bengali

কৌশিক মাইতি: মাতৃভাষার লড়াই আসলে গরিব, বঞ্চিতের লড়াই!! গোটা ভারতের জন্য অভিন্ন মেডিক্যাল এন্ট্রান্স, প্রশ্ন করে সিবিএসই। সিলেবাস প্রায় এক, কিন্তু পরীক্ষার ধাঁচ আলাদা, অচেনা ময়দান। ফলত রাজ্যের মেডিক্যাল কলেজগুলোয় ২০১৭ সালে রাজ্য বোর্ড থেকে পাশ করা ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা মাত্র ৭%, ২০১৬ সালে যা ছিল ৭৫%। গ্রামবাংলার ছেলেমেয়েদের কাছে ডাক্তার হওয়া প্রায় অলীক স্বপ্ন, কিন্তু তাদের স্বপ্নের অপমৃত্যুর দায় কার?
রাজ্য বোর্ড পরীক্ষা নিলে, সিবিএসই-র তথাকথিত মেধাবীদের সাথে লড়াই করেই তো ৭৫% হয় তারা। কিন্তু সিবিএসই পরীক্ষা নিলে চিত্রটা পুরো আলাদা। রাজ্য বোর্ড তথা গ্রামবাংলার ছেলেমেয়েদের মেধা কমে গেছে বা তারা পরিশ্রমী নয়, এ গল্প ধোপে টেকে?

রাজ্যের মেডিক্যাল কলেজে রাজ্যের ছেলেমেয়েদের জন্য ৮৫% আসন সংরক্ষিত। রাজ্য বোর্ডের ছেলেমেয়েরা কম পেলে কারা পাবে ডাক্তারিতে সুযোগ? উত্তর সবারই জানা– সিবিএসইর ছাত্রছাত্রীরা। সিবিএসইতে কারা পড়ে মূলত? শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজের বা তার উপরের অংশের ছেলেমেয়েরা সিবিএসই মানে বেসরকারি ঝাঁ-চকচকে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী সব, রাজ্য বোর্ডের স্কুলের চৌহদ্দিতে তারা যায় না। গ্রাম বা মফস্বলে চিত্রটা এখনও কিছুটা আলাদা, বেশিরভাগই পড়ে রাজ্য বোর্ডে। তবে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে, ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে সিবিএসই স্কুল। জেলা শহর বা মফস্বলে এখন বেসরকারি স্কুলের দাপট। মানে মফস্বলের মধ্যবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলেমেয়েরাও সিবিএসইতে পড়ে নিজেদেরটা গুছিয়ে নিতে পারবে। একটু দেরি হলেও, তারা তাদেরটা গুছিয়ে নিতে পারবে।

তা হলে কারা শেষমেশ বঞ্চিত হচ্ছে? কাদের স্বপ্ন নিয়ে ছেলেখেলা হচ্ছে? উত্তরটা আশা করি দেওয়ার দরকার নেই আর। তামিলনাড়ুতে ২০১৬-তে (শেষবার রাজ্য বোর্ডের আওতায় মেডিক্যাল এন্ট্রান্স) মেডিক্যালে ভর্তির সময় বহু অভিভাবক মাটিতে বসেছিলেন, অনেকে চাটাই পেতে। কিন্তু ২০১৭-তে নীট চালু হতেই, কাউন্সেলিং বা ভর্তির সময় প্রাইভেট গাড়ির লম্বা লাইন। অতএব সহজেই অনুমান করা যায়, নীটের ফলে আসলে কী আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন হল।

এ তো গেল এক কথা। বর্তমানে বড় বড় কোচিং সেন্টারে না পড়লে মেডিক্যাল পাওয়া দুষ্কর। খরচ লাখ লাখ টাকা। কিন্তু কিছু বছর আগেও দৃশ্যটা এমন ছিল না। এখানেও সেই টাকার খেলা, বঞ্চিত হবে গরিব ছেলেমেয়েরা। ইঞ্জিনিয়ারিং-এ একই দৃশ্য, ক্রমাগত হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার মেধা, জোর করে হারিয়ে দেওয়া হচ্ছে গরিব ছেলেমেয়েদের। মনে হচ্ছে স্বাভাবিক সব, কিন্তু আসলে সবই পরিকল্পনার অংশ।
সঠিক ডোমিসাইল নীতি না থাকায় বাংলায় নানা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হতে পারছেন না রাজ্যের ছেলেমেয়েরা। মূলত বঞ্চিত হচ্ছে গ্রাম-বাংলা, গরিব ছেলেমেয়েরা, রাজ্য বোর্ড। শিবপুর কেন্দ্রীয় কলেজ হয়ে গিয়ে আগেই রাজ্যের ছেলেমেয়েদের প্রভূত ক্ষতি হয়েছে।

