কর্তারা। নয়াদিল্লির সদর দপ্তর থেকে সকালের উড়ানেই চলে আসেন সিবিআইয়ের স্পেশ্যাল ক্রাইম ব্রাঞ্চের জয়েন্ট ডিরেক্টর সাই মনোহর। প্রস্তুত ছিল একগুচ্ছ প্রশ্নমালাও। শুধু এলেন না উত্তরদাতা। পরিবর্তে সিবিআইকে ইমেল করে রাজীব কুমার জানিয়ে দিলেন, সিবিআই অফিসে হাজিরা দিতে এক মাস সময় চান তিনি।

গতকাল সিবিআইয়ের তরফে রাজীব কুমারের পার্ক স্ট্রিটের সরকারি আবাসনে গিয়েও দেখা মেলেনি তাঁর। এরপরই শুরু হয় জল্পনা। এই মুহূর্তে কোথায় আছেন রাজীব কুমার? তিনি কী কলকাতাতেই অন্য কোথাও গা ঢাকা দিয়ে আছেন? নাকি ভিন রাজ্যে বা বিদেশে পালিয়ে গিয়েছেন? এই প্রশ্নগুলি তাড়া করে বেড়াচ্ছে সিবিআই আধিকারিকদের। কলকাতা হাইকোর্ট রাজীব কুমারের গ্রেপ্তারির উপর থেকে রক্ষাকবচ তুলে নেওয়ার পরই, তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হাজির হতে নির্দেশ দিয়ে নোটিশ দেয় সিবিআই। উল্লেখযোগ্য ভাবে, এর আগে সাক্ষী হিসাবে তাঁকে ডেকে পাঠালেও, শুক্রবারই প্রথম আইপিসির ৪১নং ধারায় অর্থাৎ অভিযুক্ত হিসেবে তাঁকে তলব করে সিবিআই। শুক্রবার পার্ক স্ট্রিটের সরকারি আবাসনে রাজীব নিজে উপস্থিত না থাকায়, তার স্ত্রী সঞ্চিতা কুমারের হাতে নোটিস দিয়ে আসেন সিবিআই আধিকারিকরা। তারপর থেকেই সকলের কৌতূহলী নজরে এসে পড়ে সিজিও কমপ্লেক্সে।

সিবিআইয়ের নোটিশ অনুযায়ী, শনিবার রাজীবের হাজিরার সময় ছিল সকাল দশটা থেকে দুপুর তিনটের মধ্যে। এদিন সকাল থেকেই সিজিও কমপ্লেক্সের কার্যত দখল নেয় গোটা দেশের সাংবাদিক মহল। উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকে, দিল্লি থেকে স্পেশাল ক্রাইম ব্রাঞ্চের জয়েন্ট ডিরেক্টর সাই মনোহর এসে পৌঁছনোর পর। এই বুঝি এলেন আইপিএস রাজীব কুমার! সকাল থেকে সিজিও কমপ্লেক্সে যত গাড়ি ঢুকছে, ততই উপচে পড়েছে সাংবাদিকদের কৌতূহলী নজর। ওই গাড়িতেই কি আসছেন রাজীব কুমার? তিনি কি সশরীরে উপস্থিত হবেন নাকি আইনজীবী মারফত চিঠি পাঠাবেন? দিনভর এই সমস্ত গুঞ্জনই চলতে থাকে সিবিআই দপ্তরে উপস্থিত সাংবাদিক মহলে। যদিও দিনের শেষে সকলকে হতাশ করে গরহাজিরই থাকলেন রাজ্যের এডিজি সিআইডি তথা মুখ্যমন্ত্রী ঘনিষ্ঠ এই দুঁদে আইপিএস। পরিবর্তে একটি মেল করেই দায় সারলেন তিনি। জানিয়ে দিলেন, সিবিআই অফিসে আসার জন্য একমাস সময় চান তিনি। এদিকে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে আজ দিনভর সিবিআইয়ের তরফে তাঁকে একাধিক বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। সিবিআই সূত্রের খবর, গতকাল থেকেই তাঁর ফোন লাগাতার সুইচড অফ। রাজীব কুমারকে ফোনে না পেয়ে, যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয় তাঁর দেহরক্ষীর সঙ্গেও। দেখা যায় একই সময় থেকেই তাঁর ফোনটিও বন্ধ।

