ফুটবলার থেকে ক্লাবের কর্মকর্তা, সাহায্য চাইলেই দু’হাত বাড়িয়ে দিতেন অঞ্জন মিত্র

0
kolkata bengali news

সমীর গোস্বামী: অঞ্জন মিত্রের প্রয়াণে মোহনবাগান ক্লাবের একটা বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। ধীরেন দে ও শৈলেন মান্নার পর যে ভদ্রলোক মোহনবাগান ক্লাবের মতো এত বড় ক্লাবের হাল ধরে এতদিন চালিয়েছেন, সেই মানুষটা চলে যাওয়া মানে একটা অপূরণীয় ক্ষতি। টুটু বসু পাশে দাঁড়িয়ে থেকে সভাপতি হিসেবে ওনাকে অনেক সাহায্য করেছেন। টুটু বসু এবং অঞ্জন মিত্রের যৌথ মিলনে কলকাতা ফুটবল মাঠে এই পেশাদারি প্রথাটা ওঁরাই প্রথম চালু করেছিলেন। ফুটবলার বা ক্রিকেটাররা আজ যে এত টাকা পাচ্ছেন, এটা কিন্তু এঁরাই শুরু করেছেন। পশ্চিমবঙ্গে বা বাংলার ঘরের মাঠে খেলাধুলার ক্ষেত্রে এঁরাই হচ্ছে পথপ্রদর্শক। অঞ্জন মিত্রের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল, তিনি মানুষের পরামর্শ নিতেন এবং সেই পরামর্শকে হাতে-কলমে প্রয়োগ করার চেষ্টা করতেন।

আমি একবার বলেছিলাম, ‘আপনারা মোহনবাগানের ফাউন্ডেশন দিনটাকে জমকালো করছেন না কেন?’ অঞ্জন মিত্র আমার মতামত চাইলেন। আমি বলেছিলাম, ‘একটা মিউজিয়াম করুন।’ কথামতো উনি কিন্তু সেই মিউজিয়ামটা করেছিলেন। মোহনবাগান ক্লাবই প্রথম এটা করে। রাজ্যের ক্রীড়া মন্ত্রক বা অন্যান্য যা ভাবেনি, অঞ্জন মিত্র মোহনবাগান ক্লাবে প্রথম স্পোর্টস মিউজিয়াম খুলেছিলেন। ওনার আরও একটা গুণ ছিল, যেটা অনেকেই জানতেন না। উনি খেলোয়াড়দের সঙ্গে ভাল মিশতে পারতেন। তাদের সঙ্গে সুখ-দুঃখের মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে নিজে যতটা পারতেন উপকার করার চেষ্টা করতেন। পেশাগতভাবে তিনি ছিলেন চাটার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। সেখান থেকে সময় বার করে তিনি ক্লাবের জন্য যা করেছেন তা মনে রাখার মতো। আজ মোহনবাগান ক্লাবে যা কিছু উন্নতি হয়েছে তা টুটু বোস এবং অঞ্জন মিত্রর আমলেই। অনেক খেলোয়াড়রাই তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। কাউকে না জানিয়ে তিনি অনেককেই সাহায্য করতেন এবং তা কাউকে বলতেন না। শুধু খেলোয়াড় নয়। অন্যান্য কেউই গিয়ে সাহায্য চাইলে উনি সবসময় সেটা করতেন। খেলার মাঠে আদর্শ ক্রীড়া প্রশাসক হারালো আজ গড়ের মাঠ।

অন্যান্য খেলার কর্মকর্তারাও অনেক সময় অঞ্জন মিত্রের কাছে সাহায্য চাইতেন। তিনি দু-হাত বাড়িয়ে সাহায্যও করতেন। টুর্নামেন্ট করার জন্য কোনও সময় যদি কারও মাঠের দরকার পড়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যেতেন। কখনও এই বিষয় নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেননি। সকালে যেসব ফুটবলাররা প্র্যাকটিস করতে আসত সেটা তিনি নিজে দেখতেন এবং কোচ ও খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলতেন। মোহনবাগান ক্লাবের সকলকে নিয়ে চলার মতো দক্ষতা ছিল ওনার। ওনার আরও একটি বড় গুণ ছিল, কখনও ছোট-বড় সাংবাদিক দেখতেন না। বড় কাগজের সাংবাদিক বলে তাঁকে বেশি খাতির করা, আর ছোট কাগজের সাংবাদিক হলে কম খাতির, এগুলো তিনি করতেন না। সবাইকে সমান চোখে দেখতেন। এমনকী কোনও ছোট কাগজের সাংবাদিক যদি তাঁকে কোনও পরামর্শ দিতেন তিনি সেই পরামর্শ গ্রহণও করতেন। খেলা, খেলোয়াড় ও রাজ্যের খেলাধুলার উন্নতির ক্ষেত্রে ওনার যদি মনে হত উনি এগিয়ে এলে, কোনও কাজ করলে খেলার জন্য আরও উন্নতি হবে, সেটাও চিন্তাভাবনা করতেন। এখানেই ওনার পরিপূর্ণতা।

আমি যখন কোনও খবরের জন্য ওনাকে ফোন করতাম উনি একটা কথা বলতেন, খবরটা এমনভাবে করতে যেন ক্লাব বা খেলোয়াড়দের কোনও ক্ষতি না হয়। খেলাধুলার বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় পরিষ্কার ছিল। অনেক ক্ষেত্রে ওনাকে অনেকে অপছন্দ করত বা খারাপ কথা বলতো, উনি সেগুলোকে ভুল প্রমাণ করে দিতেন। আমি আজ একজন ভালো বন্ধু হারালাম।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here