রিঙ্কু ভট্টাচার্য, বর্ধমান: সুপ্রীম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে যে ৩৪ শতাংশ আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দীতায় জয়ী হয়েছে, সেই সব আসনে তাদেরকে জয়ী বলে ঘোষনা করতে পারবেনা রাজ্য নির্বাচন কমিশন। তাই সুতোয় ঝুলছে সেখ সেকেন্দরের নির্বাচনী ভাগ্য। কিন্তু তা বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকার বান্দা নন সেখ সেকেন্দার বা এলাকার মানুষের কাছে পরিচিত সূরয। তাই জয়পরাজয়ের রসায়ন দূরে সরিয়ে রেখে সূরয নেমে পড়েছেন এলাকার ভাবমূর্তি পরিস্কারে। জায়গাটা বর্ধমান শহরের উপকন্ঠে সরাইটিকর গ্রাম পঞ্চায়েতের কেষ্টপুর এলাকা। বর্ধমান-১ ব্লকের এই এলাকা থেকেই দ্বিতীয়বারের জন্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন সূরয। কিন্তু এই এলাকাতেই এখন এমন বেশ কিছু সামাজিক সমস্যা দেখা দিয়েছে যা এলাকাবাসীকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। সূরয নেমেছেন সেই ক্ষোভ প্রশমনে।

কি হয়েছে কেষ্টপুরে? বর্ধমান শহর লাগোয়া এই এলাকায় সম্প্রতি চোলাই মদ খেয়ে দুই যুবকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তার জেরে বেশ কিছু চোলাই মদের ঠেক ভাঙচুরও করেন তারা। কিন্তু সমস্যার শিকড় সেটা নয়। কেষ্টপুর গ্রামেই গত ৮-৯ মাসে মাথা তুলেছে বেশ কয়েকটি বহুতল। আর তাতে এসে বাসা বেঁধেছে বর্ধমান শহরের বেশ কিছু পানশালার পেশাদার গায়িকা আর নর্তকীরা। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ওই সব বহুতলেই রাতের অন্ধকারে বিভিন্ন ধরণের লোকজনের আনাগোনা বেড়েছে। বিষয়টি তারা প্রথমে বুঝতে পারেননি। কিন্তু সম্প্রতি গ্রামের মহিলারাই জানতে পারেন ওই সব বহুতলে এখন প্রতিদিন রাত্রে দেহব্যবসার আসর
বসতে শুরু করেছে। পাশাপাশি দিনের বেলাতেও এলাকার মহিলা থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের মেয়েরাও লজ্জা পাচ্ছে রাস্তাঘাটে বেরোতে ওই সব গায়িকা ও নর্তকীদের পোশাকআশাক রকমসকম দেখে। সমস্যা সেখানেই থেমে যায়নি। এলাকাতেই রয়েছে একটি চপ-মুড়ি-চায়ের দোকান। সন্ধ্যা হলেই তাতে ভিড় জমাতে শুরু করেছিল অসামাজিক লোকজন। সন্ধ্যে হলেই সেখানে আড্ডা বসতে শুরু করেছিল। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল মহিলাদের কটুক্তি করা। ভয়ে রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে পারছিলেন না মহিলারা। এরই পাশাপাশি গ্রামের একটি বাড়িতে নিয়মিত ভাবে বসতে শুরু করেছিল জুয়ার ঠেক। তাতে আসামাজিক মানুষের ভিড় তো ছিলই, এলাকার কিছু তরুণ যুবকও সেখানে ভিড় জমাতে শুরু করেছিল। সঙ্গে শুরু হয়েছিল টাকার ভাগাভগি নিয়ে নিত্য দিনের মারামারি। তাতেই প্রমোদ গোণেন এলাকাবাসী।

এই সব কিছু কানে গিয়েছিল সেখ সেকেন্দারের। ভোটের জন্য প্রথমে কিছু করতে পারছিলেন না। তিনি নিজে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় জিতলেও পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা পরিষদের আসনে নির্বাচন হচ্ছে কেষ্টপুরে। বৃহস্পতিবার সুপ্রীম রায়ে ঝুলতে শুরু করেছে তার জনপ্রতিনিধিত্ব ভাগ্য। তার মতো একই অবস্থা সরাইটিকর গ্রাম পঞ্চায়েতের আর সদস্যদেরও। কারন সকলেই জিতে গিয়ছিলেন রাজ্যের শাসক দলের টিকিটে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায়। ঠিক এইরকম অবস্থায় এলাকার সমস্যার সমাধানেই পথে নেমে পড়লেন সেখ সেকেন্দার। তার নেতৃত্বেই এলাকাবাসীদের পাশাপাশি দলের কর্মীরাই এগিয়ে এলেন সমাজসংস্কারের জন্য। প্রথমেই বহুতল মালিকদের জানিয়ে দিলেন দ্রুত বহুতলের অসামাজিক ভাড়াটিয়াদের তুলে দিতে হবে। না হলে এলাকাবাসীরাই এগিয়ে এসে যা করার তা করে নেবেন। বহুতলের মালিক সেখ মহিম, সামসুল লায়েক প্রমুখরা তাদের কাছে স্বীকার করেছেন, তারা অর্থের জন্যই ওই ভাড়া দিয়েছেন। কিন্তু যেহেতু গ্রামবাসীরা আপত্তি তুলেছেন তাই গ্রামবাসীদের সুবিধার্থেই তারা ভাড়া তুলে দেবেন। হানা দেওয়া হয়েছে চপ-মুড়ি-চায়ের দোকানেও। সেখানে দোকানের মালিককে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে আড্ডার ঠেক তুলে দিতে। হানা দেওয়া হয়েছে এলাকার এক মদের দোকানেও। সেখানে কয়েক দশক ধরে মদ বেচে আসছেন ৬০ বছরের বৃদ্ধা খেমাদাস রাজবংশী। তাকে জানিয়ে দেওয়া হয় মদ বেচা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। বৃদ্ধার আবদার, তাকে রোজগারের পথ দেখানো হলে তিনি বন্ধ করে দেবেন মদ বেচা। ঠেক বন্ধ করার ফতোয়া দেওয়া হয় জুয়ার ঠেকের মালিককেও। সব মিলিয়ে কেষ্টপুরের মানুষ এখন এলাকায় সুস্থ সামাজিক পরিবেশ বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর হয়ে উঠেছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here