kolkata news

Highlights

  • পূর্ব ভারতে যখন বৃহৎ বন্দর ছিল তাম্রলিপ্ত তখন ছিল এই তৈলকম্প
  • কথিত প্রাচীন ভাগীরথীর তীরে ছিল সমুদ্রমোহনার কাছে ছত্রভোগ বন্দর
  • শুশুনিয়া পাহাড়ের দূরত্বও ধুলুরি থেকে মাত্র ৫৫ কিলোমিটার

শিবানন্দ পাল: পূর্ব ভারতে যখন বৃহৎ বন্দর ছিল তাম্রলিপ্ত তখন ছিল এই তৈলকম্প, তেলকূপি। আদি গঙ্গার মোহনায় ছিল প্রাচীন গঙ্গারিডি রাজ্যের রাজধানী। সরস্বতীর তীরে ছিল সপ্তগ্রাম। আর সেই প্রাচীনকালে গঙ্গা-ভাগীরথীর আরও পশ্চিমে ছিল রাজমহল, সাঁওতালভূমি। ছোটনাগপুর, মানভূম, ধলভূমের তলদেশ দিয়ে সোজা দক্ষিণবাহিনী হয়ে সমুদ্রে পড়েছে গঙ্গা। এই প্রবাহে  যুক্ত হয়েছে অজয়, দামোদর ও রূপনারায়ণ। কথিত প্রাচীন ভাগীরথীর তীরে ছিল সমুদ্রমোহনার কাছে ছত্রভোগ বন্দর। এই সব বন্দর দিয়ে শুধু প্রাচ্যদেশেই বাণিজ্য হত তাই নয়, বাণিজ্য হত রোম, গ্রিক, ফিনিসিয় বনিকদের সঙ্গে। বাণিজ্যপোত দলে দলে এসে ভিড় করত এইসব বন্দরে। গঙ্গা ভাগীরথীর তীরে তীরে সেজন্য গড়ে উঠেছিল তৎকালীন সভ্যতার একটি কেন্দ্র। সপ্তডিঙা মধুকর নিয়ে বাণিজ্যে যেতেন ধনপতি, চাঁদসদাগর। যেতেন আরও কত বিখ্যাত অখ্যাত বণিক মহাজনরা। ভাগীরথী-গঙ্গায় পালতোলা জাহাজে ভেসে আসতেন তাঁরা সমুদ্রের মোহনায়।kolkata

তারপর ভেসে চলতেন সিংহল, সুবর্ণদ্বীপ, চম্পা, কম্বোজ, বালি, যবদ্বীপ প্রভৃতি দ্বীপ সমূহে। আরও কত দেশ বন্দরে। কেবল পণ্য‌ই নয়, বিনিময় হত নানা সংস্কৃতির পসারও। বাঁকুড়ার শুশুনিয়া পাহাড়ে শঙ্খলিপিতে রচিত একটি লেখা পাওয়া গিয়েছে, একটি টুকরো পাওয়া গিয়েছে পুরুলিয়ার ধুলুরিতে। শুশুনিয়া পাহাড়ে রাজা চন্দ্রবর্মার লেখার পাশেই আবিষ্কৃত হয়েছে সেই শঙ্খলিপির লেখ। প্রত্নতাত্ত্বিকরা লেখটি আনুমানিক ষষ্ঠ শতাব্দীর বলে মনে করেন। আর পুরুলিয়ার সাঁতুড়িতে ধুলুরির বিশ্রামজোড় সংলগ্ন খেজুর গাছের নিচে খোদিত শঙ্খলিপিটি আনুমানিক অষ্টম শতাব্দীর বলে মনে করছেন ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ। শঙ্খলিপিটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়, যা শুশুনিয়ার পর ধুলুরিতেই উদ্ধার হয়। তেলকুপির প্রাচীন দেউলগুলো থেকেও পাওয়া গেছে আনুমানিক দ্বাদশ শতকের কিছু প্রাচীন লেখ। সাঁতুড়ির ধুলুরি গ্রাম থেকে প্রাপ্ত লেখতে কেবল ‘শ্রীযুবরাজ’ শব্দটি পড়া সম্ভব হয়েছে।

আরও পড়ুন: এপ্রিল থেকে জুন মন্দিরগুলি দেখা যায়, তাহলে তেলকূপি সংরক্ষণের দাবি তোলা কি যুক্তি সঙ্গত নয়?

চারটি পঙ্গিতিতে লেখা অষ্টম শতকের এই লেখ আর কোনও শব্দের  পাঠোদ্ধার এখনও করা সম্ভব হয় নি। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের প্রাক্তন মহা অধিকর্তা গৌতম সেনগুপ্তের মতে, “ছোট নাগপুর উপত্যকার পুর্ব দিকে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া এবং বর্ধমান ও মেদিনীপুরের পশ্চিম দিকের এই অঞ্চলে প্রাচীন লেখ প্রায় অজ্ঞাত। সেক্ষেত্রে এই আবিষ্কার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।” সাঁতুড়ির লেখ প্রাক ইসলামিক যুগের ক্যালিগ্রাফিক বা আলঙ্কারিক লিপিশৈলির অন্যতম উদাহরণ বলে তিনি মনে করেন।

তেলকূপি পর্ব ১৭: এর থেকে সুন্দর এবং পবিত্রতম জায়গা আর কোথাও কী আছে?

