majar

সৌম্য সাহিন: বিগত কয়েক বছর ধরে মুর্শিদাবাদ-বীরভূম জেলার বিভিন্ন জায়গায় বাংলার বাউল-ফকিরদের ওপর নেমে আসছে ধর্মীয় মৌলবাদীদের আক্রমণ। সম্প্রতি বাউল ফকির সঙ্ঘের তরফে একটি লিফলেট প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে তারা জানিয়েছেন, ‘ধর্মীয় মৌলবাদীদের অত্যাচারে পশ্চিমবঙ্গের বাউল ফকিররা আজ বিপন্ন। ধর্মনিরপেক্ষ এদেশে বাউল-ফকিরেরা তাদের ধর্মপালনের স্বাধীনতা চায়। গান করার অধিকার চায়।’ আবেদনপত্রে সঙ্ঘের পক্ষে সই করেছেন সম্পাদক আকবর আলি সেখ।

majarবাউল ফকির সঙ্ঘের সভাপতি তথা বিশিষ্ট লোকগবেষক ড. শক্তিনাথ ঝা জানাচ্ছেন, ‘‘মুর্শিদাবাদ জেলার মুর্শিদাবাদ থানার ডাঙাপাড়া গ্রামপঞ্চায়েতের অন্তর্গত হুলাসপুর গ্রামে দ্বিশতাধিক বছরের এক পিরস্থান, ‘বদর সাহেবের মাজার’ নামে যা পরিচিত। ১৯৫৬ সালের রেকর্ড মোতাবেক হুলাসপুর গ্রামের মহম্মদ আশিক আহমেদের পরিবার এটি দান করেছিল। এখানে বিঘা চারেক জমি আছে। হিন্দু-মুসলমান সকলে এখানে মানত করেন। বছরে একবার মেলা হয়। মাজারের কাছেই থাকেন, রহিমসা এটি দেখাশোনা করেন। কিন্তু (সেই জমি) দখল করে আজ পর্যন্ত কেউ চাষাবাদ বা অন্য কিছু করেনি। স্থানীয় জমি মাফিয়াদের নজর পড়ে এই মাজারের ওপর। সাম্প্রদায়িক মিলনের এই মাজারটিকে ঈদগাতে বদলে দিতে তোড়জোড় শুরু করেন উম্মর শেখ (পিতা-সামেদ শেখ), রহিম বক্স (পিতা-রব্বানি শেখ), তাজেম আলি শেখ (পিতা-পঞ্জু শেখ) প্রমুখ। এরা সকলেই শাসকদলের সমর্থক। গত ২৫ জুলাই তারা মাজার ভেঙে ছোট ঘর তৈরি করা শুরু করলে স্থানীয় হিন্দু এবং মুসলমানরা তাদের মিনতি করে বলেন, ‘মাজার নষ্ট কোরো না’। মাজারের অধিকারী মহম্মদ আশিক আহমেদ কোর্টে যান, ১৪৪ ধারা জারি হয়, থানায় জানানো হয়। থানা থেকে অফিসার আসেন এবং ঈদগা নির্মাণে আপত্তি জানিয়ে যান। কিন্তু এসবে কর্ণপাত না করে মাজারে একটি গেট ও ছোট ঘর নির্মাণ করে গত ১২ আগস্ট সেখানে ঈদের নামাজ পড়া হয়। থানায় বারংবার এই ঘটনা জানানো হয়, কিন্তু থানা আসে না বা কোনও ব্যবস্থা নেয় না। পরে ২০ আগস্ট বাউল ফকির সঙ্ঘের আবেদনে থানা থেকে আসেন, কিন্তু কোনও আইনি পদক্ষেপ নেন না।’’

