jyotiraditya scindia and sachin pilot news

ঋদ্ধীশ দত্ত: কংগ্রেসের রাজনৈতিক আকাশে ক্রমশ সিঁদুরে মেঘ ঘনাচ্ছে। গত লোকসভা নির্বাচনের কয়েক মাস আগেই যে রাজ্যগুলিতে বিজেপিকে হারিয়ে কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছিল, সেখানেই দেখা যাচ্ছে গভীর সংকট। মধ্যপ্রদেশে কমল নাথ সরকারের পতন একপ্রকার নিশ্চিত করে কংগ্রেসের সঙ্গে ১৮ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছেন তাঁর শিবিরের ১৯ জন বিধায়ককে। হিসেব বলছে, এই ১৯ জন বিধায়ক বিজেপিতে নাম লেখালে কংগ্রেস সরকারের পতন অবশ্যম্ভাবী। যা অদূর ভবিষ্যতে হতে চলেছে বলেই ধরে নেওয়া যায়। তবে এই ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে বড় শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে কংগ্রেসের। যদি না তারা নিজেদের শাসনে থাকা আরেকটি রাজ্য (রাজস্থান) হাতছাড়া করতে চায়।

মধ্যপ্রদেশ এবং রাজস্থানের রাজনৈতিক সমীকরণের ক্ষেত্রেই একটা বিরাট বড় মিল হচ্ছে, দুই রাজ্যেই মুখ্যমন্ত্রী পদ পেয়েছেন রাহুল ঘনিষ্ঠ বরিষ্ঠ কংগ্রেস নেতারা। কমল নাথ এবং অশোক গেহলট। অথচ কান পাতলে শোনা যায়, কংগ্রেসের সমর্থক বা দলের একটা বড় অংশই পাকা চুলে ভরসা করতে চাননি। তারা তরুণ রক্তকে এগিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। সেই তরুণ মুখেরও অভাব ছিল না দুই রাজ্যে। মধ্যপ্রদেশে ছিলেন জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া, রাজস্থানে শচীন পাইলট। মরুরাজ্যে শচীনকে উপমুখ্যমন্ত্রীর পদ দেওয়া হলেও মধ্যপ্রদেশে সিন্ধিয়াকে ততটা গুরুত্ব দেয়নি দল। যার ফল এখন টের পাচ্ছেন রাহুল-সনিয়া গান্ধীরা।

ছত্তিসগড় নিয়ে অবশ্য কংগ্রেসের বিশেষ মাথাব্যথা আপাতত নেই। কিন্তু দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে একটিও আসন না পাওয়া কংগ্রেসের জন্য হাতের পাঁচ বলতে আপাতত এই তিন রাজ্যই রয়েছে। এ ছাড়া বড় কোনও রাজ্যে তারা ক্ষমতায় নেই। ছত্তিসগড়ে জয়ের ফারাক অনেকটা বড় ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থান উভয় রাজ্যেই জয় কানের পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে গিয়েছিল বিজেপির। তাই অমিত শাহের মতো ‘চাণক্য’রাও তক্কে তক্কে ছিলেন। কারণ তারা জানতেন, কংগ্রেসে একতা এবং শৃঙ্খলার অভাবই বিজেপিকে ফের সুযোগ করে দেবে। বর্তমানে সেটাই হতে দেখা যাচ্ছে। যাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার তাদের গুরুত্ব না দিয়ে নিজের পায়েই কুড়ুল মারছে কংগ্রেস। আর রাহুল গান্ধীরা যদি এখনই সেটা বুঝতে না পারেন, তবে ঘোর বিপদ অপেক্ষা করছে কংগ্রেসের জন্য।

লোকসভা ভোটে পর্যুদস্ত হওয়ার পর থেকে রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক ‘সন্ন্যাস’ নিয়ে ফেলা অনেক প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছিল। তবে কি গান্ধী পরিবারের হাত থেকে রাশ বেরিয়ে যেতে চলেছে কংগ্রেসের? রাহুল যেমন ভাব করছিলেন তাতে মনে হচ্ছিল এবার হয়তো পরিবার প্রথার ‘মায়া’ কাটাতে পারে কংগ্রেস। কিন্তু কয়েক মাস যেতেই পুনর্মূষিক ভব। ফের কংগ্রেসের দায়িত্বভার সেই রাহুলের হাতেই যেতে চলেছে। আরও সাফ হয়ে যাচ্ছে, রাজনীতিতে প্রতিভা যতই থাকুক না কেন, জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া ও শচীন পাইলটের মতো মুখদের শীর্ষ স্তরে উঠতে দেবে না কংগ্রেস। পাছে রাহুল গান্ধীর প্রচারের আলো কম হয়ে যায়! তাই নিজেদের রাজনীতির গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী করতে হলে কংগ্রেস ত্যাগ ছাড়া আর কোনও উপায় থাকছে না এদের কাছে।

মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানের নির্বাচনী প্রচারে সিন্ধিয়া ও পাইলটই কার্যত একার হাতে কংগ্রেসকে জিতিয়েছিলেন। ফলে তাদের মুখ্যমন্ত্রী করার চাপ ছিল কংগ্রেস হাইকমান্ডের উপর। কিন্তু তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী তাতে রাজি হননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এই স্বচ্ছ ভাবমূর্তির যুবকরা মুখ্যমন্ত্রী হলে কংগ্রেস শীর্ষ হিসেবে তাঁর ‘ব্রান্ড ভ্যালু’ ধাক্কা খেতে পারে। এমনকী আগামী সময়ে নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে জাতীয় স্তরে রাহুল গান্ধীকে ছাপিয়ে সিন্ধিয়া ও পাইলটই বেশি গ্রহণযোগ্য মুখ হয়ে উঠতে পারেন যেহেতু তারা গান্ধী পরিবারের সদস্য নন। একই সঙ্গে দুই রাজ্যে ক্ষমতার রাশও সরাসরি তাঁর হাতে না থাকতে পারে। সেই কারণে রাহুল গান্ধী দায়িত্বভার তুলে দেন কমল নাথ ও অশোক গেহলটের উপর। অন্যদিকে রাজস্থানে পাইলটের পক্ষে বিপুল সমর্থন দেখে তাঁকে উপমুখ্যমন্ত্রীর আসন ‘ফাউ’ হিসেবে তুলে দেন। যাতে সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে।

কিন্তু মধ্যপ্রদেশকে তেমনটা হল না। ক্রমাগত কংগ্রেসে থেকেও রাজনৈতিক জীবনে কার্যত কিছুই করে উঠতে পারায় শেষ পর্যন্ত দলটাই ছেড়ে দিলেন জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে সাক্ষাৎও সেরে ফেলেছেন তিনি। এই প্রতিবেদন যতক্ষণে প্রকাশিত হবে ততক্ষণে সম্ভবত বিজেপিতে যোগও দিয়ে ফেলবেন তিনি। তাই কংগ্রেসের দরকার এখনই শুধরে যাওয়া। রাহুল গান্ধীর মায়া ত্যাগ করে যারা যোগ্য তাদের এগিয়ে দেওয়া। নয়তো অদূর ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘কংগ্রেস মুক্ত ভারত’-এর স্বপ্ন সত্যি হয়ে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here