ঋদ্ধীশ দত্ত, কলকাতা: ৭৪তম স্বাধীনতা দিবসের দিন লালকেল্লার মঞ্চ থেকে প্রত্যেক দেশবাসীর জন্য নতুন স্বাস্থ্য ‘প্রকল্প এক দেশ এক হেলথ কার্ড’-এর সূচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এই প্রকল্পে যুক্ত হলে প্রত্যেক ভারতীয়র একটি সিঙ্গেল ইউনিক হেলথ আইডি তৈরি হবে। এর মাধ্যমে প্রত্যেক ভারতীয়র স্বাস্থ্য সম্পর্কিত একটি প্রোফাইল তৈরি করা থাকবে ডেটাবেসে। আগামী সময় যার ফলে ভারতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য পরিকাঠামো অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশিষ্ট চিকিৎসকরা। তবে অনেকেই জানেন না, প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদীর দ্বারা ঘোষিত এই নতুন প্রকল্প আসলে কলকাতার একজন চিকিৎসকের মস্তিষ্কপ্রসূত। ২০১৭ সালে এই সম্পর্কিত একটি প্রস্তাব তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রক জমা দিয়েছিলেন কলকাতার এই চিকিৎসক। যা আজ নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে।

ভারতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবথেকে বড় সমস্যা হল, কোনও রোগী যখন তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে যান তখন প্রতিবারই একগাদা টেস্ট করার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। আগে একাধিকবার সেই টেস্ট করানো হলেও আগের রিপোর্ট অনেকেই স্বীকার করেন না। চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই এই টেস্টের বহরে রোগীদের তো নাস্তানাবুদ হতে হয়। উপরন্তু প্রচুর সময় এবং অর্থের জলাঞ্জলি হয়। স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় এই অব্যবস্থার ছবি বহু আগেই ধরা পড়েছিল ঢাকুরিয়া আমরি হাসপাতালের চিকিৎসক ডাঃ ইন্দ্রনীল খানের চোখে। সেই থেকেই তাঁর মাথায় বুদ্ধি খেলে। কেমন হয় যদি সকল ভারতীয়দের স্বাস্থ্য সম্বন্ধিত একটি প্রোফাইল বানানো যায়! সেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি শেষ কবে কোথায় কী পরীক্ষা করেছিলেন, তার মেডিকেল ইতিহাস কী, শরীরে অন্যান্য কোনও সমস্যা রয়েছে কিনা, ইত্যাদি ইত্যাদি সব রকম স্বাস্থ্যজনিত তথ্য মজুদ করা থাকবে। কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের কেবলমাত্র একটি ক্লিকে মুহূর্তের মধ্যে যে কোনও রোগীর স্বাস্থ্যের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবেন যে কোনও চিকিৎসক।

এই পরিকল্পনা আসামাত্রই কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন ডাক্তার ইন্দ্রনীল খান। ২০১৭ সালে পরিকল্পনা সম্পূর্ণ হতেই এর একটি একটি প্রস্তাবনা তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডার কাছে জমা দেন তিনি। নিজের প্রস্তাবনায় ডাঃ খান লিখেছিলেন, যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় তবে ভারতীয় চিকিৎসার গতিপথ আমূল বদলে যাবে। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে এই প্রস্তাব তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পেশ করেন। প্রায় ৩ বছর এক মাস পর এদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সকল ভারতীয়দের জন্য সেই ইউনিক হেলথ আইডি সূচনার কথা ঘোষণা করেন। যেখানে রোগীদের মেডিকেল ডেটা হাসপাতাল, ক্লিনিক ও চিকিৎসকদের সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। প্রত্যেক নাগরিককে একটি ইউনিক হেলথ আইডি দেওয়া হবে যা দিয়ে লগইন করলে তার সমস্ত মেডিক্যাল হিস্ট্রি চোখের সামনে চলে আসবে চিকিৎসকের।

Today on the occasion of Independence Day, PM Narendra Modi launched #NationalDigitalHealthMission from Red Fort. First…

Posted by Indranil Khan on Friday, August 14, 2020

 

দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা অবশেষে এদিন বাস্তবায়িত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বসিত চিকিৎসক ইন্দ্রনীল খান। নিজের ফেসবুকে তিনি একটি পোস্ট শেয়ার করে জানিয়েছেন এই ঘটনার কথা। তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডার কাছে নিজের যে স্বপ্ন গচ্ছিত করে এসেছিলেন তা অবশেষে বাস্তবায়িত হতে চলেছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা নিয়ে অনেক কথা ও লেখালেখি হলেও যিনি নিজে এত বড় পরিকল্পনা করেছিলেন, সেই ইন্দ্রনীল খান আজ কিছুটা হলেও আড়ালে। মহানগর২৪x৭-এর তরফ থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ইন্দ্রনীলবাবু বলেন, ‘আমরা চিকিৎসক। রোগীদের সুবিধা করে দেওয়াই আমাদের প্রধান কাজ। এত বড় পরিকল্পনার বাস্তবায়নটা যাতে সঠিকভাবে হয় সেটাই আসল। সেটা হলেই হল।’ তাই এত বড় প্রকল্পের নেপথ্যে থেকেও প্রচারের আলো না পেয়ে কোনও খেদ নেই ডাক্তারবাবুর।

তাঁর নিজের অভিজ্ঞতাই যে তাঁকে এভাবে ভাবতে সাহায্য করেছে এদিন সে কথাও মহানগরকে জানান ইন্দ্রনীলবাবু। তিনি বলেন, ‘আমি দেখতাম আরামবাগের রোগীর রিপোর্ট কলকাতায় মানা হচ্ছে না। কলকাতার রিপোর্ট আবার ভেলোরে মানা হচ্ছে না। ফলে টেস্ট করাতে করাতে এক একজন রোগী নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ তো সঙ্গে রিপোর্টের এত কাগজই নিয়ে আসতেন যে কিছু খুঁজে পেতেই বেলা গড়িয়ে যেত। এখন যদি মোবাইলে কোনও অ্যাপ বা ওয়েবসাইডের মাধ্যমে এটা ম্যানেজ করা হয় তবে একটা ক্লিকেই সব তথ্য বেরিয়ে আসবে। কাগজ কম ব্যবহার হলে প্রত্যক্ষভাবে সেটা পরিবেশ বান্ধবও হয়ে উঠবে। এই কারণেই এতকিছু ভাবা।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here