kolkata news

 

নিজস্ব প্রতিনিধি,  বারুইপুর: কথায় আছে জন্ম থেকে মৃত্যু- সব ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয় পুলিশের। আর লকডাউন পরিস্থিতির মধ্যে ফের আর একবার সেই কথা প্রমাণ হল। এবার অন্য ভূমিকায় দেখা গেল জয়নগর থানার পুলিশকে। নিজরাই হাতে করে এলাকা থেকে মৃতদেহ নিয়ে গিয়ে দাহ করলেন শ্মশানে। আর সঙ্গী থাকলেন এলাকার এক প্রধান ও দুই যুবক।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে খবর, বৃহস্পতিবার অসুস্থ হয়ে মারা যান জয়নগর থানার দু’নম্বর ওয়ার্ডের এক বাসিন্দা। নাম রত্না ভট্টাচার্য (৬৩)। বাড়িতে একাই থাকতেন ওই বৃদ্ধা। বৃদ্ধার সন্তান বলতে একটিমাত্র কন্যা। বেশ কয়েক বছর আগে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন বর্ধমানে। লকডাউন পরিস্থিতির জন্য মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়েও আসতে পারিনি মেয়ে-জামাই কেউই। অগত্যা অসুস্থ বৃদ্ধার ভাই হুগলির শ্রীরামপুর থেকে চলে আসেন জয়নগরে। জয়নগরের এক চিকিৎসককে দেখিয়ে নিয়ে যান হুগলিতে। সেখানে ভাইয়ের কাছেই থাকছিলেন বৃদ্ধা। কিন্তু রক্তাল্পতাজনিত কারণে নিয়ে যাওয়ার পর কয়েক দিনের মধ্যেই মৃত্যু হয় ওই বৃদ্ধার। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, রক্তাল্পতা ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েই মৃত্যু হয়েছে তার। যা মূলত বয়সজনিত কারণে হয়ে থাকে। বৃদ্ধার শেষ ইচ্ছামতো নিজের এলাকা জয়নগরের বাড়িতেই গাড়িতে করে দেহ আনা হয় শেষকৃত্যসম্পন্ন করার জন্য। আর গোল বাধে সেখানেই। ততক্ষণে এলাকায় রটে যায় নোভেল কারোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ওই বৃদ্ধার। এলাকার লোকজন সেই ভয়ে সন্ধ্যাবেলা দরজা বন্ধ করে ঘরে ঢুকে পড়েন। শুধু তাই নয়, এলাকার কাউকেই পাওয়া যায়নি মৃতদেহটি শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

এলাকারই এক কলেজ ছাত্র শ্রীকান্ত চক্রবর্তীর  মারফত বিষয়টি জানতে পারেন জয়নগর থানার আইসি অতনু সাঁতরা। তিনি চিকিৎসকের কাগজপত্র দেখে বৃদ্ধাকে দাহ করার সিদ্ধান্ত নেন।  আইসি অতনুবাবু তাদেরকে রাজি করিয়ে নিয়ে যান জয়নগর-মজিলপুরে পুরসভার একটি শ্মশানে। কিন্তু শ্মশানে গিয়েও দেখা যায়, সেখানে কেউ নেই। বৃদ্ধার মৃত্যুর খবর পেয়ে পালিয়ে গেছেন শ্মশানের কর্মরত কর্মীরা।  ফলে সেই মৃতদেহ নিয়ে বেশ কয়েক কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ দুর্গাপুরের শ্মশানে আসতে হয় পুলিশকে। পুলিশ সেখানে গিয়ে দেখে সেখানেও লোকজন নেই। ততক্ষণে রাত গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। অগত্যা বহুড়ুর পঞ্চায়েত প্রধান স্নেহাশিস নাইয়াকে নিয়ে উপস্থিত হন শ্মশানে। স্থানীয় এক কাঠ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কাঠ নিয়ে চিতা সাজিয়ে শুরু করেন দাহ। বহুড়ুর পঞ্চায়েত প্রধান ও আইসি দু’জনে হাত লাগিয়ে অবশেষে বৃদ্ধাকে দাহ করেন। তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করেন ওই কলেজ ছাত্রটি ও তার বন্ধু।

এবিষয়ে আইসি অতনু সাঁতরা বলেন, এক বয়স্ক মানুষ স্বাভাবিক ভাবেই মারা গেছেন। বয়সজনিত কারণে মৃত্যু হওয়ার পরও এলাকায় রটে যায় যে করোনাভাইরাসে এই মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। মানুষ কুসংস্কার ও গুজবের উপর ভিত্তি করেই চারিদিকে যেভাবে ছুটছে, তা সত্যিই অস্বাভাবিক ব্যাপার। মৃত মানুষকে না পুড়িয়ে উল্টে সবাই পালিয়ে যায়। সত্যিকারের মহামারীর মতো পরিস্থিতি হলে কী হবে সেটাই সকলকে বোঝা উচিত। মানুষকে আরও সচেতন হওয়া দরকার। আর তবেই এই রকম কুসংস্কার থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসে শ্রীকান্তকে বারবার দেখা গেছে নিজের জীবনকে উপেক্ষা করে বেওয়ারিশ মড়া পোড়াতে। আর এখানে মড়া পোড়াতে উপস্থিত হয়েছেন অন্য এক ‘শ্রীকান্ত’। সঙ্গী থানার আইসি ও গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান। যুগের নিয়মে মহামারী ফিরে আসে কালে কালে। ঠিক হয়তো তেমন ভাবেই ‘শ্রীকান্ত’ ফিরে আসেন বারে বারে। সমাজের বুকে বেঁচে থাকুন এমন শ্রীকান্তরা আর তাদের মহানুভবতা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here