গোটা দেশকে মুসলমান এবং অমুসলমানে ভাগ করে দেবে সিএবি

0
BJP

বাসব রায়: দেশটাকে কী সুন্দর বানিয়ে ফেলল বিজেপি!
গুয়াহাটিতে থাকি, স্থানীয় সব নিউজ চ্যানেলে সিএবি নিয়ে আলোচনা, তর্কবিতর্ক। উত্তর-পূর্ব ভারতের অনেক দল বিলের বিরোধিতা করছে; কেন না তাদের ভয়, বিলের সৌজন্যে হিন্দু বাঙালিরা এই অঞ্চলে সংখ্যাগুরু হয়ে যাবে। আর বিজেপি নেতারা বারবার তাদের আশ্বস্ত করছেন, ‘আপনাদের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।’ মজার ব্যাপার হল, কোনও দলই বলছে না যে বিল অসাংবিধানিক। এটা ভয়ংকর এবং ভয়াবহ বিল। গোটা দেশকে মুসলমান এবং অমুসলমানে ভাগ করে দেবে সিএবি। এই বিল সংবিধানের ১৪ ও ২১নং ধারার পরিপন্থী।

অথচ অসমের দুটো কাগজকল নিলামে চড়ছে। প্রায় কেউই প্রতিবাদ করছেন না। শিলচরের প্রাক্তন সাংসদ সুস্মিতা দেব তবু একটু প্রতিবাদী কথাবার্তা বলেছেন। ওই দুটো কাগজকল বন্ধ হয়ে গেলে বিপদে পড়বেন কয়েক লক্ষ পরিবার (অনুসারী শিল্পের কর্মী সহ)। অসম সরকার আসন্ন ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ডের জন্য ২৩ নাকি ৩০ কোটি টাকা ব্যয় করবে শুনছি, কাগজকলের কর্মীদের মাইনে দিতে দরকার ৯২ লক্ষ টাকা। বাস্তব এরকমই।

আবার দেখুন, হায়দরাবাদের অদূরে শামশাবাদের কাছে প্রিয়াঙ্কা রেড্ডিকে ধর্ষণ করে পুড়িয়ে দিয়েছে যে চারজন, তাদের নাম জুল্লু নবীন, মহম্মদ আরিফ, জল্লু শিবা ও চিন্তাকুনটা চেন্নাকেশাভুলু। কিন্তু বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্য সহ অনেকেই শুধু মহম্মদ আরিফের নামটা বলছেন। কেন? না, সে মুসলমান। বাকিরা তো অমুসলমান। তারা তো কোনও দোষই করতে পারে না! অন্তত বিজেপির দৃষ্টিতে। ফেসবুকে বহু মানুষের প্রতিবাদের পর নতুন তত্ত্ব আনা হয়েছে যে, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত শামশাবাদেই এই অত্যাচার হয়েছে। মুসলমান-বিরোধ লুকিয়ে আছে ‘সংখ্যালঘু অধ্যুষিত’ শব্দগুচ্ছের আড়ালে।

প্রিয়াঙ্কা রেড্ডির ওপর অমানবিক অত্যাচার ফের নির্ভয়াকে মনে করিয়ে দিয়েছে। আর সেই সূত্রে নামী ব্যক্তিদের একটা ছোট তালিকা মনে পড়ছে, আজ, খুব। (ধর্ষণে অভিযুক্ত বিজেপি নেতাদের তালিকাতে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। এম জে আকবর, কুলদীপ সেঙ্গার, বিজয় জলি, চিন্ময়ানন্দ, সাক্ষী মহারাজ, রাঘবজি, উমেশ আগরওয়াল, জয়েশ প্যাটেল, শান্তিলাল সোলাঙ্কি, রবীন্দ্র বাওয়ানটাড়ে, ডি এন জীবরাজ, কৃষ্ণমূর্তি, এইচ এস রাওয়াত, অশোক তানেজা, নিহাল চন্দ, এইচ হলপ্পা, হামিদ সদর, গোবিন্দ পারুমালানি, অশোক মাকওয়ানা এবং আরও অনেকে। অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস, সংক্ষেপে এডিআর-এর রিপোর্ট অনুসারে, অন্য রাজনৈতিক দলের চেয়ে ধর্ষণে অভিযুক্ত বিজেপির বিধায়ক এবং এমপিদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি!)

গত দু’দিন ধরে ফেসবুকে ওই নারকীয় ঘটনা সম্পর্কিত পোস্ট সবচেয়ে বেশি দেখেছি। এ ছাড়া রয়েছে এনআরসি-বিরোধী পোস্ট। অথচ মাত্র গতকালের খবর হল যে, দেশে বৃদ্ধির হার নেমে এসেছে ৪.৫ শতাংশে। বস্তুত টানা ছয়টি ত্রৈমাসিকে বৃদ্ধির হার ৮.০ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ৪.৫ শতাংশে। এবং সংগঠিত ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার যদি হয় ৬-৭ শতাংশ, তা হলে অসংগঠিত ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার শূন্যের নিচে। কেন না নোটবন্দি ও অপরিকল্পিত জিএসটি চালুর পর ভারতীয় অর্থনীতি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। রাহুল বাজাজের মতো শিল্পপতি বলছেন, ইউপিএ সরকারের আমলে যে কারও বিরুদ্ধে সমালোচনা করা যেত। আপনাদের বিরুদ্ধে লোকে ভয় পায়।

দু’দিন আগে কর্ণাটকের দুই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া ও কুমারস্বামীর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের মামলা হয়েছে। কী তাঁদের অপরাধ? তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর চেষ্টা করছিলেন বলে অভিযোগ পুলিশের। ঘটনা হল, লোকসভা নির্বাচনের আগে বেছে বেছে বিরোধী নেতাদের নিশানা করা হচ্ছে, তাঁদের বাড়ি ও দফতরে আয়কর হানা চালানো হচ্ছে অভিযোগ করে গত মার্চ মাসে বেঙ্গালুরুতে আয়কর দফতরের বাইরে বিক্ষোভ দেখান কর্ণাটকের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এইচ ডি কুমারস্বামী সহ কংগ্রেস ও জেডিএস নেতারা। সেটাই নাকি দেশদ্রোহ, কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর চেষ্টা!

গত মাসে তিনদিন লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলনে পশ্চিমবঙ্গের তারকেশ্বরে ছিলাম। বলা বাহুল্য তিনরাত্রি ঘুমোইনি। আড্ডা আর আড্ডা। তো যাবতীয় কথাবার্তা ওই হিন্দু-মুসলমান, বাংলা পক্ষ, গুটকাখোর, এনআরসি… ব্যস।
কিন্তু এসব নিয়ে কারো মুখে রা নেই। যত কথা ওই গরু-মুসলমান-এনআরসি-সিএবি-মব লিঞ্চিং নিয়ে। আমরা সত্যিই সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতি সচেতন তো!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here