ডেস্ক: দক্ষিণী কাঁটায় বিদ্ধ গেরুয়া শিবির৷ পদ্মে চন্দ্রগ্রহণের ছায়া দিয়ে শুরু, পরে রেড্ডির হুমকি৷ এতেও রক্ষে নেই, ফের এক চন্দ্রের গ্রাসে মোদী-অমিত শাহ৷ অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুর এনডিএ সঙ্গ ত্যাগের ধাক্কার মধ্যেই ওয়াইএসআর কংগ্রেসে শীর্ষ নেতা জগন্মোহন রেড্ডির হুঙ্কার৷ সঙ্কট মুক্তি নেই, এবার নয়া সংযোজন তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর রাও৷ বিজেপির দাদাগিরিতে অসন্তুষ্ট সব শরিকই৷ শিবসেনা, শিরোমনি অকালি দল আগেই মুখ ফিরিয়েছে, হালকা হলেও কৌশলে চাপ বাড়াচ্ছেন মেহবুতা মুফতি, নীতিশ কুমাররা৷ তবে প্রথমে মন্ত্রীত্ব ও পরে জোট ছেড়ে বিজেপিকে মোক্ষম ঘা-টা দিয়েছেন চন্দ্রবাবু৷ এরপরই গোটা দেশজুড়ে শরিক বিক্ষোভ ভাইরাল হয়েছে৷ অবিজেপি মঞ্চকে পুষ্ট করতে এখন কোমড় বেঁধে ময়দানে নেমে পড়েছে দক্ষিণ ভারতের আঞ্চলিক দলগুলি৷ এনডিএ জোট ছাড়ার পরই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোন করেছিলেন চন্দ্রবাবু নাইডু৷ মমতাও তাঁকে এনডিও ছাড়ার জন্য অভিনন্দন জানিয়ে ছিলেন৷ এই মুহূর্তে গোটা দেশে কট্টর মোদী বিরোধী মুখ বলে পরিচিত মমতা৷ তাই ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি বিরোধী জোটে তৃণমূল সুপ্রিমো যে অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র হতে চলেছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷ ফেডারেল ফ্রন্ট অথবা তৃতীয় ফ্রন্ট, নাম যাইহোক না কেন মোদী বিরোধী জোটকে আরও মজবুত করতে এবার নবান্নে আসছেন চন্দ্রশেখর রাও৷ সোমবার নতুন সপ্তাহের প্রথমদিনেই নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি (টিআরএস) নেতা চন্দ্রশেখর রাও৷ যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল৷ বিজেপি বিরোধিতায় ইউপিএ কিংবা তার প্রধান শরিক কংগ্রেসের বাইরে পৃথক একটি ফ্রন্ট গঠন করার যে যৌক্তিকতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গোটা দেশের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, সেক্ষেত্রে তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আসন্ন বৈঠক নতুন কোনও দিশা দেখাতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে৷

ভবিষ্যত কেউ জানে না, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাইরে রেখে বিজেপি বিরোধী মঞ্চ গড়া যে কার্যত অসম্ভব সেটা বুঝেছে দেশের সব রাজনৈতিক দলগুলি৷ চব্বিশঘন্টা আগেই প্রাক্তন বিজেপি নেতা রাম জেঠমালানির মতো পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ তথা দেশের অন্যতম সেরা আইনজীবী পর্যন্ত দাবি করেছেন, মমতার নেতৃত্বে বিজেপি খতম হবে৷ আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সঙ্গে শুরু থেকেই সুসম্পর্ক মমতার৷ গতবছর পটনায় আরজেডি প্রধান লালু প্রসাদের ডাকা বিজেপি বিরোধী সমাবেশ অন্যতম বক্তা হিসেবে হাজির ছিলেন তৃণমূল নেত্রী৷ এনডিএ শরিক শিবসেনা সুপ্রিমো উদ্ধব ঠাকরের সঙ্গে মাসখানেক আগে বৈঠক হয়েছে তাঁর৷ শরদ পওয়ার, যশবন্ত সিনহার সমাবেশে নিজে হাজির না হলেও পাঠিয়ে ছিলেন দলীয় প্রতিনিধিকে৷ গুজরাতে মোদী-অমিত শাহের ঘুম কেড়ে নেওয়া হার্দিক প্যাটেল কিছুদিন আগেই নবান্নে দেখা করে গিয়েছেন মমতার সঙ্গে৷ গত সপ্তাহে প্রফুল প্যাটেল সাক্ষাৎ করেছিলেন তাঁর সঙ্গে৷ চন্দ্রবাবু নাইডু এনডিএ ছাড়ার পরই ফোন করেছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমোকে৷ আর সোনিয়া গান্ধি এখন মমতা কিংবা তৃণমূল ছাড়া কোনও জোটই যে ভাবতে পারেন না, তা স্বচ্ছ্ব জলের মতো পরিস্কার৷ আর এই সবকিছুই সম্ভব হয়েছে ২০১৪-এর পর থেকেই মমতার প্রবল মোদী বিরোধিতার সৌজন্যে৷

