‘দইয়ের মাথা ঘোলের শেষ; কচি পাঁঠা বৃদ্ধ মেষ’, পেটুকঠাকুর বাঙালি

0
99
bengali food

বল্লাল সেন: বাঙালি শুধুমাত্র খাদ্যরসিক নয়। তার মধ্যে খাদ্য-রাজনীতিও কাজ করেছে। খাদ্য-রাজনীতি অবশ্যই ঘটি থেকে বাঙাল হয়ে নিম্ন দক্ষিণ বাংলায় বিস্তৃত। মানুষের তৈরি দুর্ভিক্ষ ও তার পরবর্তীকালে খাদ্য আন্দোলনের বাম রাজনীতিও আমাদের অজ্ঞাত নয়। খাদ্য, খাবার বা আহার নিয়ে ঘরের মধ্যে রাজনীতিও কম হয় না। কেউ খাবে না শোল মাছের টক– তাকে খাওয়ানো হবেই– কেউ খাবে না শুঁটকি বা লোইট্যা (লোটে) কিংবা আড় অথবা ঢাই মাছ– কী করে মজা করে তাকে খাওয়ানো যায়। কাঁচাকলা, ওল বা কচু অথবা ঢেঁড়শের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। এ সব রাজনীতি সামলেও বাঙালি নিজের মধ্যে ভাগাভাগি করে টিকিয়ে রাখছে নিজের মতো আহার সম্বন্ধে বিস্তর লোভের বিলাসিতা।

‘দইয়ের মাথা ঘোলের শেষ/ কচি পাঁঠা বৃদ্ধ মেষ’, ‘খালিপেটে জল, ভরাপেটে ফল/ পেটে-মাথায় তেল, মাঝেমাঝে বেল’। ঔপন্যাসিক রামকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘ধনপতির সিংহলযাত্রা’য় এক আহারের তালিকা দিয়েছেন নিম্ন দক্ষিণবঙ্গের। ‘শুকুতার বড়ি হবে কুলত্থ কিংবা মাষকলাইয়ের। নাটটা শাকের ফুলবড়ি। কাতলার মীন মরিচ ঝোলে চনকের বড়ি। বাঙালির রান্না মানে শুধু ডাব-চিংড়ি বা ভেটকি পাতুড়ি নয়।’
‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’-এ (প্রাকৃত পৈঙ্গল প্রাকৃত ছন্দের একটি গ্রন্থ। অনুমান করা যায়, ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি এটা লেখা হয়। এখানে যে ছন্দের শ্লোকটি ব্যবহার করা হয়েছে, তার বয়স একশো বছর ধরে নিলে এই বইটি আরও সাতশো বছর আগেকার।) এক নাম না-জানা কবি করেছেন বাঙালির এক সুষম খাদ্যের উল্লেখ। ‘ওগগর ভক্তা রম্ভঅ পত্তা গাইক ঘিত্তা দুগ্ধসজুত্তা/ মোইলি মচ্ছা নালিচ গচ্ছা দিজুই কন্তা খাই পুনবন্তা।।’ অর্থাৎ কলার পাতায় ঢালা ফেনসহ গরমভাত, কিছু গাওয়া ঘি, গরম দুধ, মৌরলা মাছ, নালিতা শাক (পাটশাক) স্ত্রী পরিবেশন করছে, পুণ্যবান খাচ্ছে।

বাঙালি তার অপ্রধান খাদ্যকে খাবার বা জলখাবার কিংবা জলযোগ বলে থাকে। আবার অনেক সময় ফলারও বলে। সংস্কৃত কলেজের পণ্ডিত রামনারায়ণ তর্করত্নকে ‘নাটুকে রামায়ণ’ বলা হত। তিনি রাঢ়দেশীয় বৈদিক ব্রাহ্মণদের আহার ও ফলারের উত্তম/ মধ্যম/ অধম স্তর কী হতে পারে কবিতায় বলেছেন।

উত্তম ফলার
ঘিয়ে ভাজা তপ্ত লুচি দু’চারি আদার কুচি
কচুরি তাহাতে খান দুই।
ছক্কা আর শাকভাজা মতিচুর বোঁদে
ফলারের জোগাড় বড়ই।
নিখুঁতি জিলিপি গজা ছানাবড়া বড় মজা
শুনে সকসক করে নোলা।
হরেক রকম মণ্ডা যদি দেয় গণ্ডা গণ্ডা
যত খাই তত হয় তোলা।।
খুরি ভরি ক্ষীর তায় চাহিলে অধিক পায়
কাতারি কাটিয়া শুকো দই।
অনন্তর বাম হাতে দক্ষিণা পানের সাথে
উত্তম ফলার তাকে কই।

মধ্যম ফলার
সরু চিঁড়ে শুকনো দই মর্তমান ফাঁকা খই
খাসা মণ্ডা পাত পোরা হয়।
মধ্যম ফলার তবে বৈদিক ব্রাহ্মণ কবে
দক্ষিণা তাই হাতেও রয়।

অধম ফলার
চিঁড়ে জেলো দই তিতো গুড় ধেনো খই
পেটে ভরা যদি নাহি হয়।
রোদ্দুরে মাথা ফেটে হাত দিয়ে পাত চাটে
অধম ফলার তারে কয়।

