telkupi

Highlights

  • রঘুনাথপুর ২ ব্লকের সদর চেলিয়ামা থেকে কমবেশি সাত-আট কিলোমিটার দূরের এই তেলকূপি এখনও লোক-গবেষকদের চর্চার বিষয়
  • তৈলকম্প লোকমুখে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানের তেলকূপি হয়েছে
  • দামোদরের দক্ষিণপাড়ের একদা সমৃদ্ধ এই বন্দর থেকে তাম্রলিপ্ত অধুনা তমলুকের সঙ্গে জলপথে চলত বাণিজ্য
  • জৈন ধর্মের প্রসারে ভূমিকা নিয়েছিলেন জৈন ব্যবসায়ীরাই। যারা এই অঞ্চলের দু’টি তামার খনি থেকে তামা তুলে তৈলকম্প বন্দর দিয়ে তাম্রলিপ্তে নিয়ে যেতেন

শিবানন্দ পাল: ১৯৫৯ সালে দেবলা মিত্র যখন দামোদরের তীরে তেলকূপি পরিদর্শন করেন, তিনি বেগলার বর্ণিত প্রথম সমষ্টির ১৩টি মন্দিরের মধ্যে মাত্র পাঁচটিকে দেখতে পান। অনেকেই এই প্রথম সমষ্টির মন্দিরগুলিকে ভৈরবথান বলে উল্লেখ করেছেন বলে দেবলা মিত্র অবস্থিত এই মন্দিরগুলিকে ভৈরবথানের মন্দির বলে বর্ণনা করেছেন। বলেছেন, এই মন্দিরগুলির নিচের অংশ সারাবছর জলের তলায় থাকে। দামোদর নদীর জলে নিমজ্জিত থাকা সত্ত্বেও, প্রখর গ্রীষ্মে যখন নদীর জল কমে যায় তখন কিছু মন্দিরের উপরিভাগ দেখা যেত। এছাড়া আরও কিছু পুরাকীর্তি জেগে উঠত। তিনি দেখেছিলেন একমাত্র জুন মাসেই মন্দিরগুলির পূর্ণ অবয়ব ভেসে উঠত। দেবলা মিত্র-র মতে, ভৈরবথানে যে পাঁচটি মন্দির তিনি দেখতে পেয়েছিলেন সেগুলি বেগলার বর্ণিত প্রথম সমষ্টির ৬, ৮, ৯, ১০ এবং ১৩ নম্বর মন্দির। দেবলা মিত্র-র দ্বিতীয় পরিদর্শনের সময় মন্দিরগুচ্ছের ৯ আর ১০ নম্বর মন্দির অপেক্ষাকৃত ভাল অবস্থায় ছিল। ৬ নম্বর মন্দিরটির ভিত্তিমূল ধসে গিয়েছিল। ৮ নম্বর মন্দিরটিও পরিণত হয়েছিল ভগ্নদশায়। কিন্তু ৬ নম্বর মন্দিরটির থেকে অপেক্ষাকৃত ভাল অবস্থায় ছিল। ভৈরবথানের মন্দিরসমষ্টির বাইরে ১৩ নম্বর মন্দিরের একটি ভগ্নাংশের আশপাশে দেবলা মিত্র দেখতে পেয়েছিলেন অন্তত ১০টি মন্দিরের ভেঙে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ। এগুলি পাথরের স্তূপে পরিণত হয়েছিল। ১৩ নম্বর মন্দিরের অদূরে দেবলা মিত্র একটি ছাদবিহীন স্থাপত্য দেখতে পান। তিনি সেটিকে ১৯০১-১৯০২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত বলে উল্লেখ করেছেন এবং এও বলেছেন যে, এখানে খেলাইচণ্ডী দেবী প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। খেলাইচণ্ডী মহিষাসুরমর্দিনীর একটি চতুর্ভুজা রূপ। আরও পড়ুন… তেলকূপি নাকি প্রাচীন তৈলকম্পা রাজ্য, রাজত্ব করতেন শিখর বংশের রাজারা [পর্ব ১]