কেন্দ্রে সরকার ধরে রাখার জন্য এখনও ম্যাজিক ফিগার হাতে রয়েছে মোদী-অমিত শাহদের৷ তবে প্রয়োজনীন সংখ্যা ঝুলিতে থাকলেও গেরুয়া শিবির কিন্তু একেবারেই স্বস্তিতে নেই৷ লোকসভা নির্বাচনের এখন বাকি পাক্কা একবছর৷ তার আগেই শরিকি সমস্যায় জর্জরিত বিজেপি৷ ২০১৪ সালে দিল্লির মসনদে বসার পর আগে কখনও এতবড় সঙ্কটের মুখোমুখি হতে হয়নি মোদীকে৷ কংগ্রেস মুক্ত ভারত গড়ার যে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল মোদী-অমিত শাহ জুটি, তা অনেকাংশেই সফল৷ তবে গুজরাত নির্বাচনের পর থেকে একটু একটু করে চাকাটা ঘুরতে শুরু করেছে৷ মোদীর জনপ্রিয়তায় কোথাও যেন ভাটা পড়েছে৷ সেইসঙ্গে গুজরাত, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশে, উত্তরপ্রদেশে একের পর এক নির্বাচনের ফল কপালে ভাঁজ ফেলেছে বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বের৷ গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মতো শরিক দলগুলিও ঘাড়ে চেপে বসেছে নিজেদের দাবি-দাওয়া আদায়ে৷ তারই মধ্যে জোট বাঁধতে শুরু করেছে বিরোধীরা৷ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে একছাতার তলায় আসার কোনও চেষ্টাই বাদ দিচ্ছে না মোদী বিরোধীরা৷ সে সোনিয়ার ডাকা নৈশভোজ হোক, শরদ পওয়ার-যশবন্ত সিনহার ডাকা সমাবেশ কিংবা অবিজেপি দলগুলির শীর্ষনেতাদের একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎকার৷ সবটাই কিন্তু হচ্ছে ওই ২০১৯-এর দিকে তাকিয়ে৷ আর একছাতার তলায় এলে মোদীকে গদিচ্যুত করা যে খুব একটা কঠিন কাজ নয়, তা সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশ উপনির্বাচনে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সপা-বসপা জোট৷ অখিলেশ-মায়াবতী জুটি প্রমাণ করে দিয়েছে, মঞ্চ শক্ত হলেই গণেশ উল্টে যাবে বিজেপির৷

গেরুয়া শিবিরের এখন ‘না ঘর কা, না ঘাট কা’ অবস্থা৷ সংসদে হোক কিংবা বাইরে, বিজেপির দিক থেকে মুখ ফেরাচ্ছে একের পর শরিক৷ শুধু জোট ছেড়ে বেরিয়ে আসাই নয়, শরিক দলগুলি এখন বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধীদের সঙ্গে সরব হচ্ছে৷ যার জেরে কখনও কখনও সংসদ মুলতুবি পর্যন্ত করতে হচ্ছে৷ সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, যে দলটি ২০১৪ সালে নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার তৈরি করেছিল, কংগ্রেস ও আঞ্চলিক দলগুলির হাত থেকে একের পর এক রাজ্য ছিনিয়ে নিয়েছে, তারাই কিনা মাত্র চার বছরের শাসনকালে অনাস্থা প্রস্তাবের মুখে পড়ছে৷ গড়িয়ে গড়িয়ে নরেন্দ্র মোদী সরকার হয়তো পাঁচবছর কাটিয়ে দেবে, কিন্তু ২০১৯-এর আগে এই ছন্নছাড়া পরিস্থিতি গেরুয়া শিবরের কাছে যে অশনি সঙ্কেত সেটা বোঝার জন্য খুব বড় বিজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই৷

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here