গ্রামবাংলা তথা পুরো রাজ্যের গরিব ছেলেমেয়েরা ব্যর্থতার অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে, যাবেও। তাই সকল মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তদের (এমনকী শহুরে বামদেরও) মুখে রা নেই। ভালই তো, তাদের ছেলেমেয়েরা সুযোগ বেশি পাচ্ছে, আসলে সবাই সবারটা বুঝে নেয়। তাই গরিব বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষকেও নিজেদের ভাল বুঝে নিতে হবে। রাজ্য বোর্ড পরীক্ষা নিলে ও বাংলায় প্রশ্ন থাকলে কাদের লাভ? কাদের ক্ষতি? আশা করি উপরের আলোচনার পর, এই প্রশ্নের কোনও অবকাশ নেই।

শুধু মেডিক্যাল নীট না, অন্যান্য সব পরীক্ষাতেও চিত্র অনেকটা একই। হিন্দি ও ইংরেজিতে পরীক্ষা হলে বঞ্চিত হয় পিছিয়েপড়া মানুষই। যে কেউ ভাল ইংরেজি শিখতে পারে, এই তত্ত্ব কথা আওড়াবেন না আশা করি। মাতৃভাষার পরীক্ষা না হলে বিপদ কাদের? সুবিধা কাদের? মাতৃভাষায় কাজকর্ম করলে বা পরীক্ষা হলে সুযোগ বাড়ে গ্রামবাংলা তথা রাজ্যের গরিব, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও পিছিয়েপড়া ছেলেমেয়েদের। এরাই সংখ্যায় বেশি। শুধুমাত্র ইংরেজি বা হিন্দিতে পরীক্ষা হলে সুযোগ বেড়ে যায় সিবিএসইর ছেলেমেয়েদের, কারণ কমে যায় প্রতিযোগিতা। অর্থাৎ শুধুমাত্র ভাষার কারণে হারিয়ে দেওয়া হয় যোগ্য ছেলেমেয়েদের।

নীটের মডেলই সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে চায় কেন্দ্র সরকার। অর্থাৎ সব জায়গাতেই এভাবে হারিয়ে দেওয়া হবে সমাজের একটা বড় অংশকে, রাজ্য বোর্ড থেকে পাশ করা সার্টিফিকেট যাতে শুধুমাত্র একটা কাগজ হিসাবেই রয়ে যায়, তার বন্দোবস্ত চলছে। রাজ্য বোর্ডে পড়ে কিছু হয় না, এই মিথ্যেকে সত্যিতে পরিণত করা হচ্ছে। কারণ সত্যিই তো রাজ্য বোর্ডে পড়ে মেডিক্যাল পাওয়া যায় না, অন্যান্য চাকরিতেও পিছিয়ে পড়তে হয়। ফলে সামান্য সামর্থ্য থাকলেই সিবিএসই স্কুলে পদতলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন অভিভাবকরা। পুরোটাই একটা ডিজাইন।

এছাড়া ব্যাংক সহ নানা অফিসে বাংলায় ফর্ম না থাকায় কারা বিপদে পড়ে? প্রশ্ন করুন, উত্তর খুব সহজ, নিজেই পেয়ে যাবেন। রান্নার গ্যাস ব্যবহারের নির্দেশাবলি থেকে শুরু করে জীবনবিমার কাগজপত্রে লেখা থাকা নানা শর্ত– এসব বাংলায় না থাকায় কাদের বেশি ক্ষতি হয়? মানে, বাংলায় থাকলে কাদের লাভ হবে? সমস্ত কাস্টমার কেয়ারে বাংলা বলার জন্য প্রতিনিধি থাকলে কাদের চাকরি বাড়বে? রেলের টিকিটে বাংলা না থাকায় সমস্যা কার? একটা জাতি যখন নিপীড়িত হয়, তখন সেই জাতির সর্বস্তরই সমস্যায় থাকে, কিন্তু নিচের দিকের মানুষ সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়। যেমন বাংলায় পরিষেবা না পেলে সমস্যা বেশি গরিব, নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাঙালির।

তাই মাতৃভাষার জন্য সংগ্রাম আসলে ভাতের লড়াই, বঞ্চিতের অধিকারের লড়াই। এতে ভাষার অধিকার যেমন সুরক্ষিত হয়, তেমনই সমাজের প্রান্তিক মানুষ বা সাধারণ মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত হয়। তাই রাজ্য বোর্ড শক্তিশালী হোক, সব রাজ্য সরকারি চাকরির পরীক্ষা বাধ্যতামূলক বাংলায় হোক। সব স্কুলে বাংলা বাধ্যতামূলক হোক– এ দাবিও জোরালো হোক। বাংলাকে কাজের ভাষা বানাতেই হবে। বাংলা কাজের ভাষা না হলে বাংলা মাধ্যমের ছেলেমেয়েরা এবং বাঙালি জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here