ভৈরবথানের মন্দিরগুলি ছাড়া দেবলা মিত্র অন্য দু’টি সমষ্টির মন্দিরগুলি যে অবস্থায় দেখেছিলেন তার বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন যে, ১৬ নম্বর মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে মন্দিরের বেঁকি, আমলা, খাপুরি ও চূড়া অবশিষ্ট ছিল। এই মন্দিরটির নাম গাঁওবেদিয়ার দেউল। এর মূলদরজার কাঠামো বেশ সুসজ্জিত। দরজার দু’টি জ্যাম্বের নিচে ছিল দু’টি পুরুষ মূর্তি। জ্যাম্বের পাশের দেওয়ালও যথেষ্ট অলংকৃত ছিল। সেখানে গঙ্গার ও নবগ্রহের মূর্তি খোদাই তিনি দেখতে পান। এই মন্দিরের গর্ভগৃহে একটি ভগ্ন সূর্যমূর্তি ছিল। দেবলা মিত্র উল্লেখ করেছেন যে, ১৭ নম্বর মন্দিরটি, অন্য পুরনো মন্দিরের মধ্যে তুলানমূলক ভাবে ভাল অবস্থায় ছিল। এই মন্দিরের স্থানীয় নাম নরসিংহথান। কিন্তু মন্দিরের অবস্থা তখন সার্বিকভাবে ভাল ছিল না। মন্দির গাত্রের অলংকরণগুলি উধাও হয়েছিল বা ভগ্নদশায় ছিল। ১৮ নম্বর মন্দির যেটিকে বেগলার প্রথমে বুদ্ধমন্দির বলে উল্লেখ করলেও, মন্দিরগাত্রে একটি মূর্তি দেখে পরে তিনি সেটিকে জৈন মন্দির হওয়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। দেবলা মিত্র এই মূর্তিটিকে লকুলিশ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। উনি বলেছেন যে, লকুলিশের সঙ্গে বুদ্ধমূর্তির অনেক সাদৃশ্য আছে এবং শিবমন্দিরে এরকম ভাস্কর্য থাকা আশ্চর্যের নয়। মন্দিরের ভিতরে অবস্থিত শিবলিঙ্গ, শৈবদের মন্দির প্রমাণ করার জোরালো দাবি রাখে। দেবলা মিত্র এই মন্দিরের পাশে একটি ইটের ঢিপি দেখেছিলেন। বেগলার এই ঢিপিকে বৌদ্ধ মঠের অবশেষ ভেবেছিলেন, কিন্তু দেবলা মিত্র বলেন, এটি এই মন্দিরের কোনও আনুষঙ্গিক সংযোজনের ধ্বংসাবশেষ হলেও হতে পারে। তিনি এটাও মনে করেন যে, এই ত্রিরথ মন্দিরটি ১৭ নম্বর মন্দিরের নির্মাণের পরে নির্মিত হয়। মন্দিরের পাঁচ ফুট উঁচু দরজার কাঠামোটি তিনি বেশ সুসজ্জিত দেখেছিলেন। দরজার দু’টি জ্যাম্বের নিচের কুলুঙ্গিতে দু’টি পুরুষ মূর্তি বিদ্যমান ছিল। দু’টি মূর্তির একটি দণ্ড হাতে সালঙ্কারা পুরুষ, অন্যটি অলংকারে ভূষিত। তার বাম হাতে ত্রিশূল, মাথায় জটা মুকুট এবং ভয়ংকর মুখশ্রী। মন্দিরের ভিতরে তিনি একটি ক্লোরাইটের শিবলিঙ্গ দেখতে পান। মন্দিরের ভিতরের জল নিষ্কাশনের নালিতে মকরমুখের ভাস্কর্য ছিল। আরও পড়ুন… তেলকূপির ইতিহাস ঢাকা পড়ে আছে পাঞ্চেত জলাধারের জলের অতলে [পর্ব ২]

