ডেস্ক: রাতের আঁধারে স্বদেশ ছেড়ে হাজার হাজার অনুগামী নিয়ে হিমালয় পেরিয়ে একদিন তিনি পা রেখেছিলেন এই ভারতভূমে। তারপর থেকে স্বদেশের মুক্তির জন্য লড়াই চালিয়ে গেলেও নিজেও একাত্ম হয়ে গিয়েছেন সিন্ধু-গঙ্গা-কাবেরী বিধৌত ভারতভূমের সঙ্গে। পেয়েছেন বিশ্বশান্তির নোবেল পুরস্কারও। সেই তিনি এবার জানিয়ে দিলেন ‘ধর্মীয় সহিষ্ণুতা কাকে বলে তা বাংলাদেশ, পাকিস্তান আর সিরিয়ার মত মুসলিম দেশগুলি শিখুক ভারতের কাছ থেকে। বিশ্বশান্তি কাকে বলে তা ভারতে এসে দেখে যাও। ১২৫ কোটির দেশে আজও বহু ধর্ম, বহু জাতি, বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতির শান্তিপূর্ন অবস্থানই এই দেশকে ক্রমোন্নতির দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।’ তিনি দলাই লামা। তার এই ঘোষনা, এই অবস্থান কার্যত রাতারাতি গোটা বিশ্বে ভারতের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে তোলার পাশাপাশি চীনকেও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিল। আর দলাই লামার এই ঘোষনা এমন একটা সময়ে এল যখন গোটা দক্ষিন এশিয়া থেকেও ক্রমশ মুঠো শিথিল হতে শুরু করেছে বেজিংয়ের।

দলাই লামার এই ঘোষনায় কার্যত বিদেশনীতির ক্ষেত্রে বড়সড় জয় দেখছে সাউথব্লক। কিন্তু জয়টা কোথায়? ডোকালাম হওয়ার আগে গোটা বিশ্বে একটা ধারনা ছিল ভারত চীনকে ভয় পায়। এ দেশের সেনাবাহিনী ভয় পায় চীনা সেনাকে। বাস্তবিক অর্থে বিগত কয়েক দশক ধরেই দেখা যাচ্ছিল যখনতখন ভারত-চীন সীমান্ত পেরিয়ে এদেশে ঢুকে পড়ত চীনা সেনা। কিন্তু ডোকালাম সেই ভাবনা, সেই সময়কে কার্যত থমকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ডোকালামেই চীনার সেনাবাহিনীর সঙ্গে চোখে চোখ রেখে ঠায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিল ভারতীয় সেনা। হাজার ভয়, হুমকি, চাপ দেখিয়েও ভারতীয় সেনাকে ডোকালাম থেকে একচুলও সরাতে পারেনি বেজিং। গোটা বিশ্ব সেদিন দেখেছিল ভারতীয় সেনার সেই অনড় অবস্থান। গোটা বিশ্বই বুঝেছিল চীনের চোখে চোখ রেখে কথা বলার মত ক্ষমতা এখন আছে নয়াদিল্লির। বুঝেছিল বেজিংও, তাই ডোকালাম উত্তর পর্ব থেকেই ভারত নিয়ে ধীরে ধীরে হলেও সুর বদল ঘটাতে শুরু করেছে মাও জে দংয়ের দেশ। লক্ষণীয় বিষয় ডোকালাম উত্তর পর্বে ভারতীয় সীমানা অতিক্রম করে চীনা সেনার অনুপ্রবেশের ঘটনাও কার্যত থেমেই গিয়েছে। সেটাও যে একটা সমীহের জায়গা থেকে এসেছে সেটাও গোটা বিশ্ব বুঝেছে। এরই পাশাপাশি চিনের তরফেই এখন নানা ভাবে চেষ্টা চলছে ভারত ও চিনের মধ্যে যে সব বিষয় নিয়ে দীর্ঘ দিনের বিবাদ রয়েছে সেগুলি যথাসম্ভব আলাপ আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নিতে। তার অন্যতম হল তিব্বত-কাশ্মীর ইস্যু।