তাহলে কি পালিয়ে গেলেন রাজীব কুমার? সিবিআইয়ের একটি সূত্রের দাবি, এই মুহূর্তে বিদেশে পালানো কার্যত অসম্ভব রাজীবের। কারণ শুক্রবার থেকেই কলকাতা বিমানবন্দর এবং শহরের প্রায় সবকটি স্টেশনেই নজরদারি রেখেছে সিবিআই। সূত্রের খবর, কলকাতা বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন বিভাগে কেন্দ্রীয় ওই সংস্থার তরফে জানিয়ে রাখা হয়েছে, রাজীব কুমার বা আর কুমার নামের কেউ বিদেশে যেতে চাইলে, তখনই সিবিআইকে খবর দিতে। গতকাল রাত থেকেই বিমানবন্দরে সাদা পোশাকে নজরদারি রেখেছেন সিবিআইয়ের সাত জন আধিকারিক। একই রকম নজরদারি চলছে হাওড়া, শিয়ালদহ স্টেশনেও। যদিও রাজ্যের অন্যতম দুঁদে এই আইপিএস এতো কাঁচা কাজ করবেন না বলেই মনে করছেন সিবিআইয়ের একাংশ। আবার গোয়েন্দা সংস্থারই অন্য একটি মহল মনে করছে, আজ শনিবার ও কাল রবিবার দুটো দিন উতরোতে পারলেই সোমবার সুপ্রিম কোর্টের দারস্থ হতে পারেন রাজীব কুমার। সিবিআই হেফাজত থেকে বাঁচাতে সুরক্ষা চাইতে পারেন দেশের সর্বোচ্চ আদালতে। সে ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট রাজীব কুমারের আবেদন গ্রহণ করলে তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রক্রিয়া অনেকটাই পিছিয়ে যাবে সিবিআইয়ের।

সূত্রের খবর, রাজীব কুমার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলে সেখানেও আইনি লড়াই চালাতে প্রস্তুত হচ্ছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। কারণ শুক্রবার হাইকোর্ট তদন্তে সহযোগিতা করতে রাজীব কুমারকে নির্দেশ দেওয়ার পরেও, শনিবার হাজির না হওয়াটা তদন্তে অসহযোগিতা হিসেবেই দেখছে সিবিআই। নোটিশ দেওয়া সত্ত্বেও কিছু না জানিয়ে বেপাত্তা থেকে রাজীব কুমার ইচ্ছাকৃত ভাবে তদন্তে অসহযোগীতা করেছেন বলে সুপ্রিম কোর্টে পাল্টা অভিযোগ আনতে পারেন সিবিআইয়ের আইনজীবী। সেক্ষেত্রে পাল্টা প্যাঁচে পড়তে পারেন কলকাতার প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার।

এ দিন দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর দুপুর দুটো নাগাদ সিজিও কমপ্লেক্স থেকে বেরিয়ে যান সিবিআইয়ের স্পেশাল ক্রাইম ব্রাঞ্চের জয়েন্ট ডিরেক্টর সাই মনোহর। দিনভর সিবিআই – রাজীব কুমার চোর পুলিশ খেলা চললেও হাত গুটিয়ে বসে নেই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাও। সিবিআইয়ের একটি বিশেষ সূত্রের খবর, রবিবার ফের উপস্থিত হতে নির্দেশ দিয়ে রাজীব কুমারকে দ্বিতীয় নোটিস দিতে পারে সিবিআই। আজ বিকেলেই ৩৪ নং পার্ক স্ট্রিটে রাজীব কুমারের সরকারি বাসভবনে দ্বিতীয় নোটিস নিয়ে হাজির হতে পারেন সিবিআই আধিকারিকরা। সে ক্ষেত্রে ফের হাজিরা এড়ানোর চেষ্টা করলে আদালতের চরম বিপাকে পড়বেন রাজ্যের এডিজি সিআইডি। তখন তদন্তে চরম অসহযোগিতা এবং সিবিআই বার বার ডেকে পাঠানোর পরেও ইচ্ছাকৃতভাবে গরহাজির থাকার অভিযোগে আদালতে জোরালো সওয়াল করে তাঁকে গ্রেফতার করার অনুমতি চাইতে পারে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। তবে শেষ পর্যন্ত সিবিআইয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে দিল্লিতে সদর দফতর কি কৌশল নেয় তার ওপরেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here