ফিল্ম রিভিউ: পুজোতে বাঙালিদের কাছে সৃজিতের ‘গুমনামী’ উপহার

0
kolkata news

অর্ঘ্য নস্কর: যেটা বলেছিলেন সেটা করে দেখালেন। কথামতোই কাজটা করেছেন পরিচালক সৃজিত মুখার্জী। তিনি বারবার বলেছিলেন তাঁর পরিচালিত ‘গুমনামী’ কোনও রায় দেবে না কিংবা কোনও বিতর্ক সৃষ্টি করবে না। শুধুমাত্র কয়েকটি তথ্যকে দর্শকের সামনে তুলে ধরবেন আর তাতে তারাই প্রশ্ন করবেন ‘গুমনামী’ নিয়ে। নেতাজির অন্তর্ধান নিয়ে নানা কথা নানা তথ্য আলোচিত হয়েছে কিন্তু ভারত সরকার সবকিছুই নাকচ করে দিয়েছেন। শুধুমাত্র একটা তত্বেও তাঁরা বিশ্বাসী তাইওয়ানের তাইহুকো বিমানবন্দরে ১৯৪৫ সালে ১৮ অগাস্ট নেতাজির বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু। এর বাইরেও কিছু যে থাকতে পারে তা দেখিয়েছেন সৃজিত। ভুল-ঠিক কিংবা সত্য-মিথ্যা সেটা সময় বলবে। কিন্তু পরিচালক বহু তথ্য ও রিসার্চের মাধ্যমে বিমান দুর্ঘটনা ছাড়াও নেতাজির অন্তর্ধানের একাধিক তথ্য দিয়েছেন। বিমান দুর্ঘটনার ভুয়ো খবর ছড়িয়ে রাশিয়া হয়ে চিনের বর্ডার দিয়ে ভারতে এক সন্ন্যাসী রূপে প্রবেশ। এলাহাবাদে যাকে মানুষ ‘গুমনামী’ কিংবা ‘ভগবানজী’ নামে জানত সেখানে ক্ষণে ক্ষণে জায়গা বদল করে নেতাজি ছিলেন, তারপর স্বাভাবিক ভাবেই মৃত্যুবরণ করেন ১৯৮৫ সালে অথবা রাশিয়ার সঙ্গে ব্রিটিশদের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বন্দি করে নেতাজিকে হত্যা করার চেষ্টা সবটাই তুলে ধরেছেন সৃজিত।

কিন্তু রায় দেবেন জনতা। সিনেমা শুরুতেই দেখা যাচ্ছে মহাত্মা গান্ধী ও পন্ডিত জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গে মতবিরোধের জন্য জাতীয় কংগ্রসের সভাপতির পদ ছাড়ছেন নেতাজি। তারপর তৈরী করছেন নিজের সেনা ও নতুন দল ফরওয়ার্ড ব্লক। এরপর রুট ম্যাপের মাধ্যমে নেতাজির বিশ্ব জার্নিকে খুব নিপুণভাবে দেখিয়েছেন সৃজিত। পাশাপাশি বিমান দুর্ঘটনা কিংবা ‘গুমনামী’র ছদ্মবেশকেই সুন্দরভাবে বড়পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক। এদিকে ভারত সরকারের নির্দেশে নেতাজির অন্তর্ধান নিয়ে তিনটে কমিশন অর্থাৎ শাহনাওয়াজ কমিশন, খোসলা কমিশন ও মুখার্জী কমিশনের দেওয়া তথ্য গুলিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে মাঠে নামতে দেখা যায় একজন সাংবাদিক যিনি কিছু মাস আগেই নেতাজির ভক্ত ছিলেন না। কিন্তু একটি কাজের সূত্রে নেতাজির অন্তর্ধান নিয়ে দুটি বই ও নিজের দল ‘মিশন নেতাজি’ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নাম চন্দ্রচূড় ধর (অনির্বাণ ভট্টাচার্য)। তিনি কমিশনগুলির দেওয়া ও ভারত সরকারের শিলমোহর দেওয়া তথ্যকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছেন বেশকিছু রিসার্চ ওয়ার্কের মাধ্যমে। অর্থাৎ নেতাজির সময়কাল ও সাংবাদিক চন্দ্রচূড়ের সওয়াল-জবাব ও ‘গুমনামী’র রহস্য সবটাই সাবলীল ভাবে বড়পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক। মুখার্জী কমিশনের হেয়ারিং চন্দ্রচূড়ের লড়াই বেশ উল্লেখযোগ্য।