এই সব মন্দির ও ধ্বংসাবশেষ ছাড়া দেবলা মিত্র তেলকূপিতে কয়েকটি স্থানীয় ধর্মীয়স্থানের উল্লেখ করেছিলেন, যেখানে কোনও পুরনো স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ থাকার উল্লেখ ছিল না। ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা পুরাতাত্ত্বিক বস্তুগুলির মধ্যে তিনি উল্লেখ করেছিলেন খেলাইচণ্ডী দেবীর ঘরের মধ্যে অর্ধেক জলে ডুবে থাকা প্রায় আধ ডজন মূর্তি। যেগুলির মধ্যে ছিল পাল যুগের উমা-মহেশ্বর এবং মহিষাসুরমর্দিনীর মূর্তি। তিনি ৯ এবং ১০ নম্বর মন্দিরে বিষ্ণু মূর্তি, অম্বিকা ও অন্ধকাসুর বধ মূর্তিও দেখেছিলেন। তিনি এই সব মূর্তিকে নিরাপদ স্থানে সরাবর চেষ্টাও করেছিলেন, কিন্তু স্থানীয় নৌকার মাঝিরা আপত্তি করায় তা সম্ভব হয়নি। এছাড়া তিনি গুরুডি গ্রামে শিবথান নামক একটি ধর্মীয় স্থান থেকে স্থানান্তরিত একটি বিষ্ণুমূর্তি দেখেছিলেন। গুরুডি গ্রামে ১৯ নম্বর মন্দির থেকে আনা পাথর থেকে একটি মন্দির তৈরি করা হয়েছিল। দেবলা মিত্র সেখানেই বিষ্ণুমূর্তি দেখেছিলেন।
লালপুর গ্রামের শেষে দামোদরের জল প্রান্তে অবস্থিত দেউলটির স্থানীয় ভাষায় নাম দেলগড়া। গুরুডি গ্রামের শেষডাঙায় অবস্থিত মন্দিরটি বেগলার দ্বারা নির্দেশিত ১৮ নম্বর মন্দির। লালপুর গ্রামের অন্যপ্রান্তে ডুবে যাওয়া ভৈরবথানের মন্দিরগুলির মধ্যে একটি মন্দিরের শিখর অংশ দেবলা মিত্র ফেরির সাহায্যে লক্ষ্য করেছিলেন। দেখেছিলেন গুরুডি গ্রামের উল্টোদিকে ঘরবিড়া গ্রামে একটি প্রাচীনতম দেউল আছে, যার স্থানীয় নাম ছিল দেল। গুরুডি গ্রামের শিবমন্দিরে, শিবলিঙ্গ, বিষ্ণু ও জৈন নেমিনাথের মূর্তি ছাড়াও কিছু অ-শনাক্ত মূর্তি ছিল। জামাডি গ্রামে কৃষিজমির আলের উপর উত্থিত কুলগাছের তলায় তিনি দেখেছিলেন হাতির উপর আসীন চতুর্ভুজা মাতৃকা মূর্তি। স্থানীয় মহিলারা সেটিকে মা লিরলা দেবী নামে পূজা করতেন। কাছের দামোদরের অথৈই জলের মধ্যে ছিল দু’টি জীর্ণ দেউল। আর কিছু দূরে মন্দিরের পাশে অযত্নে পড়ে ছিল দেউলের মূর্তি।
এখন মাত্র একটি। এটাই বর্তমানের তেলকূপি। অযত্নে সময়ের গ্রাসে নষ্ট হয়ে যাওয়া অতীতের বন্দরনগর তৈলকম্প-র শেষচিহ্ন। শুধু এই মন্দিরই নয়, স্থানীয় লালপুর, গুরুডি, পাথরবাড়িতে এখনও সাত-আটটি মূর্তি দর্শনীয় রয়েছে। শিল্পকীর্তির সুষমায় ভরা ওই মূর্তিগুলিও ভগ্নদশাপ্রাপ্ত। আরও পড়ুন… তেলকূপির সঙ্গে জড়িয়ে মহাবীর বর্ধমানের নাম, তাঁর নামেই বর্ধমান [পর্ব ৩]