এখানে অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলতে হচ্ছে, আর্যদের অতিপ্রিয় পানীয় সোমরসকে দই ও বিভিন্ন মশলার সঙ্গে মুখোরোচক করা হত। পরবর্তীকালে বাঙালি বড়লোকের বাড়ি যে সব খাদ্যদ্রব্য দেওয়া হত, সে সব খেতে বহুক্ষণ সময় লাগত। মজার কথা, সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে পর্যটক ও পাদ্রি সেবাস্তিন মানরিক (১৫৯০-১৬৬৯) সেই সময় গৌড় বাংলার এক মুসলমান বাড়িতে নিমন্ত্রণ পান। সেখানে তার জন্য যে বিবিধ আহারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, সে সব খেতে তার তিন ঘণ্টা লেগেছিল।

বাঙালির রসের আহার ভীষণভাবে নির্ভর করে তার ভাঁড়ারঘর আর গৃহিণীর ওপর। কিন্তু গৃহিণীর ভাল লাগা বা কর্তার অতি ভাল লাগা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নয় বাঙালি খাদ্যরসিকের দলবল। কারণ রসুই কোনও সময় মাতৃচালিত বা পত্নীচালিত অথবা স্বচালিত। মাঝেমাঝে রান্না ভাল না লাগলে বাঙালি কর্তা মাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘লাউ করে কাঁউ কাঁউ– কে রেঁধেছে?’ মা বলে, ‘বউ রেঁধেছে।’ শুনে কর্তার হাতের ভঙ্গি ও কথা বলার তোড় পাল্টে গিয়ে বেশ উগ্রভাবেই বলে, ‘তাই তো শালার লাউ সেদ্ধ হয়েছে।’

মঙ্গলকাব্যগুলোর মধ্যে কবিকঙ্কন চণ্ডীতে (রচনাকাল আনুমানিক ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে) নিরামিষ খাদ্যের এক তালিকা পাওয়া যায়। এই তালিকা থেকে বাঙালির ধারাবাহিক রসনাতৃপ্তির কথাও পাওয়া যায়। ‘নিম, সিম ও বেগুনের তেতো, কুমড়ো ও বেগুনের শুক্তো, বেসমের সঙ্গে সরষের শাক, ঘৃতে কড়া করে ফুলবড়ি ভাজা, টাবা লেবুর রস দিয়ে মুসুর ডাল, নোটে শাক ও কাঁঠাল দানা ঘিয়ে সাঁতলিয়ে আদার রস দিয়ে তরকারি।’

বাঙালির লৌকিক ছড়া থেকে আধুনিক কবিতা, গল্প, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধে আহার সম্বন্ধে লেখালেখির ছড়াছড়ি। আবার প্রাচীন, মধ্যপ্রচীন, মধ্য ও বর্তমান যুগের আহার-বিন্যাসও দেখার মতো। এবার একটু আমিষ আহারে আসা যাক। চল্লিশটা কই মাছ ভেজে নিয়ে মরিচ গুঁড়ো ও আদার রস মিলিয়ে ঝাল, চিতলমাছের পেটি ভাজা, বড়ি ও মরিচ গুঁড়ো দিয়ে রুইমাছের ঝোল, চিংড়ির বড়া, তেঁতুলের রস মিশিয়ে পাঁকাল মাছের অম্বল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ইন্দিরা উপন্যাসে ডাকাতের হাতে ভাগ্যক্রমে বাঁচা কলকাতা শহরের মেয়ে ইন্দিরা, সুভাষিনীদের যৌথ পরিবারের রান্নার কাজে বহাল হল। রান্নার পর সবাইকে খাইয়ে সেকালের গৃহিণীর কিছু খাওয়া জুটত কি না সন্দেহ আছে। রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি উপন্যাসে বিহারী, মহেন্দ্র, আশালতা ও বিনোদিনী, এই চার চরিত্রকে নিয়ে যে প্রণয়নাটক জমে উঠেছিল– সেই নাটকের প্রথম উপসর্গ এই আহার।

বর্তমানে বেশিরভাগ বাঙালি তাদের বাইরে থাকা এক কন্যা বা পুত্রের বিদেশ থেকে বাড়ি ফেরার পর, বাঙালি মায়ের স্নেহ সম্পূর্ণভাবে মোড় নেয় কন্যা বা পুত্রের ওপর বিভিন্ন আহারের দাপটে। বৈষ্ণব রসশাস্ত্রে রয়েছে, ঘৃত স্নেহ ও মধু স্নেহ বলে দু’রকমের কথা। ঘৃত স্নেহ অপেক্ষা মধু স্নেহ বেশি উত্তম। কারণ, ঘি অপেক্ষা মধু বেশি মোলায়ম। ঘিয়ে দেখা যায় সামান্য দানা– যে দানা মধুতে নেই। রসতত্ত্বে যে সমীকরণ স্নেহ ও আহারের মধ্যে উঠুক না কেন বাস্তব বলছে স্নেহ নিম্নগামী। আহারের সঙ্গে স্নেহকে মিলিয়ে বাঙালি তার মনকে দুর্বল করছে? যাই হোক, তবু বাঙালির রসচর্চায়, রসধারায়. রসবোধে, রসখাদ্যে তাকে ডুবিয়ে দিতে বলেছে– ‘ডুব ডুব ডুব ডুবসাগরে আমার মন।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here