স্মৃতির পাতা থেকে: বিশ্বশান্তির দূত হয়েই ভারতে এসেছিলেন মহম্মদ আলি

0
kolkata bengali news

সমীর গোস্বামী (বিশিষ্ট ক্রীড়াসাংবাদিক): ১৯৯০ সালের ২৬ ডিসেম্বর, বুধবার। বিশ্বের সর্বকালের সেরা বক্সার মহম্মদ আলি সেদিন এসেছিলেন কলকাতায়। ছিলেন তাজ বেঙ্গল হোটেলে। খবর পেয়েই চিত্র সাংবাদিক সুবীর মজুমদারকে নিয়ে ছুটে গেলাম তাঁর হোটেলে। ঘড়ির কাটা তখন রাত সাড়ে আটটা ছুঁইছুঁই। ৩২৪ নম্বর ঘরের দরজায় টোকা মারলাম। কোনও সাড়াশব্দ নেই। আমার চিত্রসাংবাদিক বন্ধু যেন একটু নার্ভাস হয়ে পরল। ওকে সাহস দিলাম। ঠিক ৮.৪৫ মিনিটে রুমের দরজা খুলে আমাদের সামনে উপস্থিত হলেন ‘দ্য গ্রেটেস্ট বক্সার অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ মহম্মদ আলি।

তাঁর হাতদুটো তখন যেন একটু কম্পমান। আমাদের জানা ছিল যে তিনি পারকিনশন রোগে ভুগছেন। আমরা ব্যাপারটি তাই স্বাভাবিক ভাবেই নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলাম। তখন তিনি আমার সামনে এসে বক্সিং করার ভঙ্গিতে হাত তুলে দাঁড়ালেন। তারপর ইশারায় আমাকেও একই ভাবে বক্সিংয়ের ভঙ্গিতে দাঁড়াতে বললেন। এরপর আমার চিত্রসাংবাদিককে বললেন ছবি তুলতে। আমাদের ছবি তোলা হলে সুবীরের থেকে ক্যামেরা নিয়ে আমার হাতে দিলেন, আর সুবীরকে বললেন এবার বক্সিং করার ভঙ্গি করতে। ফটোগ্রাফারের ভূমিকায় তখন আমি।

তারপর এল সাক্ষাৎকার নেওয়ার পালা। তিনি বললেন,

‘আমি শান্তির দূত হয়েই তোমাদের দেশে এসেছি। মাদার টেরেসার সঙ্গেও দেখা করেছি। কলকাতার মানুষ আমায় যতটা ভালবাসা দিয়েছে, তা আমি কখনও ভুলবো না।’

খুব আসতে আসতে বলছিল কথা গুলো। হয়তো আমাদের বুঝতে যাতে সুবিধা হয়, সেই কারণেই। তারপর দিন আমরা ওনার কালীঘাটে গিয়েছি, মসজিদে গিয়েছি। সব জায়গাতেই ওনার মুখে শুধু বিশ্বশান্তির কথা।

এক প্রশ্নের উত্তরে আলি জানিয়েছিলেন যে, ওনার কাছে পৃথিবীর সেরা পুরুষ নেলসন ম্যান্ডেলা ও সেরা নারী মাদার টেরেসা। সত্যি বলতে কী বক্সিং রিংয়ে মানুষটি যতই আক্রমণাত্মক হন না কেন, আসল জীবনে সবসময় শান্তি চাইতেন। মার্কিন সেনার হয়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে রাজি হননি তিনি। তাঁর ওই সিদ্ধান্ত তখন গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। তিনি সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন, ওদের (ভিয়েতনাম) সঙ্গে লড়াই করব কেন?

মহম্মদ আলির আসল নাম ক্যাসিয়াস ক্লে। পরে ধর্মান্তরিত হয়ে নাম রাখেন মহম্মদ আলি। ফুটবলে যেমন পেলে, ক্রিকেটে যেমন ডন ব্র্যাডম্যান, ঠিক তেমনই বক্সিংয়ে মহম্মদ আলি। সবার সেরা। একটা সময় বক্সিংকে হিংস একটি খেলা বলে মনে করা হত। মহম্মদ আলিই বক্সিংকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।

মহম্মদ আলিকে প্রশ্ন করে জেনেছিলাম, তাঁর প্রিয় ফুটবলার হচ্ছেন পেলে এবং প্রিয় ক্রিকেটার গারফিল্ড সোবার্স। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ওনারা দুজন কৃষ্ণাঙ্গ বলেই কি পছন্দ করেন? জবাবে বলেছিলেন, ‘ওরা দুজনেই নিজেদের খেলার মাধ্যমে মানুষকে মুগ্ধ করেছেন, আনন্দ দিয়েছেন। তাই আমি ওদের পছন্দ করি।’

এরপর আমি ওনাকে বলেছিলাম যে ইয়ান বোথাম ও ইমরান খান দুজনেরই প্রিয় বক্সার তিনিই। এই উত্তরে উনি খুব বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘আমি কেন ওদের প্রিয় হলাম বলতে পারব না। কিন্তু ওনারা যে আমায় এত সম্মান দেন, শ্রদ্ধা করেন, এটা জেনে আমি খুব আনন্দিত।’

১৯৪২ সালের ১৭ জানুয়ারি আমেরিকার লুইসভিলে জন্ম হয়েছিল মহম্মদ আলির বা তখনের ক্যাসিয়াস ক্লের। মাত্র ১২ বছর বয়সে স্থানীয় পুলিশ অফিসার ও বক্সিং কোচ জো মার্টিন তাঁকে বক্সিংয়ে নিয়ে আসেন। এক বাইসাইকেল চোরকে ধরতে গিয়ে তিনি দেখেন মাত্র ১২ বছরের একটি ছেলে ঘুসির জোরে চোরকে কাবু করে ফেলেছে। সেই শুরু। সেই ক্যাসিয়াস ক্লে আজও মানুষের মনে মহম্মদ আলি হয়েই অমর হয়ে আছেন।

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here