মহানগর ওয়েবডেস্ক: বিংশ শতাব্দীর অতিমারি করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এক কদম এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হতে শুরু হয়েছে রাশিয়ার হাত ধরে। এদিন রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন ঘোষণা করেছেন, বিশ্বের প্রথম করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন বানিয়ে ফেলেছে তাঁর দেশ। যার পোশাকি নাম ‘স্পুটনিক ৫’ রাখা হয়েছে। এই ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ তাঁর কন্যার শরীরে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। আরও খবর, সেপ্টেম্বর মাস থেকেই এর উৎপাদন বড় আকারে শুরু হবে এবং অক্টোবর মাসের মধ্যে রাশিয়ার সাধারণ মানুষ তা নিজেদের শরীরে নিতে পারবেন।

ফলে যেই ভ্যাকসিনের অপেক্ষা গোটা মানবজাতি এতদিন ধরে করছিল তা অবশেষে আবিষ্কৃত হয়েছে বলে চলে। কিন্তু, তা সত্ত্বেও বিশ্ব এখনও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছে না। রাশিয়ার ভ্যাকসিন তৈরির দাবির উপর পুরোপুরি ভরসাও করতে পারছে না বিশ্বের চিকিৎসক মহল। এর পিছনে অবশ্য যুক্তিসঙ্গত বেশ কিছু কারণও রয়েছে। সবার আগে বলে রাখা ভাল, এই ভ্যাকসিন মস্কোর গামালেয়া ইনস্টিটিউট এবং রাশিয়ার প্রতিরক্ষা দপ্তর মিলে যৌথভাবে করেছে। এই ভ্যাকসিনের সংশয়হীন কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে কারণ, ক্লিনিকাল ট্রায়াল সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই সরকারিভাবে একে করোনার প্রথম ভ্যাকসিন হিসেবে সিলমোহর দিয়ে দিয়েছে সরকার। যেই কারণে ইতিমধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রাশিয়ার এই ভ্যাকসিনকে সন্দেহের চোখে দেখছে।

সাধারণত যে কোনও ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের ক্ষেত্রে এর তৃতীয় স্টেজ খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়। কেননা এই স্টেজে কয়েক হাজার মানুষের উপর এই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে তাদের একটা লম্বা সময় পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখতে হয়। কিন্তু রাশিয়ার এই করোনা ভ্যাকসিনের ক্লিনিকাল ট্রায়াল এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। প্রথমে বাঁদর ও পরে মানুষের শরীরে প্রাথমিক ট্রায়াল হয়েছিল যাতে সাফল্য আসে। কিন্তু ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী সংস্থা গামালেয়া ইনস্টিটিউট বিরাট সংখ্যার মানুষের শরীরে এর ক্লিনিকাল ট্রায়াল করেনি যাতে এর সাইড এফেক্টের বিষয়ে বিশদে জানা যায়। তাৎপর্যপূর্ণভাবে প্রথম পর্যায়ের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনা হলেও সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিকাল পরীক্ষার রিপোর্টই প্রকাশ্যে আনেনি রাশিয়া।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বের বহু দেশ একটি বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন। তা হল- রাশিয়া নিজেদের রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা সফল করার লোভে আগেভাগে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের এই ঘোষণা করে দিচ্ছে। বিশেষ করে হু যখন গত সপ্তাহেই সতর্ক করে বলেছিল যে, আদিকাল থেকে চলে আসা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পদ্ধতিগুলি নিয়ে ছেলেখেলা করা বিপজ্জনক হতে পারে। যদিও এদিন পুতিন বলেছেন, ‘আমি আবারও বলছি এই ভ্যাকসিন সব ধরনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে এবং এর দ্বারা মানবদেহে স্থিতিশীল প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব।’

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে এমনটা একেবারেই মনে করছে না দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। কেননা বিশ্বে করোনার জন্য চলা গবেষণার কথা মাথায় রেখে হু যে ‘পোটেনশিয়াল (সম্ভবত) ভ্যাকসিনে’র তালিকা তৈরি করেছে সেখানে রাশিয়ার এই ভ্যাকসিনের নাম নেই।

নিউ ইয়র্ক টাইমস আবার দাবি করেছে, গত সপ্তাহেই তারা রাশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রককে একটি চিঠি দিয়েছিল। যেখানে এই ভ্যাকসিনের মানব দেহে ট্রায়াল, সম্ভাবত সাইড এফেক্ট এবং গবেষণা সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন করা হয়েছিল। কিন্তু তার কোনও জবাব আসেনি। এহেন নানা বিষয়ই রাশিয়ার ভ্যাকসিন নিয়ে সন্দেহ বাড়াচ্ছে। আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন যেমন ব্রাজিল, ভারত সহ অন্যান্য দেশেও পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে। রাশিয়ার ভ্যাকসিন তাদের দেশের বাইরে অন্য কোথাও পরীক্ষা করা হয়নি। বিশেষত যে মানব দেহের ট্রায়াল শেষ করতে সাধারণত কয়েক বছর লেগে যায়, তা মাত্র দু’মাসে কীভাবে সম্ভব হতে পারে তা নিয়ে বিশ্ময় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here