Post Edit: ধর্ষকের পরিচয় সে ধর্ষক! দোহাই, ধর্ম মিশিয়ে গুলিয়ে দেবেন না অনুপম

0
kolkata news

সিরাজুল ইসলাম: দিল্লির নির্ভয়া কাণ্ডের কথা এখনও ভুলে যাননি কেউ। কোথাও ধর্ষণের ঘটনা সামনে এলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে দিল্লির ওই ঘটনার কথা। কী পাশবিক ঘটনা সেদিন ঘটেছিল, তা নতুন করে আর বলার দরকার নেই। মিডিয়ার দৌলতে সেই কথা সবারই জানা। তারপরও ধর্ষণ থেমে নেই দেশে। প্রতিনিয়ত কোথাও না কোথাও ঘটে ঘটে চলেছে ধর্ষণের মতো পাশবিক, নারকীয় ঘটনা। নির্ভয়া কাণ্ডের পর গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো আর একটি ঘটনা ঘটেছিল উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের কামদুনিতে। দিল্লির মতো প্রায় একই ঘটনা ঘটেছিল এখানেও। প্রতিবাদ, উপযুক্ত বিচার এবং অভিযুক্তদের শাস্তির দাবিতে পথে নেমেছিল হাজার হাজার মানুষ। দীর্ঘদিন ওই ঘটনার মামলা চলার পর অভিযুক্তদের সাজা ঘোষণা হয়েছে। সেই সাজা পুনর্বিবেচনার আর্জিতে এখন উচ্চ আদালতে তার বিচার চলছে।

ধর্ষণ থেমে নেই। নিয়ম করে যেন আপন গতিতে এগিয়ে চলেছে কিছু মানুষের এই পাশবিক আচরণ! যার বলি হতে হচ্ছে নির্ভয়ার মতো মেয়েদের। সর্বশেষ সংযোজন হায়দরাবাদের এক পশু চিকিৎসক। দিল্লির ঘটনার মতো কার্যত একই রকম ঘটনা ঘটেছে হায়দরাবাদে। পাশবিক অত্যাচারের পর পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছে হায়দরাবাদের ‘নির্ভয়া’কেও। আবার দেশজোড়া প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু হয়েছে। সবারই একই দাবি, ভয়ঙ্করতম সাজা দেওয়া হোক নিষ্ঠুর চার অপরাধীকে। যাদের পাশবিক লালসার শিকার হয়ে অকালে বিদায় নিতে হয়েছে হায়দরাবাদের ওই পশু চিকিৎসককে। কেউ ঘটনার কথা মনে করে আতঙ্কে সিটিয়ে যাচ্ছেন। কেউ আবার মনে মনে গুমরে কাঁদছেন মেয়েটির কথা ভেবে। আবার কেউ চাইছেন এমন সাজা দেওয়া ওই অপরাধীদের, যাতে এই সমাজ থেকে পুরোপুরি বিদায় নেয় ধর্ষণের মতো এমন সামাজিক ব্য্যধি। পথে নেমে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ওই চার নর পিশাচের জন্য জঘন্যতম শাস্তির দাবি করছেন দেশবাসী।

কার্যত সবার দাবি এক। ভয়ঙ্করতম সাজা হোক ওই নর পিশাচদের। কিন্তু তার মধ্যেও কিছু কিছু মানুষের এই চাওয়ার পেছনে অন্যরকম কিছু অর্থ থেকে যাচ্ছে। যা আতঙ্কের পাশাপাশি ভয়েরও। হায়দরাবাদের ধর্ষণ-কাণ্ডে যুক্ত ছিল চারজন। তাদের নাম মহম্মদ আরিফ, জল্লু শিবা, জল্লু নবীন এবং চিন্তকুন্ত চেন্নাকেশভুলু। অভিযুক্তদের নাম দেখে বোঝা যাচ্ছে, তাঁদের মধ্যে একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। যদিও ধর্ষকদের কোনও জাত হয় না, ধর্ম হয় না, বর্ণ হয় না। তাদের একটাই পরিচয়, তারা ধর্ষক। দেশের আইন অনুযায়ী বিচার করে তাদের সাজা হওয়ার কথা। তাদের ধর্ম বিচার না করে, একটাই মাপকাঠিতে বিচার করা উচিত- সেটা হল তারা ধর্ষক। কিন্তু এমন না করে কিছু কিছু মানুষ এই ঘটনার পেছনেও ধর্মের রং লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের একজন হলেন এই রাজ্যের প্রাক্তন এক সাংসদ যিনি আবার অধ্যাপক হিসেবে বিশ্বভারতীর মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর নাম অনুপম হাজরা। ঘটনার পর ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘পশু চিকিৎসককে মহম্মদ পাশা (আরিফ) ও তার সঙ্গী-সাথীরা ধর্ষণের পর নৃশংস ভাবে পুড়িয়ে খুন করল, ঠিক সেইভাবে মহম্মদ পাশার একটি করে অঙ্গচ্ছেদ করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হোক!’

দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে নিশ্চয় এই ঘটনায় ব্যথিত হয়েছিলেন অনুপম হাজরা। তাই ওই অপরাধীদের এমন সাজা কামনা করেছেন তিনি। খুব স্বাভাবিক তাঁর এই সাজা প্রার্থনা। যেটা খুব অস্বাভাবিক লাগল তা হল, চারজন অপরাধীর মধ্যে বিশেষ ভাবে একজনের নাম উল্লেখ করে ঘটনাটা অন্যভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন তিনি। মহম্মদ পাশা (আরিফ) অবশ্যই অপরাধী। তার সঙ্গে একই রকম অপরাধী বাকি তিনজনও। কিন্তু অনুপম হাজরার চোখে ওই তিনজন কোন মাপকাঠিতে পড়ল, তা বুঝতে পারলাম না। অঙ্গচ্ছেদ করে হত্যার ক্ষেত্রে একজনের নাম উল্লেখ করলেও বাকি তিন জনের নাম তিনি উল্লেখ করেননি। এখানে পরিষ্কার, তিনি বিশেষ একটি ধর্মকে এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছেন। রাজনীতি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত এই মানুষটির এ কেমন চিন্তাভাবনা- তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অবশ্য প্রশ্ন থাকার অবকাশ নেই। কারণ, তিনি এই মুহূর্তে যে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত, সেই দলের চিন্তাভাবনা অনুযায়ী ঠিক কথাই তিনি বলেছেন।
অনুপম হাজরা যখন তৃণমূল সাংসদ ছিলেন, সেই সময় ঘটা কামদুনির ঘটনার জন্যও তিনি সরব হয়েছিলেন। শাস্তি চেয়েছিলেন অপরাধীদের। তখন তিনি কোনও ধর্মীয় পরিচয় দেখেননি অপরাধীদের। আর আজ তাঁর রাজনৈতিক সত্তা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চিন্তাভাবনার পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। যা সত্যিই চিন্তার। সুস্থ স্বাভাবিক বোধ বুদ্ধি আছে এমন যে কোনও মানুষ এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে কোনও ধর্মের রং খুঁজে দেখবেন না। কারণ, কোনও ধর্ম শেখায় না কোনও অপরাধ করতে। সব ধর্মের মূল কথা শান্তি। তা হলে মহম্মদ পাশা (আরিফ)-র নাম উল্লেখ করে অনুপম হাজরা এমন কথা বললেন কেন? তিনি তো সবারই একই রকম শাস্তি কামনা করতে পারতেন। স্বাভাবিক বোধ বুদ্ধিতে যে কোনও দেশবাসীর এটাই চাওয়া হওয়া উচিত।

আসলে অনুপম হাজরার মতো মানুষ রাজনৈতিক শিবির বদলানোর পর যে পুরো পাল্টে যাবেন তা খুব স্বাভাবিক। যা তাঁর চিন্তাভাবনায় প্রকাশ পাচ্ছে। এখন তিনি যে দলে আছেন, সেই দলে বহু নেতাই ধর্ষণের মতো অভিযোগে অভিযুক্ত। তাদের কারও কথা অনুপম হাজরার অজানা নয়। তাদের ক্ষেত্রে তিনি শাস্তি দাবি করেছেন, এমন কথা কখনও শোনা যায়নি। তা হলে হায়দরাবাদের এই ঘটনায় বিশেষ ভাবে ধর্মীয় সুড়সুড়ি দেওয়ার চেষ্টা তিনি করলেন কেন? বিজেপিতে নাম লেখালে একটু অন্যভাবে ধর্মীয় সুড়সুড়ি দিতে হবে, এটা কি ওই দলের নেতাদের ক্ষেত্রে নিয়ম হয়ে গিয়েছে। আর এই ধারা মেনেই হায়দরাবাদের ওই চার অভিযুক্তের মধ্যে বিশেষভাবে মহম্মদ পাশা (আরিফ)-র কথা উল্লেখ করেছেন অনুপম হাজরা। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি বিজেপি করে, সেই নীতির সংক্রমণ হয়ে গিয়েছে অনুপম হাজরার। তাই হয়তো মন থেকে না হলেও হায়দরাবাদের এই ঘটনার পর এমন ফেসবুক পোস্ট করেছেন তিনি। নারকীয় এই ঘটনায় যুক্ত চার জনের মধ্যে তাই বিশেষ ভাবে চিহ্নিত করেছেন মহম্মদ পাশা (আরিফ)-কে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here