oldest durga puja king kangsha kolkata bengali news

সৌভিক বাগচী:  কবি লিখেছেন হারে কবে কেটে গেছে কালিদাসের কাল, পণ্ডিতেরা বিবাদ করে লযে তারিখ , সাল৷  কালিদাসের আমলে বঙ্গে দুর্গাপজোর কোনও কথা আমরা এখনও জানতে পারিনি৷ অনেকেই অনেক কিছু দাবি করে৷ তবে সেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দাবি মাত্র৷ প্রমাণ  নয়৷ আমার আদি দেশ রাজশাহী৷ দুই বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে দেখা যায় আজকের বাংলাদেশে সম্ভবত রাজশাহীর রাজা কংস নারায়ণ প্রথম  দুর্গাপুজো করেছিলেন৷ তবে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন পঞ্চদশ শতকে শ্রীহট্টের রাজা গণেশ প্রথম দুর্গাপুজো করেন৷

বাংলাদেশে প্রথম কবে দুর্গা পুজো শুরু হয় তা নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। কারো কারো মতে, পঞ্চদশ শতকে শ্রীহট্টের (বর্তমানে  সিলেট) রাজা গণেশ প্রথম দুর্গা পুজো করেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিতভাবে কিছু জানা যায় না। তবে বিভিন্ন গবেষকদের বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায় যে, ১৫৮৩সালে রাজশাহীর তাহেরপুর এলাকার রাজা কংস নারায়ণ প্রথম দুর্গা পুজোর প্রবর্তন করেন। রাজা কংশ নারায়ণ ছিলেন বাংলার বারো ভূঁইঞার এক ভূঁইঞা। সে সময় রাজা কংস নারায়ণ প্রভূত ভূ-সম্পত্তির অধিকারী হন। তখনকার রাজাদের মাঝে নিজের সামাজিক প্রতিপত্তি বাড়ানোর উদ্দেশে তিনি এই পুজোর আয়োজন করেন। জানা যায়, এই শারদীয় পুজোয় তিনি সে সময়ের হিসেবে প্রায় আট লক্ষ টাকার মতো ব্যয় করেন। আজ থেকে ৪৩৬ বছর আগে  দুর্গাপুজোয় আট লক্ষ টাকা খরচ সত্যি সংবাদ হওয়ার যোগ্য৷উল্লেখ্য কংস নারায়ণ ছিলেন মনুসংহিতার টিকাকার কুলুক ভট্টের নাতি৷ কংস পারলে আমিই বা কম  যাই কেন? ফলে ওই একই বছর বসন্তকালে রাজশাহীর ভাদুরিয়ার রাজা জয় জগৎ নারায়ণ বেশ জাঁকজমকভাবে বাসন্তী পুজোর আয়োজন করেন। তিনি কংস নারায়ণকে টেক্কা দেয়ার জন্য সেই পুজোতে প্রায় নয় লক্ষ টাকা খরচ করেন। আঠারো শতকে সাতক্ষীরার কলারোয়ার মঠবাড়িয়ার নবরত্ন মন্দিরে দুর্গা পুজো হতো বলে বিভিন্ন জনের লেখায় পাওয়া যায়।

 

নবাব সলিমুল্লাহর আমলে ঢাকা শহরে সর্বপ্রথম দুর্গা পুজোর প্রচলন শুরু হয়। অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্ত তার আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেন যে, ১৮৩০ সালের পুরনো ঢাকার সুত্রাপুর অঞ্চলের ব্যবসায়ী নন্দলাল বাবুর মৈসুন্ডির বাড়িতে ঢাকার সবচেয়ে বড় দুর্গা পুজোর আয়োজন করা হয়েছিল। তবে সেই পুজোর কত খরচ হয়েছিল তা জানা না গেলেও প্রতিমাটি প্রায় দোতলা উঁচু ছিল বলে লেখক তার আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেন।

১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের  সময় বিক্রমপুর পরগনার ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ির রাজা ব্রাদার্স এস্টেটে এবং সাটুরিয়া থানার বালিহাটির জমিদার বাড়ির দুর্গা পুজোর আয়োজনের ব্যাপকতা বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। সে সময়ে সিদ্ধেশ্বরী জমিদার বাড়ি ও বিক্রমপুর হাউসেও জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গা পুজোর আয়োজন হত বলে নানা তথ্য পাওয়া যায়।

১৯২২-২৩ সালে আরমানিটোলায় জমিদার শ্রীনাথ রায়ের বাড়ির পুজোও বেশ বিখ্যাত ছিল। লালবাগ থানার ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুজোও বেশ প্রাচীন। উল্লেখ্য, ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পূজিতা দুর্গার আরেক রূপ দেবী ঢাকেশ্বরীর নামেই ঢাকার নামকরণ হয় বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করে থাকেন।   সপ্তদশ শতক থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত প্রভাবশালী জমিদার, সামন্ত রাজাদের অর্থকৌলিন্য প্রকাশের পাশাপাশি প্রভাব প্রতিপত্তি দেখানো আর ব্রিটিশদের সাথে সম্পর্ক মজবুত রাখার লক্ষ্যেই মূলত দুর্গা পুজোর আয়োজনের চল শুরু হয়। তখনও এই দুর্গা পুজো সকলের হয়ে উঠতে পারেনি। দুর্গা পুজোর সার্বজনীনতার রূপ পেতে লেগে যায় আরো অনেক বছর।

বিংশ শতকের শুরুর দিকে বাংলাদেশে দুর্গা পুজো সমাজের বিত্তশালী এবং অভিজাত হিন্দু পরিবারদের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। গত শতাব্দীর শেষের দিকে এবং এই শতাব্দীর শুরুর দিকে দুর্গা পুজো তার সার্বজনীনতার রূপ পায়।

 

১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পর এককভাবে পুজো করাটা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে ওঠে। এইসময় অভিজাত এবং বিত্তশালী হিন্দুদেরও প্রভাব-প্রতিপত্তি কমতে শুরু করে।ফলে সারা বাংলাদেশে একক দুর্গাপুজো থেকে প্রথমে বারোয়ারি এবং পরবর্তীকালে সার্বজনীন পুজোর চল শুরু হয়। সার্বজনীন হওয়ার পর থেকেই দুর্গোৎসব বাঙালির জাতীয় উৎসবে পরিণত হতে শুরু করে। সার্বজনীন দুর্গা পুজো প্রচলন হওয়ার পর থেকেই সর্বস্তরের মানুষের কাছে এই পুজোর আকর্ষণ বৃদ্ধি পেতে থাকে।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here