ধুলুরি থেকে শুশুনিয়া পাহাড়ের দূরত্ব মাত্র ৩৫ কিলোমিটার আবার ধুলুরি গ্রাম থেকে রঘুনাথপুর মহকুমার প্রাচীন প্রত্নক্ষেত্র তৈলকম্প বা তেলকূপি মাত্র ৩২ কিলোমিটার দূরে। শুশুনিয়া পাহাড়ের দূরত্বও ধুলুরি থেকে মাত্র ৫৫ কিলোমিটার। ধুলুরি-শুশুনিয়া– তেলকূপি একটি আশ্চর্য অদৃশ্য প্রত্নতাত্ত্বিক ত্রিকোণ! আর এখানেই ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে পাঞ্চেত জলাধারের অতলে।
পুরুলিয়া জেলা জুড়ে জৈন সংস্কৃতির বিপুল  সম্ভার ছড়িয়ে রয়েছে। মূলত দামোদর নদ এবং কংসাবতী নদীর তীরবর্তী স্থানগুলিতে ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র পুরাতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, দেউল কিংবা দেবায়তন। এদের সকলের মূলে রয়েছে জৈন ধর্ম-সংস্কৃতির অজস্র  বিস্তার। বর্তমানে যেটুকু পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শ অবশিষ্ট রয়েছে সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি বলে মনে করেন সকলেই। বলতে গেলে প্রায় দু’হাজার বছর আগের সভ্যতা সংস্কৃতি একেবারে অবহেলায় অনাদরে শেষ হয়ে যেতে বসেছে।kolkata news

এই সমস্ত প্রত্নস্থলগুলি হতে পারতো গবেষণা, দর্শনের, অনালোচিত ইতিহাসের আকর। পুরুলিয়ার মাটি মহাবীরের পাদস্পর্শে পবিত্র, এখানে দাঁড়ালে বোঝা যায় অনালোচিত ইতিহাস কথা বলতে উন্মুখ। মাত্র একটি জৈন স্মৃতি স্তম্ভ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। ভ্রমি বিস্ময়ে … পাঞ্চেত জলাধারে জল বাড়লেই প্রত্নস্থলটি ধীরে ধীরে জলে ডুবে যায়। তখনকার রূপ আলাদা। জলাধারের বুকে মাছ ধরার জাল সহ ডিঙি বাঁধা আছে, এই জলাধারে নিয়মিত মাছ ধরা হয়। বেশ কয়েকটি কয়লা বোঝাই বস্তা ডাঁই করা রয়েছে ঘাটে। ওপাড়ে নিরসা, কোলিয়ারি অঞ্চল। ওদিক থেকে কয়লা এদিকে এসেছে নাকি এদিক থেকে ওদিকে যাচ্ছে বোঝা যায় না। কাকে জিজ্ঞাসা করব। দুপুর বেলা, কেউ কোথাও নেই।  নৌকাগুলো ঘাটে বেঁধে রেখে সবাই চলে গেছে।  এখানকার জৈন স্থাপত্য বা ভাস্কর্য সম্পর্কে অবহেলার কারণ কী হতে পারে! জৈন ধর্ম সম্পর্কে স্থানীয়দের অবহেলা? তবে কী পুরুলিয়ার প্রান্তিকতা? নাকি ইতিহাসে আমাদের অনিচ্ছা! বুঝতে পারি না। কিছু ব্রিটিশ স্থাপত্যবিদ ও গুটিকয় ভারতীয় ইতিহাস গবেষকদের দেওয়া তথ্য না থাকলে তেলকূপিকে চেনা দায়। যেটুকু দাঁড়িয়ে আছে তাকে যদি সংরক্ষণ করার চেষ্টা না হয়, খুব তাড়াতাড়ি সেটাও ধ্বংস হবে চিরতরে। মুছে যাবে প্রাচীন বাংলার এক অপরূপ নিদর্শন।

তেলকূপি পর্ব ১৬: বুধনি সাঁওতাল মেয়ে, তাঁর হাতেই পাঞ্চেত বাঁধের উদ্বোধন হয়

পাঞ্চেত জলাধার তৈরির সময় যে ভুল হয়েছে … একদল ভুল করেছিল বলে ভুলটা ভুল থেকে যাবে এমন কেন হবে! বর্তমান প্রযুক্তির উন্নয়নের যুগে এই সব রক্ষণাবেক্ষণ করা অসম্ভব কিছু নয়। আর এর ইতিহাস তো আমাদের দেশের বীরত্ব, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, শিল্প সংস্কৃতির অন্যতম উদাহরণ। তাহলে কেন একে আলোয় ফেরানোর কথা ভাবা হবে না?

