নিজস্ব প্রতিবেদক, চুঁচুড়া: মাহেশ, গুপ্তিপাড়া, চন্দননগর, দশঘড়া, চুঁচুড়া সহ জেলার একাধিক জায়গার রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে উৎসবে মাতল গোটা হুগলি জেলা। শনিবার বিকেলে ভক্তদের উন্মাদনা ও উদ্দীপনাকে পাথেয় করে সাড়ম্ভরে জগন্নাথদেব বলরাম ও সুভদ্রারা গেলেন মাসির বাড়ি। এদিন বিকেলে রথের টান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভক্তদের ভক্তি আর উহ্লাসের বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল মাহেশের পূণ্যার্থীদের। লক্ষ্যাধিক ভক্তের উপস্থিতিতে জগ্ননাথদেব এদিন মাসির বাড়ি যাত্রা শুরু করেন। প্রায় এক কিলোমিটার পথ যেতে এদিন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। এদিনের এই রথযাত্রাকে ঘিড়ে মানুষের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মত। শ্রীরামপুরের এই রথযাত্রা দেখতে জেলা ছাড়িয়ে আশেপাশের জেলা থেকে প্রচুর ভক্তেরা মাহেশে ভীড় জমিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক এই রথযাত্রাকে উৎসাহিত করতে এদিন শ্রীরামপুরে বিভিন্ন গন সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন রকম প্রচার অভিযান চালান হয়। ৬২২ বছর ধরে শ্রীরামপুরের মাহেশে জগন্নাথ মন্দিরে এই বিগ্রহ গুলির পুজো হয়ে আসছে। প্রতি বছর এই বিগ্রহগুলির অঙ্গরাগ সংস্কার হয় মাত্র। কিন্তু মূল কাঠামোর কোনও রুপ পরিবর্তন হয় না। পুরীতে প্রতি ১২ বছর অন্তর মুর্তির পরিবর্তন হলেও মাহেশের মুর্তির কোনও পরিবর্তন হয় না। যে সকল সেবায়েত মাহেশের ওই বিগ্রহগুলির অঙ্গরাগ করেন, তাদের কথায় কোনও এক অঞ্জ্যাত কারনে বিগ্রহগুলি দিন দিন ভারী হয়ে যাছে।

প্রথম দিকে মাহেশে কাঠের তৈরি রথ থাকলেও, সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই রথের আকার আকৃতি বদলে গিয়েছে। ১৩১বছর আগে কলকাতার বাসিন্দা কৃষ্ণকান্ত বসুর আর্থিক ব্যায়ে ১২৫টন ওজনের রথটি মার্কিন কোম্পানীকে তৈরির বরাত দেন। ৫০ফুট উচ্চতার এই রথটির ৯টি চুড়া বর্তমান। রথের সামনে তামার তৈরি নীল ও সাদা রঙের ঘোড়া রয়েছে। ১০০গজের ২টি ম্যানিলা রোফ দড়ি আছে। এই দড়ি ২তি রথ টানার কাজে ব্যবহার করা হয়। শ্রীরামপুরে রথের দিন সকাল থেকেই মন্দিরে পুজোপাঠ ও ভোগের ব্যবস্থা করা হয়। এদিন দুপুরে জগন্নাথদেব, মাসির বাড়ি যাবার উদ্যেশ্যে সোনার গহনায় সুসজ্জিত হয়ে ধীরে ধীরে রথে ওঠেন। রীতি মেনে তিথি নক্ষত্র দেখে মন্দির সংলগ্ন স্নান পিড়ির মাঠে জগ্ননাথ, বলরাম ও সুবদ্রাকে স্নান করানোর সঙ্গে সঙ্গেই সামগ্রীক ভাবেই শ্রীরামপুর মাহেশে রথযাত্রার প্রাক প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। কথিত আছে, শ্রীরামপুরের মাহেশের এই জগন্নাথ মন্দিরে চৈতন্যদেব, শ্রীরামকৃষ্ণ, মা সারদার আগমনে এই ভুমি পূণ্যভুমিতে পরিনত হয়েছে। রথের রশিতে টান দিতে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাহেশে এসেছিলেন বলে জানিয়েছেন, মাহেশ জিউ টাষ্টি বোর্ডের সম্পাদক সৌমেন অধিকারী।

এদিন রথযাত্রাকে সুষ্ঠভাবে সম্পূর্ন করতে জেলা পুলিশ ব্যাপকভাবে তৎপর ছিল। এদিন বিশেষ নজরদারীর জন্যে পুলিশের তরফে ড্রোন ওড়ানো হয়েছিল। ছিল কয়েকশো পুলিশ কর্মী। যদিও রথ উৎসবকে কেন্দ্র করে কোথাও কোনও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। শ্রীরামপুরের পাশাপাশি রথ উৎসবকে ঘিরে উন্মাদনা ছিল চন্দননগর ও গুপ্তিপাড়ায়। ১৭৫৮ খ্রীষ্টাব্দে যাদু ঘোষ নামে এক ব্যাবসায়ী স্বপ্নে আদেশ পেয়ে চন্দননগরে রথ ও মন্দির দুই তৈরি করেন। প্রথম দিকে এই রথটি কাঠের থাকলেও বর্তমানে রথটি লৌহ দ্বারা নির্মিত। অন্যদিকে গুপ্তিপাড়ার রথ ২৭৭ বছরে পদার্পন করল। ১৭৪০ সালে এই রথ উৎসব শুরু করেন মধুসুদানন্দ। পুরীর রথের সঙ্গে গুপ্তিপাড়ার রথের পার্থক্য হল, পুরীর রথকে জগন্নাথদেবের রথ বলে। আর গুপ্তিপাড়ার রথকে বলে বৃন্দাবন জিউর রথ। গুপ্তিপাড়ার রথের বৈশিষ্ঠ হল, এখানে ভান্ডার লুট হয়। ভারতবর্ষের কোথাও এই ভান্ডার লুট হয় না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here