ডলার খরচে প্রযুক্তি এনেও শহরে বজ্রপাতে মৃত্যু মিছিল, প্রশ্ন ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নিয়েও

0

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বজ্রপাত সহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আগাম সর্তকতা পেতে বহু টাকা খরচ করে নতুন প্রযুক্তি আমদানি করেছে রাজ্য সরকার। গত বছরই মার্কিন সংস্থার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে কলকাতা সহ রাজ্যের বেশ কিছু এলাকায় ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ নামে ওই প্রযুক্তি বসানো হয়েছে। যার মাধ্যমে বজ্রপাতের ৪৫ মিনিট আগে থেকেই কোথায় তা পড়তে চলেছে সেই খবর পাওয়া যায় বলে প্রশাসনের দাবি। তারপরেও শহরে বর্ষা পুরোদমে শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বজ্রপাতে দুই ব্যক্তির মৃত্যু ওই প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

একই সঙ্গে বজ্রপাতে মৃতদের পরিবারকে দেওয়া ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক সংঘর্ষ বা বিষমদ খেয়ে মৃতদের পরিবারকে যেখানে দু’লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় সেখানে বজ্রাঘাতে মৃতদের পরিবারকে দেওয়া হয় মাত্র এক লক্ষ টাকা।

নবান্নের কর্তারা অবশ্য এই বৈষম্যের দায় কেন্দ্রের উপরেই চাপিয়ে দিয়েছেন।

মরসুমের শুরু থেকে ঢিমে তালে ব্যাটিং করার পর শুক্রবার থেকে দক্ষিণ বঙ্গে জোড়ালো ইনিংস শুরু করেছে বর্ষা। আর শুরুতেই কলকাতায় দুজন তার বলি হয়েছেন। জেলায় বাজ পড়ে প্রাণ গেছে আরও ৪ জনের। শুক্রবার বিকেলে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল চত্বরে যে জায়গায় বজ্রপাতে এক জনের মৃত্যু হল, তার অনতিদূরেই গত বছর একই ভাবে এক যুবকের প্রাণ যায়। গত বছর ২৮ জুলাই ময়দানে বজ্রপাতের শিকার হন অজয় মল্লিক নামে বছর সাতাশের এক তরুণ। গত বছর দক্ষিণ কলকাতার বিবেকানন্দ পার্কে একটি ক্রিকেট কোচিং ক্যাম্পে এক উদীয়মান ক্রিকেটারের মৃত্যু হয় বজ্রাঘাতে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ার প্রাথমিক কারণ বায়ুদূষণ। সরকারি সূত্রের খবর, গত বছর রাজ্যে অন্তত জনা ৩০ লোকের মৃত্যু হয়েছে বজ্রপাতে। এর পরেই নড়েচড়ে বসে নবান্ন।

মার্কিন মুলুকের মেরিল্যান্ডের বিশ্ববিখ্যাত সংস্থা ‘আর্থ নেটওয়ার্কে’র সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, খড়্গপুর, বড়জোড়া, হলদিয়া, শিলিগুড়ি এবং আলিপুরদুয়ারে ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ নামে প্রযুক্তি বসায় রাজ্য সরকার। এই প্রযুক্তির ব্যবহারে অন্তত ৪৫ মিনিট আগে বাজ পড়ার খবর পাওয়া যাবে বলে দাবি করা হয়েছিল। নবান্নের কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে এই নয়া প্রযুক্তির সংযোগ স্থাপনও করা হয়। ফলে নবান্ন থেকেই কোথায় কখন বাজ পড়তে পারে সে বিষয়ে প্রশাসনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে আগেভাগে সতর্ক করে প্রাণহানি ঠেকানো যাবে বলে আশা করেছিলেন রাজ্য প্রশাসনের কর্তারা।

কিন্তু শুক্রবার সহ সাম্প্রতিক কালের ঘটনাপ্রবাহ কার্যক্ষেত্রে প্রকৃতির কাছে প্রযুক্তির অসহায়তাই আরেকবার প্রমান করল বলে প্রশাসনের একাংশের অভিমত।

গত বছরের পর এ বছরও রাজ্যে বাজ পড়ে মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ১০ পেরিয়েছে বলে বিপর্যয় মোকাবিলা দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে। সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে যন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়েও। যা আরও উস্কে দিয়েছেন রাজ্যের বিপর্যয় মোকাবিলা মন্ত্রী জাভেদ খান। পুরো বিষয়টি এখনও পরীক্ষামূলক স্তরে রয়েছে এবং এর কার্যকারিতা এখনো প্রমানিত নয় বলে তিনি জানিয়েছেন। মন্ত্রী বলেন, ‘রাজ্যের আটটি জায়গায় সেন্সর বসানো হয়েছে। এই যন্ত্রগুলি বজ্রপাতের আভাস দিতে পারে। তবে এই নিয়ে মানুষকে আগাম সতর্ক করা সম্ভব কিনা, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।’ চুক্তি অনুযায়ী এই প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্যওই সংস্থাকে বছরে ৬৭ হাজার মার্কিন ডলার দিতে হচ্ছে সরকারকে। ভারতীয় টাকায় যার মূল্য আনুমানিক ৪২ লক্ষ ৮৬ হাজার টাকা। প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে যেখানে প্রশ্ন রয়েছে সেখানে ঋণে জর্জরিত রাজ্যের কোষাগার থেকে এই অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা কী, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষতিপূরণ কেন মাত্র ১ লক্ষ টাকা, সেই ব্যপারে প্রশ্ন করা হলে মন্ত্রী বলেন, ‘জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণের এই টাকাই দেওয়া হয়। বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের এক্তিয়ারভুক্ত। ফলে আমরা অসহায়।’ নবান্ন সূত্রের খবর, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মৃতদের পরিবার এবং আহতদের ক্ষতিপূরণে প্রতি জেলায় ৪ কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়েছে। বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের অধীনে থাকা ওই তহবিল থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষতিপূরণ প্রদানে জেলাশাসকদের নির্দেশ দেওয়া আছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here