shushunia

শিবানন্দ পাল: ইতিহাসবিদ ড. অতুল সুরের মতে, বাঁকুড়া জেলার শুশুনিয়া পাহাড়ে শিবিরাজপুত্র বেসসন্তর আশ্রম ছিল। বৌদ্ধজাতকে শিবিদেশের রাজপুত্র বেসসন্তরের কথা পেয়েছি। খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দে হিমালয়ের তরাই অঞ্চলে প্রবাহিত রোহিণী নদীর দুই তীরে শাক্য ও কৌলীয় রাজ্যের অবস্থান ছিল। রোহিণী নদী দুই রাজ্যকেই সমৃদ্ধ করেছিল। কিন্তু এখন যেমন নদীর জল নিয়ে দুই দেশ বা দুই রাজ্যের মধ্যে চরম বিরোধ দেখা যায়, তখনও তেমনই বিরোধ ছিল। এই বিবাদের মীমাংসা করতে চেয়েছিলেন গৌতমবুদ্ধ। কারণ শাক্যরাজা শুদ্ধোধন ছিলেন তাঁর পিতা, অন্যদিকে কৌলীয়রাজ পাণ্ডুশাক্য ছিলেন তাঁর খুল্লতাত অমৃতোদনশাক্যর পুত্র। এছাড়া নদীর একদিকে ছিল বুদ্ধের অন্যতম প্রিয়শিষ্য আনন্দের পিতৃবংশ এবং অপরদিকে মাতৃবংশ। শাক্যবংশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সংবাদে বিষন্ন বুদ্ধদেব শাক্যদের ধংসের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানতে পারেন, রোহিণী নদীতে বিষ দেওয়া হয়েছিল। আর এই বিষ ঢেলেছিলেন রাজা বিড়ঢ়ভ। এই সব গল্প পড়তে পড়তে মনে হয় সেকালেও বুঝি আজকের তালিবানদের মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সন্ত্রাসবাদীদের অস্তিত্ব ছিল! রোহিণী নদীতে বিষ দেওয়ার কারণে পাণ্ডুশাক্যকে কপিলাবস্তু ত্যাগ করে পালিয়ে আসতে হয়। পাণ্ডুশাক্য এদেশে রাঢ়দেশের পাহাড়-জঙ্গলে আত্মগোপন করেন। ঐতিহাসিকদের কারও কারও অনুমান, পাণ্ডুশাক্য পরবর্তীকালে গঙ্গার তীরে হুগলির পাণ্ডুয়া-তে রাজধানী স্থাপন করে পাণ্ডু রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনিই শুশুনিয়া গিরিশীর্ষে অবস্থিত বেসসন্তরের আশ্রমকে কোকনদ প্রাসাদে রূপান্তরিত করেন। (পড়ুন অষ্টম পর্ব)

রোহিণী নদীর বর্তমান অবস্থান উত্তর-ভারতের দিল্লি সংলগ্ন অঞ্চল। নদী এখন নালায় পরিণত হয়েছে। তবু বর্তমানে তার নাম হয়েছে ‘কোহন নদী’। বিষপ্রয়োগের সেই ঘটনার ঐতিহ্য ধরে সে নদী বর্তমানে ‘খুনে নদী’ নামে পরিচিত হয়েছে। আধুনিকমনস্ক মানুষ এখনও এই নদীকে ভয় পান, নামতে চান না। অবশ্য নদীর জল বর্তমানে স্পর্শেরও অযোগ্য, নামার প্রশ্নই নেই। আড়াই হাজার বছর পূর্বের মানুষ বুদ্ধদেব। শুশুনিয়ার অবস্থান যেখানে, সেই বাঁকুড়া জেলায় প্রাগৈতিহাসিক যুগের প্রাচীনতম মানব বসতির নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ সময়ে দ্বারকেশ্বর নদের উত্তর তীরে বসতি স্থাপন করেছিল ক্যালকোলিথিক মানবগোষ্ঠী, ব্রোঞ্জ যুগের মানুষ। প্রাগৈতিহাসিক যুগের শেষভাগে বিভিন্ন প্রোটো-অস্ট্রালয়েড ও কয়েকটি প্রোটো-দ্রাবিড় উপজাতিও এখানে বসতি স্থাপন করে। এই সব উপজাতির মানুষ এখানে খাদ্যসংগ্রহ, শিকার, পশুপালন ও চাষবাস করত। হয়তো একারণেই গঙ্গামৃত্তিকার দেশের মানুষের সঙ্গে বাঁকুড়া পুরুলিয়ার মানুষের আকৃতি ও প্রকৃতিগত কিছু পার্থক্য এখনও চোখে পড়ে। মনে করা হয়, রাঢ় অঞ্চলের অন্তর্গত বাঁকুড়া জেলার এই অংশে প্রাচীনকালে বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আদিবাসী জনজাতির সংখ্যা বেশি ছিল। প্রধানত দু’টি প্রধান জাতিগোষ্ঠীর এখানে বসবাস ছিল-– একদল ছিল নিষাদ (প্রোটো-অস্ট্রালয়েড উপজাতি) আর একদল ছিল দ্রাবিড় জাতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত দাস-দস্যু। উপগোষ্ঠীগুলির অন্তর্গত ছিল এখনকার বাগদি, বাউড়ি, জেলে, হাড়ি, ডোম ও অন্যান্য পিছিয়ে থাকা শ্রমজীবীর দল। আর্যগোষ্ঠীর মানুষ এই উভয় সম্প্রদায়ের মানুষকে অসুর, দস্যু, অনার্য, অসভ্য অভিধায় ভূষিত করেছে। প্রোটো-ইন্দো-আর্য গোষ্ঠীর মানুষেরা যারা উত্তর-ভারত থেকে বাংলায় এসেছিল, এই অঞ্চলের আর্যীকরণ করে। এখানকার সাঁওতাল ও মাল পাহাড়িয়া সম্প্রদায়ের মানুষগুলোর খাদ্য, পোশাকপরিচ্ছদ, ধর্ম, আচরণ ও অন্যান্য বিষয়ে বিভিন্ন উপজাতিগুলির মধ্যে পার্থক্য ছিল এবং এমনকী এদের পরস্পরের মধ্যে স্বজাতির বাইরে বিবাহসম্পর্ক স্থাপন তো দূরের কথা, মেলামেশা ছিল না। প্রোটো-ইন্দো-আর্যরা আসার পর ধীরে ধীরে আর্যীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ঐতিহাসিকেরা বলেছেন, প্রথমদিকে গুণ ও কর্মের বিভাগ অনুযায়ী আর্যীকরণ শুরু হয়। এর ফলে বর্ণভিত্তিক সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠতে শুরু করে। নতুন সমাজব্যবস্থা গড়ে ওঠার পাশাপাশি এই অঞ্চলের পুরনো সমাজব্যবস্থারও কিছু কিছু অবদান থেকে যায়। আবার অনেকের বক্তব্য, এই আর্যীকরণ সহজে হয়নি। কয়েক শতাব্দী ধরে সংঘর্ষ ও সহযোগিতা উভয় পরিবেশেই ধীরে ধীরে নতুন সংস্কৃতিতে সম্পাদিত হয়েছে।