রঘুনাথপুর ২ ব্লকের সদর চেলিয়ামা থেকে কমবেশি সাত-আট কিলোমিটার দূরের এই তেলকূপি এখনও লোক-গবেষকদের চর্চার বিষয়। তৈলকম্প লোকমুখে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানের তেলকূপি হয়েছে। দামোদরের দক্ষিণপাড়ের একদা সমৃদ্ধ এই বন্দর থেকে তাম্রলিপ্ত অধুনা তমলুকের সঙ্গে জলপথে চলত বাণিজ্য। সেই সূত্রে এই বন্দর ঘিরে জৈন ব্যবসায়ীরা গড়ে তুলেছিলেন মন্দিরনগরী। বাংলায় পালযুগে জৈন ধর্ম প্রসার লাভ করেছিল, জৈন ধর্মের প্রসারে ভূমিকা নিয়েছিলেন জৈন ব্যবসায়ীরাই। যারা এই অঞ্চলের দু’টি তামার খনি থেকে তামা তুলে তৈলকম্প বন্দর দিয়ে তাম্রলিপ্তে নিয়ে যেতেন। তেলকূপির সমস্ত মন্দির জৈন ব্যবসায়ীরা তৈরি করেছিলেন কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ তেলকূপি অঞ্চলে পাওয়া মূর্তির বেশিরভাগ হিন্দু দেবদেবীদের মূর্তি। স্বাভাবিকভাবে তাই মনে হয়, এই অঞ্চলে জৈন ও হিন্দু ধর্মের মিশ্র সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল।
ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় মনে করিয়ে দিয়েছেন, তেলকূপির মন্দিরে কোনও লিপিসাক্ষ্য নেই। তাই সময় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু স্থাপত্যরীতি থেকে মনে হয়, এই অঞ্চলে এই ধরনের রেখবর্গীয় মন্দির নির্মাণ শুরু হয়েছিল নবম-দশম শতকে। চলেছিল অন্তত ত্রয়োদশ শতকের শেষপর্যন্ত। কিন্তু বর্তমান অবস্থা শোচনীয়। কারণ দামোদরের উপরে পাঞ্চেত জলাধার তৈরির পরে মন্দিরগুলির বেশিরভাগই চলে গিয়েছে জলাধারের গর্ভে। কোনও ভাবে মাথা উঁচিয়ে ছিল তিনটি দেউল। তার মধ্যে দু’টিকে বছরের প্রায় সব সময়েই সেই সময় দেখা গেলেও এখন গরমকালে দামোদরের জল কমলে একটিমাত্র দেখা যায়। মন্দিরগুলিকে বাঁচিয়ে জলাধার তৈরি হলে হয়তো তেলকূপির ঐতিহ্য হারিয়ে যেত না। আক্ষেপ, সেই সময় টিঁকে থাকা এই তিনটি মন্দির ও মূর্তিগুলি রক্ষণাবেক্ষণের কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। হায় তেলকূপি আজ এক দীর্ঘশ্বাস! (চলবে)

আরও পড়ুন… পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে ডিভিসি জানাল পুরুলিয়ার তেলকূপি জলের তলায় [পর্ব ৪]

আরও পড়ুন… তেলকূপির মন্দির-সমষ্টিতে তিন ধরনের মন্দির দেখেছিলেন বেগলার [পর্ব ৫]

আরও পড়ুন… জঙ্গলের প্রাচীন প্রবাদ: রাজা বিক্রমাদিত্য তেল মাখতে আসতেন তেলকূপিতে [পর্ব ৬]

আরও পড়ুন… খারবেল থেকে সমুদ্রগুপ্ত ৫০০ বছর, তেলকূপির ইতিহাস অন্ধকারের অবগুণ্ঠনে ঢাকা [পর্ব ৭]

আরও পড়ুন… বরাহভূম বা বরাভূম হচ্ছে পুরুলিয়া, তেলকূপি তারই মধ্যে পড়ে… [পর্ব ৮] 

আরও পড়ুন… তেলকূপির শাসক তৈলঙ্গদের শুল্ক দিতেন! এই তৈলঙ্গ কে বা কারা ছিলেন [পর্ব ৯]

আরও পড়ুন… তেলকূপি রাজবংশটি ছিল শরাক জাতি নির্ভর। রাজ্যটি ছোট, কিন্তু স্বাধীন [পর্ব ১০]

আরও পড়ুন… মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাণিজ্যবৃদ্ধির ফলে পাল যুগেই বাংলায় প্রথম ইসলামের আবির্ভাব [তেলকূপি পর্ব ১১]

আরও পড়ুন… বোড়ামের লিপিতে মিলেছে রুদ্রের পুত্রের কথা। পুত্র যুবরাজ, কিন্তু নাম নেই [তেলকূপি পর্ব ১২]

আরও পড়ুন… ১৯৫৮ সালেও দামোদরের গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া তেলকূপির মন্দিরে নিত্যপূজা হত [পর্ব ১৩]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here