majarড. শক্তিনাথ ঝার মতে, ‘‘ইসলামি মৌলবাদীরা পশ্চিমবঙ্গের নানা স্থানে প্রাচীন মাজার, দরগা, নজরগা দখল করে ঈদের নামাজ পড়ছে। নদিয়া জেলায় মায়াপুরের সন্নিকটে সোনাডাঙায় মানিক পিরের মাজারে মহরমের মেলা হত, উৎসব হত, আয়োজন করতেন হিন্দু-মুসলমানরা। নদিয়ার কালীগঞ্জ থানার ঘোঁড়াইক্ষেত্রতে ছিল প্রাচীন একটি মাজার, শেখ ফরিদের। সম্প্রতি জোর করে শাসকদলের প্রচ্ছন্ন মদতে এগুলি দখল করে কোথাও কবরখানা কোথাও ঈদগা করা হয়েছে। যেসব মাজার গ্রামের বা এলাকার হিন্দু-মুসলমানের সমন্বয় ও মিলনের ক্ষেত্র ছিল, সেগুলি সুপরিকল্পিতভাবে ‘মুসলমানি’ রূপ দিয়ে সাম্প্রদায়িক বিভেদকে প্রসারিত করা হচ্ছে। শাসকদলের একাংশ কথিত সংখ্যালঘু ভোটের বাধ্যবাধকতায় তাদেরই সাধারণ মানুষের কথা তোয়াক্কা না করে শরিয়তি ইসলামকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। আসলে, মৌলবাদ হিন্দু ও ইসলামি বেশে, জনগণকে বিচ্ছিন্ন করে বাংলার পুণ্যভূমির দখল নিচ্ছে। দুই মৌলবাদ পরস্পরকে শক্তিশালী করছে। মৌলবাদ-বিরোধী মানুষদের (কাছে) উক্ত জায়গাগুলিতে তথ্যানুসন্ধানে আসুন, আবেদন রাখছি। উল্লাসপুরে বাউল ফকির সঙ্ঘ ব্যাপকভাবে হিন্দু-মুসলমানের কাছে মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছে। ধর্ম সমন্বয়ের পুণ্যভূমিকে কলুষিত করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। মুর্শিদাবাদের সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলিকে আমরা বিষয়টি জানিয়েছি।’’

majarজানা গিয়েছে, লালন অনুগামী বাউল-ফকিরদের এই দলে গ্রামের তিনজন মানুষ যুক্ত। অভিযোগ, তাদেরকে শরিয়তিরা একঘরে করে রেখেছেন। কলকাতা থেকে লাবণী জঙ্গি ও শুভপ্রতিম নামে দুই ব্যক্তির নেতৃত্বে কিছু মানুষ ঘটনাস্থলে যান এবং ছবি তুলে আনেন। এই কাজ করতে গিয়ে তাঁদেরও হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই, বিষয়টা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার উদ্দেশ্যে বিজেপি সহযোগিতা করতে চাইলেও তাদের সাম্প্রদায়িক মনোভাবের জন্য লালন ফকির সঙ্ঘ সেই প্রস্তাব সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রখ্যাত লোকগীতি সংগ্রাহক-গায়ক-গীতিকার শুভেন্দু মাইতির মতে, ‘বাউলরা হিন্দু বা মুসলিম উভয় মৌলবাদেরই বিরুদ্ধে, বেদ বা শরিয়ত– কোনওটাই তারা মানেন না, কাজেই এই অস্থির সময়ে তাদের ওপর আক্রমণ হওয়া স্বাভাবিক। বাংলার বহুত্ববাদী পরিবেশের বিরুদ্ধে এই আগ্রাসনের প্রতিরোধ করা আমাদের মানবিক কর্তব্য।’

গ্রামীণ বাংলার সমাজ-সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে বাউল-ফকিরের একতারার সুর এবং উদার সামাজিক মতাদর্শ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। সুফিবাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে গত কয়েকশো বছর ধরে বুকে করে বয়ে আনছেন গ্রামবাংলার মুসলিমরা। আজও আমরা দেখি, পির দরগা মাজারে শুধুমাত্র মুসলমান নয়, সব ধর্মের মানুষ এসে ভিড় করেন। সাম্প্রদায়িক হানাহানি, ধর্মীয় বিদ্বেষের যুগে এ এক অনন্য ভাল লাগার চিত্র। কিন্তু অভিযোগ, এই সব কিছুকেই ‘বেহুদা’ বলে আখ্যা দিতে শুরু করেছে তবলিগ জামাতিরা। সাম্প্রতিক কালে দেশজুড়ে মানুষের ব্যক্তিগত ধর্মাচারণে, খাদ্যাভ্যাসে, শিল্পীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ দেখা গিয়েছে। তার পিছনে প্রধানত কট্টর হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলোর হাত রয়েছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন প্রগতিশীল শিল্পী-সাহিত্যিক-অধ্যাপক সহ নাগরিক সমাজের মানুষেরা। ইসলামিক মৌলবাদের ক্ষেত্রেও সেই একই মনোভাব নেওয়া প্রয়োজন। নইলে বাংলা তথা ভারতবর্ষের লোকায়ত সংস্কৃতিকে রক্ষা করা যাবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here