দিলীপ রায়: রাজ্যে সাতদফা লোকসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় ভোটগ্রহণ হবে উত্তরবঙ্গের কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ারে। এই দুই কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে আগামী ১১ এপ্রিল। উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ার লোকসভা কেন্দ্রের ভোটারদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক চা-শ্রমিক রয়েছেন। দার্জিলিং, ডুয়ার্স ও তরাইয়ের চা-শিল্পের উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল প্রায় সাড়ে চার লক্ষ ভোটার। এর ৫০ শতাংশই আলিপুরদুয়ারের। ফলে চা-শ্রমিকদের মতামতের উপর অনেকটাই নির্ভর করছে এই কেন্দ্রের ফলাফল।

উত্তরবঙ্গের এই কেন্দ্রটি একসময় আরএসপির গড় ছিল। ১৯৭৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত এই গড় অটুট রাখতে পেরেছিল আরএসপি। কিন্তু ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের পর দ্রুত শক্তি কমতে থাকে এই বামদলের। অন্যদিকে, আদিবাসী অধ্যুষিত এই লোকসভা কেন্দ্রে আরএসএসের হাত ধরে বাড়তে শুরু করে বিজেপির প্রভাব। এই লোকসভা কেন্দ্রের পশ্চাদপদ বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা দিয়ে মানুষের মন জয় করে আরএসএস। বিজেপি এর ফল পায় নির্বাচনে। ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সাধারণ নির্বাচনে এই কেন্দ্রে বিজেপি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনে আলিপুরদুয়ারে তীব্র ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। তৃণমূলের দশরথ তিরকে ২৯.৪৬ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। কিন্তু এই কেন্দ্রে শক্তিশালী দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে বিজেপি। পাশাপাশি, আরএসপির মনোহর তিরকে পান ২৭.৭২ শতাংশ ভোট এবং বিজেপির বীরেন্দ্র বরা ওরাওঁ পান ২৭.৩০ শতাংশ ভোট। বিজয়ী তৃণমূল পায় ৩ লক্ষ ৬২ হাজার ৪৫৩ ভোট। অন্যদিকে, আরএসপি পায় ৩ লক্ষ ৪১ হাজার ৫৬ ভোট এবং বিজেপি পায় ৩ লক্ষ ৩৫ হাজার ৮৫৭ ভোট। পরে পঞ্চায়েত ভোটে বিজেপির ভোট আরও বেড়েছে। বিপরীতে বামেদের জনসমর্থন আরও কমে যায়। আর রাজ্যে বিরোধী শক্তি হিসাবে উঠে আসে বিজেপি। কিন্তু সেক্ষেত্রেও চা-শ্রমিকদের সমর্থন পাওয়াটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ। পাশাপাশি, এই কেন্দ্রে বিজেপির জয় আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না রাজনৈতিক মহল।

উল্লেখ্য, উত্তরবঙ্গের চা-শ্রমিকরা চরম দুর্দশার মধ্যে রয়েছেন। ন্যূনতম মজুরি থেকে বঞ্চিত তাঁরা। এছাড়াও একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে চা-বাগান। বেকার হয়ে দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা। অনেক ক্ষেত্রেই বিনা নোটিশে চা-বাগান বন্ধ করে চলে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। অনাহারে-অর্ধাহারে দিনযাপন করছেন বহু চা-শ্রমিক। এদের স্থায়ী কোনও সমাধান না করতে পারলেও রেশনে খাদ্যশস্য দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে রাজ্য সরকার। যদিও অভিযোগ, তাও নিয়মিত পান না চা-শ্রমিকরা। চা-বাগানের সমস্যা নিয়ে একাধিকবার শ্রমিক-মালিক ও রাজ্য সরকার ত্রিপাক্ষিক বৈঠক করেছে। কিন্তু সমাধান এখনও অধরা রয়ে গিয়েছে। চা-শ্রমিকদের ১৫০ কোটি টাকার ওপর গ্রাচুইটি বকেয়া রয়েছে। বহু চা-শ্রমিক প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা থেকে এখনও বঞ্চিত। এই ক্ষেত্রে এখনও কোনও সদর্থক পদক্ষেপ নিতে পারেনি রাজ্য সরকার। পাশাপাশি, বাণিজ্যমন্ত্রী থাকাকলীন একাধিকবার চা-বাগান পরিদর্শন করে গিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নির্মলা সিতারামন। গত ফেব্রুয়ারিতে জলপাইগুড়িতে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও চা-বাগানের সমস্যাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেখার জন্য দলীয় নেতৃত্বকে নির্দেশ দেন। কিন্তু এরপরও চা-শ্রমিকদের সমস্যার সমাধান হয়নি। শ্রমিকদের নিয়ে দিশাহীন শ্রমিক নেতারাও। ফলে শ্রমিক মহলে জ্বলছে ক্ষোভের আগুন। ইভিএমে এই ক্ষোভের প্রতিফলন কীভাবে পড়বে তা বুঝতে পারছেন না পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদরাও। রাজনৈতিক মহল মনে করছেন, আলিপুরদুয়ার কেন্দ্রের ভোটের ফলাফল নির্ভর করছে এর ওপরই।

প্রসঙ্গত, তুফানগঞ্জ, কুমারগঞ্জ (এসটি), কালচিনি (এসটি), আলিপুরদুয়ার, ফালাকাটা (এসটি), মাদারিহাট (এসটি) এবং নাগরাকাটা (এসটি) বিধানসভা কেন্দ্রকে নিয়ে গঠিত আলিপুরদুয়ার লোকসভা কেন্দ্র। এই কেন্দ্রে মোট ভোটার ১৪ লক্ষ ৭০ হাজার ৯১১। গতবারের বিজয়ী প্রার্থী দশরথ তিরকেকে এবারও এই কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে তৃণমূল। বামফ্রন্ট প্রার্থী করেছে মিলি ওরাঁওকে। পাশাপাশি, কংগ্রেস প্রার্থী মোহনলাল বসুমাতাকে প্রার্থী করেছে এবং বিজেপি প্রার্থী করেছে জন বারলাকে। চা-শ্রমিকদের ক্ষোভের দিকে লক্ষ্য রেখে চা-শ্রমিক নেতা জন বারলাকে প্রার্থী করেছে বিজেপি। যদিও তাকে প্রার্থী করা নিয়ে দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। তবুও একসময়ের আদিবাসী বিকাশ পরিষদের নেতা জন বারলাকেই তুরুপের তাস করে মাঠে নেমেছে বিজেপি। সূত্রের খবর, জন বারলার হয়ে জনসভা করতে আলিপুরদুয়ারে আসবেন নরেন্দ্র মোদী। এই কেন্দ্রকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েই দেখেছে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। চা-শ্রমিকদের মধ্যে পরিচিত এই মুখ দশরথ তিরকেকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। তাদের মতে, দলীয় শক্তিকে সংহত করে গৈরিক শিবির লড়তে পারলে এই কেন্দ্র হাতছাড়া হতে পারে শাসকদলের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here