প্রাচীন জৈন গ্রন্থ আচারঙ্গ সূত্রে (আনুমানিক খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দী) সুহ্ম ও লাঢ়া (রাঢ়?) অঞ্চলের উল্লেখ রয়েছে। উক্ত সূত্রে এই অঞ্চল দু’টিকে বর্বর জাতি অধ্যুষিত বলা হয়েছে। আবার ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দী) এই অঞ্চলের অধিবাসীদের অসুর নামে অভিহিত করা হয়েছে। আজও বাঁকুড়া জেলার অনেক অংশে বহু গ্রামের নাম অসুর বা আশুরিয়া নামের সঙ্গে যুক্ত। আশুরিয়া স্থাননাম‌ও আছে। কিন্তু এই অসুররাই তো মহাবীর বর্ধমানকে দিগম্বর হিসেবে অপছন্দ করেছিল। তা হলে কারা বেশি সভ্য ছিল? প্রশ্ন ওঠে। বৌধায়ন ধর্মসূত্র গ্রন্থে (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম-ষষ্ঠ শতাব্দী) স্বীকার করা হয়েছে যে, অঙ্গ ও মধ্যদেশে আংশিক আর্যীকরণ সম্পন্ন হলে, পুণ্ড্র, বঙ্গ ও কলিঙ্গ উত্তর-ভারতের আর্য জাতির ভাল রকম সংস্পর্শে আসে। শুশুনিয়া লেখ থেকে জানা যায়, খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে রাজা চন্দ্রবর্মণের পুত্র সিংহবর্মণ পুষ্করণের (অধুনা পোখরনা) রাজা ছিলেন। প্রায় সমগ্র রাঢ় (দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলা) তাঁর শাসনাধীনে ছিল। আর এলাহাবাদ প্রশস্তি থেকে জানা যায়, সমুদ্রগুপ্ত চন্দ্রবর্মণকে পরাজিত করে এই অঞ্চলকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। হরিসেন তাঁর এলাহাবাদ প্রশস্তিতে এরকমই উল্লেখ করেছেন। শুধু তাই নয়, সমুদ্রগুপ্তের সময়ের নানা প্রত্নসামগ্রীর সাথে স্বর্ণমুদ্রাও পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু তারপর ? তারপর তো বহু বছর এই অঞ্চল বর্ধমানভুক্তি ও দণ্ডভুক্তির অধীনস্থ ছিল। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, বাংলায় আর্যীকরণের কাজ প্রথমে উত্তর ও পূর্ব বাংলায় হয়, তারপরে আসে এই পশ্চিম বাংলায়। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে বাংলায় আর্য ধর্মের প্রসারের একাধিক নিদর্শনও পাওয়া গিয়েছে। আবার একই সময়ে দেখা গিয়েছে বাংলায় জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম প্রসার শুরু হয়েছে। অর্থাৎ পুণ্ড্রবর্ধন ও রাঢ় জনপদে গুপ্ত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে বাংলার স্বল্পপরিচিত রাজন্যবর্গের মধ্যে অন্যতম ছিলেন দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গের রাজা চন্দ্রবর্মণ। সাধারণ মানুষের মধ্যে বিষ্ণু উপাস্য দেবতা। জৈন ও বৌদ্ধরা সবে আসতে শুরু করেছে। দিগম্বর জৈন ও পরবর্তীকালে বৌদ্ধদের এ তল্লাটের মানুষ খুব সহজে মেনে নেয়নি।। (পড়ুন দশম পর্ব)

কভারের ছবি: স্থানীয় গোষ্ঠীর মানুষ এবং প্রোটো-অস্ট্রালয়েড মানুষ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here