ভারত সরকার প্রথম দিকে স্বাধীন তিব্বতের পক্ষে সরব থাকলেও, পরে নয়াদিল্লী মেনে নেয় তিব্বত চিনের অংশ। বেজিং কিন্তু পাক-অধীকৃত কাশ্মীরকে ভারতের অংশ বলে মেনে নিতে চায়নি দীর্ঘদিন। ডোকালাম সেখানেও পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি চীন সরকার নিয়ন্ত্রীত একটি সংবাদমাধ্যমে ভারতের একটি মানচিত্র প্রকাশ করা হয়েছিল যাতে পাক-অধীকৃত কাশ্মীরকে ভারতের ভূখন্ড বলে দেখানো হয়েছিল। তা নিয়ে পাকিস্তান তীব্র আপত্তি জানালেও এখনও পর্যন্ত চীন সেই অবস্থান থেকে সরে আসেনি। আসলে বেজিং ও নয়াদিল্লির মধ্যে একটা সহমতে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তাগিদটা বেশি কিছুটা হলেও চিনের। কারণ বিশ্বে ভারতের ভাবমূর্তি, তার গ্রহণযোগত্যা, তার সামরিক ক্ষমতা, ব্রেন পাওয়ার এবং অবশ্যই এদেশের বাজার। চীন এই সব কিছু হারাতে চায় না নিজের অর্থনীতির স্বার্থেই। তাই চীন-ভারত এমন একটা অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে যেখানে ভারত না তিব্বত নিয়ে কিছু বলবে না চীন কাশ্মীর নিয়ে কিছু বলবে। ভারত তিব্বতকে আগেই চিনের অংশ বলে মেনে নিয়েছে, এবার চীনও কাশ্মীরকে ভারতের অংশ বলে মেনে নিতে শুরু করেছে। পাকিস্তান নিয়েও অবস্থান বদল ঘটছে চিনের, সেটাও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার পাশাপাশি পাকিস্তানকে ঘাড়ে নিয়ে বয়ে না বেড়ানোর মনোভাব থেকেই।

পাশাপাশি দক্ষিন এশিয়া জুড়ে চীন চেষ্টা চালিয়েছে অর্থ দিয়ে ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলিকে নিজেদের কুক্ষিগত করে নেওয়ার। সেই চেষ্টায় তারা বেশ কিছুটা সাফল্যও পেয়েছিল। চিনের কারণেই ভারতের সঙ্গে প্রভূত পরিমাণ সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল শ্রীলংকা, মালদ্বীপ ও নেপালের। যারা এক সময় শুধু ভারতবন্ধুই ছিল না ভারতের ওপর নিত্যদিনের নির্ভরশীল ছিল, তারাই ভারত বিরোধীতায় অবতীর্ন হয়। এই তালিকায় বাংলাদেশ ও ভূটানও আসতে পারত। আসেনি দুই দেশের বিচক্ষণ নেতৃত্বের জন্য। এখন নেপাল চিনের তাঁবে থেকে গেলেও চীন প্রীতি ঘুচে গিয়েছে শ্রীলংকা ও মালদ্বীপের। দুই দেশই আবার ঝুঁকছে ভারতের সঙ্গে মিত্রতা করার দিকেই। ঠিক এই মুহুর্তে দলাই লামার ঘোষনা গোটা বিশ্বে ভারতের ভাবমূর্তী যেমন উজ্জ্বল করেছে তেমনি বাংলাদেশ, পাকিস্তান, সিরিয়ার মত মুসলিম রাষ্ট্রগুলির কাছে পরিছন্ন বার্তাও পৌঁছে গিয়েছে, Follow India। লক্ষণীয় ভাবে মঙ্গলবার ফারুক্কাবাদে এক সম্মেলনে অংশ নিয়ে ভারত সম্পর্কে মুখ খোলার পাশাপাশি দলাই লামা ভারত-চীন সম্পর্কের উন্নতির ওপরেও জোর দিয়েছেন। ডোকালাম নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান,’দুই দেশকেই বসে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে। বাস্তবে হিন্দি চীন ভাই-ভাই শ্লোগানকে সত্যি করে দেখাতে হবে।’ দলাই লামার এই আশা, এই আবেদন একদিন হয়ত সত্যি হয়ে উঠবে। তার জন্য আরও কিছুদিন হয়ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে একথা অনস্বীকার্য চোখ রাঙানোর দিন শেষ হয়ে গিয়েছে। লাল ড্রাগনকে এখন আর ভয় পায় না মহাত্মা গাঁধীর দেশ। ডোকালাম সেটাই দেখিয়ে দিয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here