রাজা রুদ্রশিখরের সময় তৈলকুম্পি অর্থাৎ তেলকূপি রাজধানী ছিল। রুদ্রশিখর অন্যান্য সামন্তরাজাদের সাথে জোট বেঁধে বঙ্গ দেশের শাসন কর্তা পালবংশের রাজা রামপালকে তাঁর রাজ্য বরেন্দ্রভূমি পুনরুদ্ধার করতে বা ভীমের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য সাহায্য করেছিলেন।

রাজা রুদ্রশিখরঃ
“শিখর ইতি সমর পরিসর বিসর দরিরাজ
রাজিগত্ত গধ্বগহন দহন দাবানল:
তৈলকম্পীয় কল্পতরু রুদ্রশিখর।”

অর্থাৎ- “যুদ্ধে যার প্রভাব, নদী-পর্বত ও উপান্তভূমি জুড়ে বিস্তৃত, পর্বত কন্দরের রাজবর্গের যিনি দর্প দহনকারী দাবানলের মতো সেই তৈলকম্পের কল্পতরু রুদ্রশিখর।”

kolkata

রুদ্রশিখরের রাজধানী সেই তেলকূপি মৃতপ্রায়। আজ কে তাকে অক্সিজেন দেবে? আসুন আমরা সকলে মিলে হাতে হাত ধরি। তেলকূপিকে বাঁচাতে হবে, এই আওয়াজ তুলি! পাকিস্তানের অন্দরে ‘কারতারপুর সাহেব’ শিখদের ধর্মস্থানকে উদ্ধার করার জন্য যদি জরুরী কালীন বিশেষ ‘করিডোর’ ব্যবস্থা তৈরি করা যায়। মুম্বই সমুদ্রোপকূলে ‘হাজি আলী দরগাহ’-এর যদি উপযুক্ত সংরক্ষণ এবং উত্তম যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হয়। সর্বোপরি কন্যাকুমারিতে বিবেকানন্দ শীলায় যাতায়াতের যদি উত্তম ব্যবস্থা করা যায় … তাহলে পাঞ্চেৎ জলাধার সংলগ্ন এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার জন্য উক্ত মন্দিরগুলি সংরক্ষণের জন্য এই জায়গায় উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা তৈরি সম্ভব নয় কেন? এখানে ধর্ম অনুপস্থিত বলে? এগুলি সম্ভব হলে তেলকূপিতে পর্যটন কেন্দ্র সহ একটি কেন্দ্রীয় প্রত্নগবেষণা কেন্দ্র তৈরি করা সহজ হবে। সংলগ্ন অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ছাত্রছাত্রীদের ইতিহাস সম্পর্কে আকৃষ্ট করা সহজ হবে। ইতিহাসের এই দায়বদ্ধতা আমরা যদি সঠিকভাবে পালন করতে পারি, তাহলে ক্ষতচিহ্ন বর্তমানে যতটা দাঁড়িয়ে আছে অন্তত সেটুকু সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়। আর এই কাজ যদি সত্যিই সম্পূর্ণ করা যায়- পুরুলিয়া শহর থেকে ৪৭ কিলোমিটার দূরে রঘুনাথপুর থানার অন্তর্গত তেলকূপি অঞ্চল … লালপুর, গুরুন, তারাপুর, জামডি, পাথরবিড়া, ঘরবিড়া প্রান্তিক  এই গ্রামগুলির চেহারা পাল্টে যাবে। পরিবর্তিত হবে এখানকার সমাজজীবন।

আরও পড়ুন: শেষ ৩টি মন্দিরের একটির খ্যাতি ছিল নাকি ‘ঘোস্ট টেম্পল অব তেলকূপি’ নামে

শিখরবংশের অপর প্রাচীন রাজধানী পঞ্চকোটগড় থেকে তৈলকম্পীর দূরত্ব উত্তর-পশ্চিমে মাত্র ১০.৫ মাইল। পশ্চিম বাংলার এই অঞ্চলে দ্রুত পর্যটন নির্ভর অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটবে। এই কাজে কেন্দ্র-রাজ্য উভয় সরকারেরই স্বার্থ রক্ষা হবে। সকলকে উদার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে ইতিহাসের স্বার্থে। মনে রাখতে হবে দেশের বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার বিশ্বসেরা মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজ্য সরকার গত কয়েক বছরে অনেক ভালো ভালো কাজ করেছে। বাংলার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের স্বার্থে পুরুলিয়া বাঁকুড়ার সাংসদ-বিধায়ক, জন প্রতিনিধিদের তেলকূপির ঐতিহ্যের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। এই বিষয়ে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষিত হোক।

kolkata

পর্যটন শিল্পের এই উন্নয়নের জন্য শুধু পশ্চিম বাংলার পশ্চাৎপদ জেলা হিসেবে পুরুলিয়া-বাঁকুড়া নয়, উপকৃত হবে ঝাড়খণ্ড রাজ্যও। তেলকূপির উন্নয়নের জন্য ঝাড়খণ্ড সরকারেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করা উচিত। উভয় রাজ্যের উন্নয়নের জন্য বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তেলকূপির উন্নয়ন ঘটলে ঝাড়খণ্ডের পরেশনাথ পাহাড়কে নিয়ে একদা এই অঞ্চলে হারিয়ে যাওয়া জৈন সংস্কৃতিরও বিকাশ ঘটবে। (সমাপ্ত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here