‘গুমনামী’ বানাতে গিয়ে কী পরিমাণ রিসার্চ ও লড়াই করতে হয়েছে পরিচালককে তা দর্শকেরা বড়পর্দায় দেখলেই বুঝতে পারবেন। এই বিষয়ে সৃজিত মুখার্জীকে কুর্ণিশ জানানো যায়। নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে চন্দ্রচূড়ের লড়াইয়ে অনির্বাণ ভট্টাচার্য জমিয়ে দিয়েছে খেলা। এই সিনেমার আরও একটি প্লাস পয়েন্ট হল মেকআপ। নেতাজি অর্থাৎ প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জীকে ওই লুকে নিয়ে যাওয়া কিংবা তাঁর পুড়ে যাওয়া দৃশ্যকে দেখানো বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল তা করে দেখিয়েছেন মেক আপ আর্টিস্ট সোমনাথ কুণ্ডু। এছাড়াও সাদা-কালো দৃশ্য ও রঙিন দৃশ্যের ট্রান্সফর্ম খুব ভালোই দেখিয়েছেন সৃজিত। তাই স্টোরি টেলার কিংবা পরিচালক কিংবা গবেষক যাই বলি না কেন সৃজিত মুখার্জীর নামের পাশে এই শব্দ গুলি কম পড়বে। অভিনয় প্রসঙ্গে প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জী এক মুহূর্তে বুঝতেই দেননি তিনি নেতাজি নন। তাঁর হাবভাব- চলন ধরণ বেশ রপ্ত করে অভিনয়টা ফুটিয়ে তুলেছেন প্রসেনজিৎ। অপরদিকে সাংবাদকি চন্দ্রচূড় ধরের চরিত্রে অনির্বাণ ভট্টাচার্য জমিয়ে দিয়েছেন খেলা। এছাড়াও তনুশ্রী চক্রবর্তীও সাবলীল অভিনয় করেছেন চন্দ্রচূড়ের স্ত্রী রোনিতার চরিত্রে।

ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ও গানে একটি আবেগের পরিবেশ করে তুলেছেন সঙ্গীত পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত। তাঁর প্রত্যেক্ষ প্রমাণ ‘সব সুখ চেইন’ গানে সিনেমাহলের মধ্যে দর্শকদের সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ানোর ঘটনা। অর্থাৎ বলাই যেতে পারে দুর্গাপুজোর আবেশে নেতাজির অন্তর্ধান বাঙালি তথা ভারতীয় মনে একটি অদ্ভূত অনুভূতির সঞ্চার করেছে। এখন ‘গুমনামী’র পর দর্শকদের মনে নানা প্রশ্ন জাগতে পারেই সেটাই মূল উদ্দেশ্যে ছিল পরিচালক। কারণ সিনেমার কথায় ‘শুধু শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ের স্ট্যাচু কিংবা কয়েকটা ভবন-সরণির নামে ‘নেতাজি’র উল্লেখ থাকলেই যে এই দেশ তথা বিশ্ব নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসকে মনে রেখেছে, তেমনটা নয়।’ ‘গুমনামী’ সিনেমার মাধ্যমে হয়ত সাধারণ মানুষের হয়ত গেঁথে বসবে নেতাজির প্রতি আবেগ। এই ঘটনাতেই হয়ত প্রায় সফল হয়েছেন সৃজিত মুখার্জী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here