telkupi

শিবানন্দ পাল: ১৮৭৭ সালে প্রকাশিত হান্টারের `Statistical Account of Bengal (volume=XVII)’-এ তেলকূপির মন্দিরগুচ্ছের যে সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যায়, তাতে জানা যায়, দামোদরের তীরে তেলকূপিতে আট-ন’টি পাথরের মন্দির ছিল। স্থানীয় লোকেরা সেখানে একটি মন্দিরে পূজা দিতেন। স্থানীয় ভাষায় তার নাম ছিল বিরূপ। হান্টার নিজে সেই মন্দিরের মূর্তি দেখেননি, অনুমান করেছিলেন, সেটি ছিল চব্বিশতম জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীরের মূর্তি।
দেবলা মিত্র এই মূর্তির ব্যাখ্যা করেছেন, বিরূপ মানে ভৈরব, যিনি সেই সময় স্থানীয়ভাবে পূজিত হতেন। দেবলা মিত্র এই মন্দিরকে ভৈরবের মন্দির বলেও উল্লেখ করেছেন। জানা যায়, ১৯৫৮ সালে দামোদরের গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত এই মন্দিরে নিত্যপূজা হত। আরও পড়ুন… তেলকূপি নাকি প্রাচীন তৈলকম্পা রাজ্য, রাজত্ব করতেন শিখর বংশের রাজারা [পর্ব ১]

১৮৯৬ সালে অবিভক্ত বাংলার পূর্ত বিভাগ তৎকালীন বাংলার প্রাচীন সৌধগুলির যে একটি সংকলিত তালিকা প্রকাশ করেছিল, তাতে ৩১ আগস্ট ১৮৯৫ পর্যন্ত আবিষ্কৃত সৌধগুলি সংযোজিত করা হয়েছিল। সেখানে বেগলার বর্ণিত তেলকূপির মন্দিরগুলির শুধুমাত্র প্রথম মন্দিরসমষ্টির ১৩টি মন্দিরের উল্লেখ করা হয়। মন্দিরের গঠনশৈলির বর্ণনায় বলা হয়, এই স্থাপত্য বড় বড় পাথর নিখুঁত আকারে কেটে সূক্ষ্মভাবে জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। এখানে কোনও পেষণী বা হামানদিস্তার সাহায্য নেওয়া হয়নি। পাথরগুলি ঠিকমতো স্থাপনা করার পর সেগুলিকে ভাস্কর্যমণ্ডিত করা হয়েছিল। স্থানে স্থানে বিভিন্ন জায়গার ফাঁকগুলি পাথর দিয়ে ভরাট করা হয়েছিল। যেখানে ফাঁকগুলি একটু বেশি বড়, সেখানে স্থাপত্যকলার বিশেষ করবেলিং পদ্ধতির সাহায্য নেওয়া হয়েছিল। মন্দিরের গোলাকার গম্বুজগুলি এই পদ্ধতিতেই তৈরি করা হয়েছিল। এখানে একটিমাত্র খিলানযুক্ত প্রবেশপথ পাওয়া গিয়েছিল, যা কিনা মন্দিরগুলি পৃথক করবার জন্য পরবর্তীকালে নির্মিত হয়। এই তালিকায় উল্লেখ করা হয় যে, মোগল পরবর্তী যুগের শুরুর দিকে এই মন্দিরগুলি তৈরি হয়। এখানে শৈব আর বৈষ্ণব দুই সম্প্রদায়ের মন্দির ছিল, কারণ এখানে শিবলিঙ্গ, গণেশের মূর্তি ও বিষ্ণুর বিভিন্ন মূর্তি পাওয়া গিয়েছে। এই তালিকার মন্দিরগুলো সম্পর্কে আরও বলা হয় যে, মানভূম জেলাতে তেলকূপির মত একই জায়গায় আর কোথাও বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এতগুলো মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি। পার্শ্ববর্তী দামোদর নদ মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এলাকার দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়েছে, আর একের পর এক মন্দির ভেঙে পড়েছে। বড় বড় পাথরের চাঙর, বিভিন্ন মূর্তির খণ্ড, পাথরের বিভিন্ন কারুকার্য এলোমেলো ভাবে দামোদরের গর্ভে বিলীন হয়েছে, তারপর ক্রমাগত বালির স্তূপ জমে জমে তাদের শেষ প্রামাণিক সাক্ষ্যটুকুও বিলুপ্ত হয়েছে। আরও পড়ুন… তেলকূপির ইতিহাস ঢাকা পড়ে আছে পাঞ্চেত জলাধারের জলের অতলে [পর্ব ২]

