football news

bengali news

 

কুণাল দাশগুপ্ত: কোচ পিকে বন্দোপাধ্যায়কে শুধু চেনা যায় সাতের দশক দিয়ে নয়, বরং কলকাতা ময়দান প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয়েছিল, আটের দশকের একেবারে শুরুতে। সালটা ১৯৮০। সুরজিৎ, ভাস্কর, চিন্ময়, প্রশান্ত, মিহির সহ একঝাঁক ফুটবলার ইস্টবেঙ্গল ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন মহামেডানে। ঠিক তার আগের বছর বিগ বাজেটের তারকা সমৃদ্ধ দল গড়েও মুখ থুবড়ে পড়েছিল ইস্টবেঙ্গল। ৮০ সালে পিকে ব্যানার্জি মোহনবাগান ছেড়ে সেই আনকোরা ইস্টবেঙ্গলের দায়িত্ব নেন। প্রায় ফুরিয়ে যাওয়া সুধীর কর্মকার, হাবিব, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য ও ময়দানের নতুন বাদশা মজিদ ছাড়া বলার মতো কেউ ছিল না তখন। সেই ভাঙাচোরা ইস্টবেঙ্গলকে আবার সাফল্যের মুখ দেখিয়েছিলেন পোড় খাওয়া প্রদীপ ব্যানার্জি।

প্রদীপ ব্যানার্জি কখনও ট্যাকটিকাল কচকচানির মধ্যে খুব একটা যেতেন না। অমুক সিস্টেম বা তমুক সিস্টেমের বিজ্ঞাপনও তাঁকে করতে হয়নি কখনও। তবে প্লেয়ারদের মধ্যে থেকে সেরাটা বের করে আনার কৌশল তাঁর রপ্ত ছিল। সেটাই তাঁকে ভারতের সর্বকালের অন্যতম সেরা কোচ হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। কী তাঁর কৌশল? এক) ম্যান ম্যানেজমেন্টটা তিনি শৈশবের ‘আমাদের ছোট নদীর’ মতো জলবৎ তরলং করে নিয়েছিলেন। দুই) মুষড়ে পরা ফুটবলারদের ভোকাল টনিক দিয়ে শরীরে অ্যাড্রিনালিনের স্রোত বইয়ে দিতে পারতেন।

৭২ সালে যখন ইস্টবেঙ্গলের দায়িত্ব নিলেন, সেই টিম নক্ষত্রখচিত, হিন্দি ছবি শোলের মতো। সুধীর কর্মকার, অশোকলাল ব্যানার্জি, হাবিব, আখবর, গৌতম সরকার, সমরেশ চৌধুরী তখন ভারতীয় ফুটবলে লাল-হলুদের অর্কেস্ট্রা বাজাচ্ছেন। এদের এক সুতোয় বাঁধা খুব একটা সহজ ছিল না। ম্যারাথন সাফল্যের জন্য প্রদীপ ব্যানার্জী দৌড় শুরু করলেন এদের নিয়ে। ৭২ সালে তার সৌজন্যেই ত্রিমিকুট জয় ইস্টবেঙ্গলের। ওই বছরই একটিও গোল হজম না-করে ইস্টবেঙ্গল জিতল কলকাতা ফুটবল লিগ।

৭৫ সালের কলকাতা লিগে সব ম্যাচ জিতে চ্যাম্পিয়ন হল ইস্টবেঙ্গল। ৭৫ সালেই টানা ছয়বার কলকাতা লিগ জিতে রেকর্ড গড়ল প্রদীপ ব্রিগেড। ৭৬ সালে তিনি মোহনবাগানে চলে যান। সাফল্য কিন্তু একবারের জন্যও থমকায়নি। কয়েকবছর আগের ফ্যাকাশে মোহনবাগান ভারতীয় ফুটবলের সেরা দল হয়ে উঠল এক লহমায়। এই প্লেয়ারদের সঙ্গেই আবার প্রদীপ ব্যানার্জিকে সামলাতে হল প্রসুন ব্যানার্জি, সুব্রত ভট্টাচার্য, শিবাজি ব্যানার্জি, বিদেশ বসু, মানস ভট্টাচার্য, শ্যাম থাপাদের। প্রদীপ ব্যানার্জির কোচিংয়েই ৭৭ সালে মোহনবাগান প্রথম ও শেষবারের জন্য ত্রিমুকুট জেতে। ৭৯ পর্যন্ত তিনি মোহনবাগানের কোচ ছিলেন। মোহন তখন সেই সময় সত্যি বাগান ছিল, যেখানে ফুটত নিত্যদিন সবুজ-মেরুন ফুল।

প্রদীপ ব্যানার্জির দ্বিতীয় গুণটি ছিল ভোকাল টনিক। সেই সময় ফুটবলারদের ক্লাবের প্রতি যে আনুগত্য ছিল, সেটাকে তিনি কাজে লাগাতে পারতেন ভরপুর। দুর্ধর্ষ পিয়ং ইয়ং, কসমস, হারারাত ম্যাচই তার প্রমাণ। এখনও গৌতম, সুভাষরা নির্দ্বিধায় বলতে পারেন, বহু কঠিন ম্যাচ তারা অবলীলায় বের করে এনেছেন তাঁদের গুরুদেবের তপ্ত ভাষণে। ভোকাল টনিক শব্দটা এবার হয়তো অভিধানেই থেকে যাবে। কলকাতার ফুটবল ‘পিক’-এ উঠেছিল যে কিংবদন্তি কোচের উপস্থিতিতে সেই পিকে ব্যানার্জির চলে যাওয়ায় ময়দান অন্ধকারাচ্ছন্ন হল। ফুটবল যখন কলকাতা থেকে ধীরে ধীরে গোয়া-বেঙ্গালুরুর দিকে সরে যাচ্ছে, তখন মনে হয় প্রদীপের আলো এই বঙ্গভূমির জন্য আরও কিছুদিন দরকার ছিল। তবে এক্ষেত্রে আরও একটা কথা মাথায় আসে। এই বিশে মার্চ ভারতীয় ফুটবলের জন্য একটা ‘বিষাক্ত’ দিন বলাই চলে। আজ চলে গেলেন পিকে ব্যানার্জি, আর ঠিক ১৭ বছর আগে এইদিনেই আমরা হারিয়েছিলাম কৃশানু দে’কেও।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here