ডেস্ক: রাজনীতি কখনও সরলরেখায় চলমান নয়৷ পরিস্থিতি অনুযায়ী তা পরিবর্তনশীল৷ আজ তুমি রাজা হলে, কাল ভিখারিও হতে পারো৷ রাজনীতিতে উত্থান-পতন অপরিহার্য৷ যে জনতা আজ তোমায় মাথায় তুলে নাচাচ্ছে, কাল ভূলুন্ঠিত করতে পারে৷ সাফল্যের জোয়ারে ভাসতে ভাসতে তোমার জাহাজ যেমন উল্টে যেতে পারে, ঠিক একইভাবে ব্যর্থতায় পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াত পারো তুমি৷ তবে নিজের প্রতি আস্থা থাকতে হবে৷ হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে ফের উঠে দাঁড়াতে হবে৷ তবেই নতুন করে সাফল্যের সন্ধান পাওয়া যাবে৷ এবং সেটাই করে দেখালেন কর্ণাটকে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী বর্ষীয়ান নেতা বি এস ইয়েদুরাপ্পা৷ দেখিয়ে দিলেন ব্যর্থতার দোলাচলে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে নেই, বরং অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে চলার নামই সাফল্য৷

মঙ্গলবার ২২৪ আসন বিশিষ্ট কর্ণাটক বিধানসভার নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়েছে৷ সেখানে ১০৬ আসন পেয়ে সবচেয়ে বড় দলের তকমা পেতে চলেছে বিজেপ৷ গণনা শেষ হওয়া পর্যন্ত এই আসন সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বিজেপির৷ এবং একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে কর্ণাটকের মসনদে বসতে পারে ইয়েদুরাপ্পার দল৷ এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সিদ্দারামাইয়ার কংগ্রেসের ঝুলিতে গিয়েছে ৭৩টি আসন৷ দেবগৌড়ার জনতা দল সেকুলার (জেডিএস) পেয়েছ ৪১টি আসন৷ ২টি আসন পেয়েছে নির্দল৷ এই ফলাফলও যদি শেষ পর্যন্ত থাকে, তাহলেও বিজেপির দিকে পাল্লাভারী৷ কারণ, এদেশের রাজনীতিতে ‘হর্স ট্রেডিং’ নতুন কিছু নয়৷ এবং মনে রাখা দরকার বিজেপি কিন্তু খুব ধনী দল৷ কেন্দ্রের ক্ষমতায় রয়েছে তারা৷ তবে ‘কিং মেকার’ জেডিএস-কে যদি কংগ্রেস সমর্থন করে এবং কুমারস্বামীকে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দেয় তাহলে অবশ্য ফল অন্যরকম হতে পারে৷

বিজেপি সরকার গড়ুক কিংবা কংগ্রেস, ইয়েদুরাপ্পার এই জয়কে কোনওভাবেই ছোট করে দেখার উপায় নেই৷ কর্ণাটক বিজেপিকে তিলেতিলে গড়েছেন তিনি৷ এর আগে ২০০৮ সালে কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন ইয়েদুরাপ্পা৷ তাঁর হাত ধরেই প্রথমবারের জন্য কর্ণাটকে সরকার গড়েছিল বিজেপি৷ তবে ইয়েদুরাপ্পার রাজনৈতিক কেরিয়ার খুবই বর্ণময়৷ তাঁকে নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি৷ ইয়েদুরাপ্পার বিরুদ্ধে বড়সড় দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগে জেলও যেতে হয়েছিল তাঁকে৷ এবারের ভোট প্রচারে কংগ্রেস এই ইস্যুটিকে কাজে লাগিয়েছিল৷ কিন্তু ভেঙে পড়েননি ইয়েদুরাপ্পা৷ বরং, সদর্পে ঘোষণা করেছিলেন তাঁর দল ১২৫ থেকে ১৩০টি আসনে জিতবে৷ এবং কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসবেন তিনি৷ ফলাফল ত্রিশঙ্কু হলেও পাল্লাভারী কিন্তু ইয়েদুরাপ্পারই৷

২০০৮ সালেও অবশ্য ইয়েদুরাপ্পার নেতৃত্বে সরকার গড়েছিল বিজেপি। কিন্তু সেবার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি তিনি। দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ হয়ে মুখ্যমন্ত্রীত্ব ছাড়তে হয়েছিল বর্ষীয়ান নেতাকে৷ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, অবৈধ লৌহ আকরিক খনির কেলেঙ্কারিতে তিনি সরাসরি যুক্ত৷ এই অভিযোগ প্রমাণ হয় এবং তাঁকে দোষী সাব্যস্তও করা হয়। ব্যাঙ্গালোর সেন্ট্রাল জেলে কাটাতে হয় বেশ কয়েকদিন৷ পরে জামিনে মুক্ত হন৷ এরপর নিজেদের স্বচ্ছ্ব ভাবমূর্তি ধরে রাখতে বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ইয়েদুরাপ্পার থেকে দূরত্ব বাড়াতে শুরু করে৷ দলের মধ্যে কোণঠাসা অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে ইয়েদুরাপ্পা নিজেই একটি পৃথক রাজনৈতিক দলের জন্ম দিয়েছিলেন৷ নাম রেখেছিলেন কর্ণাটক জনতা পার্টি। যদিও ২০১৪ সালে বিজেপি ফের ঘরে ফিরিয়ে নেয় ইয়েদুরাপ্পাকে। এরপর ২০১৬ সালে জেডিইউ-এর সঙ্গে কর্ণাটকে জোট সরকার গঠন করে বিজেপি।

কিন্তু সেখানে যে জোট শর্ত ছিল তা মানেনি ইয়েদুরাপ্পা৷ শর্ত ছিল, সরকার গঠনের পর প্রথম ২০ মাস ইয়েদুরাপ্পা কর্ণাটকের উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে কাজ করবেন, মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন জেডি(এস)-এর এইচ ডি কুমারাস্বামী। তারপর ইয়েদুরাপ্পাকে মুখ্যমন্ত্রীর আসন ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু ২০ মাস পেরিয়ে গেলেও মুখ্যমন্ত্রীত্বের পদ ছাড়তে অস্বীকার করেন কুমারস্বামী৷ স্বাভাবিকভাবেই জোট ছেড়ে বেরিয়ে যায় ইয়েদুরাপ্পার বিজেপি। কিন্তু এবার সম্ভবত মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসা থেকে ইয়েদুরাপ্পাকে আটকানো বেশ কঠিন৷ ৭৫ বছর বয়সী এই বর্ষীয়ান বুঝিয়ে দিলেন, ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়’!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here