বেগলারের পর বেঙ্গল সার্কেলের আর্কিওলজিকাল সার্ভেয়ার টি. ব্লচ তেলকূপি পরিদর্শন করেন ১৯০৩ সালের গোড়ার দিকে। তিনি, বেগলার বর্ণিত ১৩টি মন্দিরের মধ্যে মাত্র ১০টি মন্দির দেখতে পান। এলাকা পরিদর্শন করে তাঁর মনে হয়, এই এলাকা একসময় খুব‌ই গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ছিল। এখানে একসময় ৪০টি মন্দির ছিল। তিনি লিখেছেন, তখনও ১০টি মন্দির রয়েছে এবং সেগুলি প্রায় অক্ষত। তিনি এই মন্দিরসমষ্টির বাইরে অবস্থিত অন্য মন্দিরগুলি নিয়ে মাথা ঘামাননি। লিখেছেন, এখানে দু’টি মন্দির পরবর্তীকালের। অর্থাৎ অনেক আধুনিক এবং সেখানে নিত্যপূজা হয়ে থাকে। এই দু’টি মন্দিরকে ভৈরবনাথ ও মা কালীর মন্দির বলা হয়। অন্য মন্দিরগুলি অনেক কাল ধরে পরিত্যক্ত ও অবহেলিত অবস্থায় ব্লচ দেখতে পান। তাদের মধ্যে দু’টি মন্দিরের সামনে হলঘর নির্মিত ছিল এবং সেখানে কিছু কিছু সূক্ষ্ম কারুকার্য ছিল। সেসময় এগুলি ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় থাকলেও ব্লচ বলেছেন যে, এখানকার ছোট মন্দিরগুলির ভিতরে কেবল একটি করে কুঠুরি ছিল। এছাড়াও তিনি কিছু একশিলা বা মোনোলিথিক মন্দিরও ভগ্নদশায় দেখতে পান। ১৯০৩ সালে ব্লচ উল্লেখ করেছেন, এ সব  মন্দিরে আরাধ্য দেবতা হিসাবে সাধারণত শিবলিঙ্গ থাকে, কিন্তু কিছু মন্দিরে তিনি সূর্যমূর্তি দেখেছিলেন। মন্দিরের চৌকাঠে দেখেছিলেন নবগ্রহের মূর্তি। আরও পড়ুন… তেলকূপির সঙ্গে জড়িয়ে মহাবীর বর্ধমানের নাম, তাঁর নামেই বর্ধমান [পর্ব ৩]

১৯২৯ এর ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে তেলকূপি পরিদর্শন করেন প্রত্নতাত্ত্বিক নির্মলকুমার বসু। তিনিই প্রথম তেলকূপির মন্দিরের সঙ্গে ওড়িশার মন্দিরের স্থাপত্যর তফাৎ ও সাদৃশ্যগুলি লক্ষ্য করেন। প্রবাসী পত্রিকায় (ভাদ্র, ১৩৪০) ‘মানভূম জেলার মন্দির’ শীর্ষক প্রবন্ধে ওড়িশার মন্দিরের স্থাপত্যর সঙ্গে তেলকূপির মন্দিরের পার্থক্য বোঝাতে লেখেন— “দামোদরের কূলে তেলকূপি বলে যে স্থানটির উল্লেখ করা হইয়াছে সেখানে দশ-বারটি বেশ পুরাতন মন্দির আছে। এগুলি উড়িষ্যার রেখ জাতীয় দেউল। ইহাদের বাড় তিন অঙ্গে রচিত, অর্থাৎ তাহাতে কেবল পাভাগ, জাংঘ ও বরণ্ড আছে। সে হিসেবে ইহারা উড়িষ্যার পুরাতন রেখ দেউলের সহিত একগোত্রে পড়ে, কিন্তু ইহাদের গঠন এত হাল্কা ধরণের ও গর্ভের সহিত অনুপাতে ইহাদের উচ্চতা এত বেশি যে উড়িষ্যার বদলে গয়া জেলার কোঞ্চ, দেও প্রভৃতি স্থানের মন্দিরের সঙ্গে এগুলিকে এক গোত্রে ফেলিতে হয়। কিন্তু পরবর্তী মন্দিরগুলির সহিত ইহার তফাৎ হইল অঁলার আকৃতিতে। তেলকূপীর মন্দিরগুলি অঁলা গয়া জেলার মন্দিরের অঁলা অপেক্ষা অনেক চেপটা ও অনেক বড়। তাহাতে তেলকূপীর রেখ দেউলগুলিকে একটি বৈশিষ্ট্য দান করিয়াছে। তেলকূপীর বাড় ও অঁলার সাথে যুক্ত ধ্বজা পুঁতিবার একটি পাথরের খাপেও আমরা উড়িষ্যার সাথে তাহার সম্বন্ধের অভাব দেখি। উড়িষ্যার ত্রি-অঙ্গ-বাড়-যুক্ত-রেখ-দেউলে জাংঘে সচরাচর একটি শিখর বসানো থাকে, কিন্তু তৎপরিবর্তে তেলকূপির জাংঘে কতকগুলি থামের আকৃতি খোদাই করে দেওয়া হইয়াছে।” আরও পড়ুন… পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে ডিভিসি জানাল পুরুলিয়ার তেলকূপি জলের তলায় [পর্ব ৪]

