pujor gan

তিয়াষা গুপ্ত: রেললাইনের ধারে কাশফুলের দোলা দেখার দিন এল বলে। আর কিছুদিন পরেই শিউলির কুঁড়ি জানান দেবে, পুজো দূরে নেই। শরতের আলোর বেণু বেজে উঠলেই নতুন জামাকাপড়ের সঙ্গে বাজারে এসে যেত পুজোর গান৷ হেমন্ত-মান্না-শ্যামল-মানবেন্দ্র-নির্মলেন্দু চৌধুরীদের মতো স্বর্ণযুগের শিল্পীদের সঙ্গে একসময়ে বাজার মাত করেছে শ্রীকান্ত-লোপামুদ্রা-রাঘব-শুভমিতাদের গান। এখন সেই সব দিনের সন্ধান করতে হলে স্মৃতির অ্যালবাম হাতড়ে মরতে হবে।

পুজো আসব আসব করলেই একসময় নতুন গান শোনার তাগিদ বাঙালির মনে নাড়া দিত। কলের গানের কলকাতা সেই কবেই অতীত হয়ে গিয়েছে, তারপর এসেছে ক্যাসেট ও সিডি-ডিভিডির যুগ৷ কয়েক বছর আগেও পুজোর নতুন বাংলা গান বাজারে আসত৷ অথচ এখন যেন হারিয়েই গিয়েছে বাঙালির পুজোর গান৷ এর কারণ কী? সঙ্গীতশিল্পী সৈকত মিত্রের কথায়, বাঙালির পুজো মানে উৎসব। এই সময়ে রেকর্ড বেরত, তাতে ব্যবসায়িক দিক দিয়ে সফল হত মিউজিক কোম্পানিগুলি। এইচএমভি সারাবছরে একটা সময়ে ৩০টা রেকর্ড বের করত। তখন গানের সংখ্যা অনেক কম ছিল। লোকের কাছে পৌঁছনোর মাধ্যম ছিল মূলত রেডিয়ো। একজনের বাড়িতে একটা রেডিয়ো। সবাই শুনত। পরে টিভি আসার পরও তাই হল। তারপর ক্যাসেট এল। মিড সেভেনটিজ-এ তখন অনেক শিল্পী নিজেরা পয়সা দিয়ে গান রেকর্ড করতেন। অসাধারণ জায়গাটা ভেঙে গেল। আমরা অনেক শিল্পী পেলাম, কিন্তু আগের চেয়ে গুণগত মান নেমে গেল। অর্থনীতির কথায়, ডিমান্ডের চেয়ে সাপ্লাই বেড়ে গেল। ফলে মান পড়ে গেল।

বাড়িতে বাড়িতে কলের গানের মতোই এখন শো-পিস হিসেবে ঠাঁই পেয়েছে ক্যাসেট প্লেয়ার৷ সিডি-ডিভিডি প্লেয়ারটা মাঝেমধ্যে গেয়ে উঠলেও তার পরমায়ু ফুরিয়ে এল বলে৷ তাই এখন পুজো এলে নতুন গান দূরের কথা, শারদীয়া সিডি-ডিভিডি প্রকাশের সংখ্যাও কমে গিয়েছে৷ তাই এ সময়ের শিল্পীরা বাংলা ছবিতে গাইলেও বেসিক রেকর্ড, যাকে আমরা বাংলা আধুনিক গান বলে জানি, সেই ধারাটি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। কেন এই হাল হচ্ছে আধুনিক গানের? রবীন্দ্র-নজরুল-অতুলপ্রসাদ-দ্বিজেন্দ্রলাল-রজনীকান্তের গানের বাইরে বাংলা গানের যে ধারা হিমাংশু দত্ত, সুধীন দাশগুপ্ত, সলিল চৌধুরী, শচীন দেববর্মনদের হাত ধরে খ্যাতির শিখর ছুঁয়েছিল, তার এই অবস্থা কেন? প্রযুক্তির এত দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি কি বদলাতে পারছে না? এখন সকলের হাতে স্মার্টফোন। ৷ তাতে ইউটিউবের মাধ্যমে গান শোনা যায়, কিনতে হয় না৷ এর ফলে রেকর্ড কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে৷ প্রশ্ন হল, সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি তো এগোবেই। কিন্তু তাতে গানের অবক্ষয় ঘটবে কেন? তা হলে মিউজিক কোম্পানিগুলি কোথাও পরিবর্তনের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারছে না?

এ বিষয়ে সৈকত মিত্র বলেন, মিউজিক কোম্পানিগুলি তো ব্যবসা করতে এসেছে। চ্যারিটি নয়। ফলে বিক্রি না হলে কাজ করবে কেন? এখন তো সবাই ইউটিউব বা অন্য কোনও মিউজিক ওয়েবসাইটের মাধ্যমে গান শোনে। তবে একটা ব্যবসায়িক দিক আছে, যেমন সারেগামা-র ক্ষেত্রে যদি কেউ আমার বাবার (শ্যামল মিত্র) গান শোনেন, তা হলে ওরা একটা পয়সা পায়। অনেক শিল্পী অনিয়মিতভাবে হলেও পুজোয় ইউটিউবে গান প্রকাশ করছেন৷ মোবাইল ডেটা ভারতে এখন খুব সস্তা হওয়ায় অনলাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইউটিউবে বা অন্য মিউজিক ওয়েবসাইট দেখায় বাধা নেই৷ সেখানে গান প্রকাশ করলে নিমেষে তা পৌঁছে যাচ্ছে শ্রোতার স্মার্টফোনে৷ এর ফলে গানের মান পড়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন সৈকত মিত্র। তিনি আরও মনে করেন, মানুষ কাজ করতে করতেও গান শুনছে, ফলে সজ্ঞান প্রয়াস ব্যাপারটা হারিয়ে গিয়েছে। গান আর আগের মতো মনে দাগ কেটে থাকছে না। তিনি মনে করেন, সস্তা বিনোদনের উপকরণ এখন হাতের নাগালে। তাই গানের মান ধাক্কা খাচ্ছে।
প্রযুক্তির বিপ্লবকে সঙ্গে নিয়েই পুজোয় ভালো বাংলা গানের জন্য প্রত্যাশা থেকে গেল বাঙালির। বরং হালফিল প্রযুক্তি সেই চাহিদাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল, তা চোখ বুজে বলা যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here