bengali

দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়: গোপালকৃষ্ণ গোখলে (১৮৬৬-১৯১৫) এই কথাটা বলে বাঙালির মূলে এক সর্বনাশ করে গেছেন। হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমোরো। বাঙালির মনে অহংকার ও উন্নাসিক হবার প্রথম পেরেকটি তিনি মেরে দিয়েছিলেন। সেই পেরেক পরে আরও সাংঘাতিক রূপ নিয়েছে।

অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত বাঙালি জনগণের যে জাগরণ বিভিন্ন সামাজিক শাখায় দেখা গিয়েছিল, তার প্রধান মাধ্যম ছিল বাঙালির পড়াশোনা, শিক্ষা ও জানার প্রতি আগ্রহ। ইচ্ছা ছিল শিক্ষার নতুন আলো নিজের মধ্যে প্রবেশ করানো। এই জাগরণের প্রথম তত্ত্বটি আমাদের দেখান বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। যতই আমরা বাহুবল নিয়ে, বিপ্লব নিয়ে তড়পাই না কেন– শিক্ষাবলই আসল। শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব আর বিপ্লব আনে মুক্তি।

বাঙালির মন থেকে হারিয়ে যাওয়া এক ব্যক্তিত্ব হলেন রমেশচন্দ্র দত্ত (১৮৪৮-১৯০৯)। এই নেটিভ, ইংরেজ সরকারের অধীনে চাকরি করতেন– প্রভূত জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। ইংরেজ সরকারের চাকরি থেকে অবসরকালে তিনি আমাদের দেশের বিভিন্ন রাজাদের সভায় পরামর্শদাতা হয়েছিলেন। এই শতাব্দীতে বাঙালি রাজনীতি, সমাজনীতি, বাণিজ্যনীতি নিয়ে সবার আগে অগ্রসর হত। বাঙালি সমগ্র বিশ্বের নতুনত্বকে দু’হাতে নিজের বুকে আলিঙ্গন করেছিল।

মধুসূদন গুপ্ত (১৮০০-১৮৫৬) প্রথম ভারতীয়, যিনি প্রথম শব ব্যবচ্ছেদ করেন মেডিক্যাল কলেজে। এই দিনটিকে স্মরণীয় করার জন্য ফোর্ট উইলিয়াম থেকে তোপধ্বনি হয়েছিল। রাধানাথ শিকদার (১৮১৩-১৮৭০) জরিপে কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন হিমালয় মাপার ক্ষেত্রে। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় (১৮৬৪-১৯২৪) কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিলেন বিভিন্ন শিক্ষা শাখায়। আরও মজার কথা, রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১) পুত্র রথীন্দ্রনাথকে (১৮৮৮-১৯৬১) পাঠিয়েছিলেন বিদেশে উন্নত কৃষি বিষয়ে শিক্ষার জন্য। তখন বাংলার গ্রামে কৃষিপদ্ধতিকে উন্নত করা বিশেষ প্রয়োজন ছিল। সমবায় কৃষি সম্বন্ধে চিন্তাভাবনা শান্তিনিকেতনের সুরুলেই আরম্ভ হয়েছিল।

গোখলের প্রথম মারা পেরেক যে সাংঘাতিক রূপ নিয়েছে, আগেই বলেছিলাম– তা দেখা দিল স্বাধীনতার সময় ও স্বাধীনতোত্তর কালে বাংলার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সমাজনৈতিক পরীক্ষায়। এই পরীক্ষা একটা মতবাদের ওপর চলছিল, সেটা সাম্যবাদ। সেখানে যে বিরাট সফলতা পেয়েছিল বলে মনে হয় না। তবে এই পরীক্ষা বাঙালি সমাজকে একটা ধাক্কা দিয়েছিল নিঃসন্দেহে আর ভারতের বিভিন্ন অংশে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল।

এই সাম্যবাদ পরীক্ষাকালে শিক্ষার মানকে নামিয়ে সাম্যবাদ আরও তাড়াতাড়ি আনা যায় কি না সেই হাওয়া সমাজে বিরাজ করছিল। ইংরেজি ভাষা উঠে গেল। এর ফলে বাংলাভাষাও খুব যে একটা উন্নত হল, সেটা দেখা গেল না। শিক্ষার শ্রেণিস্তরে পাস-ফেল সঙ্কুচিত হল– ধর্মীয় স্তরের দার্শনিক বোধের মতো লজ্জা-মান-ভয় হারিয়ে গেল।

অনেকগুলো দশক পার হল। সাম্যবাদে মশগুল বাঙালি পরে বুঝতে পারল, এভাবে হয় না। বাঙালি যুবকরা পরাজিত রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে বাস্তবতাকে মেনে নিল। নতুন ভাবে চিন্তা আরম্ভ হল। হারিয়ে গেল তেভাগা আন্দোলন, নকশাল আন্দোলন, বর্গাদার আন্দোলন। মনের মধ্যে থেকে মুছে গেল তেলেঙ্গনার শ্রীকাকুলামের বিদ্রোহ, ভিয়েতনামের হো-চি-মিনের নাম। বিপ্লবের বিভিন্ন তত্ত্ব ও তথ্য হয়ে গেল পুঞ্জীভূত অলীক স্বপ্ন। বাম গণসংগঠনে ধরল ফাটল। অন্য চিন্তা, অন্য বোধ, অন্য ধারণা সেই ফাটলের মধ্যে ঢুকে পড়ল– আর বাঙালি সমাজকে মেরামত করতে লাগল। সেটা ভাল না খারাপ ইতিহাস পরে বলবে।

আমাদের বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণ করে দেখতে হবে কোন উপসংহারটা ঠিক। যেখানে এসে দাঁড়িয়ে স্লোগান তুলতে হবে– বাঙালি আবার পারল, বাঙালি আবার করে দেখাল। যেখানে প্রমাণিত হয়, বাঙালি পারে। আরও বলা যেতে পারে, বাঙালি পারুক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here