নির্মলকুমার তেলকূপির মন্দিরের সঙ্গে ওড়িশার মন্দিরের স্থাপত্যর বিষয়ে আরও লেখেন— “যাহাই হউক উড়িষ্যার প্রভাব যে তেলকূপিতে একেবারেই পড়ে নাই তাহা বলা চলে না। তেলকূপিতে একটি অপেক্ষাকৃত আধুনিক রেখ দেউল আছে। তাহার সঙ্গে একটি ভদ্র দেউলও সংযোজিত হইয়াছে কিন্তু এই ভদ্র-দেউলের গঠনে শিল্পীরা এমন দু একটি ভুল করিয়াছেন যাহাতে মনে হয় যে তাহারা ভদ্র দেউল গঠনে আনাড়ি ছিলেন। প্রথমত ভদ্রের পিঢ়াগুলি অসম্ভব রকম বড়। দ্বিতীয়ত তাহাদের গন্ডির উপর ঘণ্টা না বসাইয়া সোজাসুজি একটি রেখ-মস্তক বসাইয়া দেওয়া হইয়াছে। তৃতীয়ত রেখ-দেউলটির তলজাংঘে বিরাল ও উপর জাংঘে বন্ধকাম না দিয়া শিল্পীরা তলজাংঘেই দুটিকে গুঁজিয়া দিয়াছেন। সেখানেও আবার বিরাল উপরে ও বন্ধকাম নিচে রাখা হইয়াছে। এগুলি শিল্পাচার বিরুদ্ধ, অতএব উড়িষ্যার শিল্পে অনভিজ্ঞ লোকের তৈয়ারি বলিয়া ধরা যাইতে পারে। অথচ উড়িষ্যার সহিত তেলকূপির যে সম্বন্ধ ছিল তাহা বিরাল প্রভৃতি মূর্তির অস্তিত্বই প্রমাণ করিয়া দিতেছে।” (চলবে)

আরও পড়ুন… তেলকূপির মন্দির-সমষ্টিতে তিন ধরনের মন্দির দেখেছিলেন বেগলার [পর্ব ৫]

আরও পড়ুন… জঙ্গলের প্রাচীন প্রবাদ: রাজা বিক্রমাদিত্য তেল মাখতে আসতেন তেলকূপিতে [পর্ব ৬]

আরও পড়ুন… খারবেল থেকে সমুদ্রগুপ্ত ৫০০ বছর, তেলকূপির ইতিহাস অন্ধকারের অবগুণ্ঠনে ঢাকা [পর্ব ৭]

আরও পড়ুন… বরাহভূম বা বরাভূম হচ্ছে পুরুলিয়া, তেলকূপি তারই মধ্যে পড়ে… [পর্ব ৮] 

আরও পড়ুন… তেলকূপির শাসক তৈলঙ্গদের শুল্ক দিতেন! এই তৈলঙ্গ কে বা কারা ছিলেন [পর্ব ৯]

আরও পড়ুন… তেলকূপি রাজবংশটি ছিল শরাক জাতি নির্ভর। রাজ্যটি ছোট, কিন্তু স্বাধীন [পর্ব ১০]

আরও পড়ুন… মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাণিজ্যবৃদ্ধির ফলে পাল যুগেই বাংলায় প্রথম ইসলামের আবির্ভাব [তেলকূপি পর্ব ১১]

আরও পড়ুন… বোড়ামের লিপিতে মিলেছে রুদ্রের পুত্রের কথা। পুত্র যুবরাজ, কিন্তু নাম নেই [তেলকূপি পর্ব ১২]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here