বিশেষ প্রতিবেদন: অনেক টানাপোড়েনের মধ্যে গোটা রাজ্যজুড়ে পঞ্চায়েত নির্বাচন শেষ হয়েছে৷ পঞ্চায়েত ভোটের রেশ কাটতে না কাটতেই আরও একটি বড় নির্বাচনের সাক্ষী হতে চলেছে বঙ্গবাসী৷ আগামী ২৮ মে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার মহেশতলা বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে৷ ফলাফল ৩১ মে৷ তৃণমূল বিধায়ক কস্তুরী দাসের মৃত্যুতে এই আসনটি শূন্য হয়৷ এবার সেখানে শাসক দল তৃণমূলের প্রার্থী কস্তুরীদেবীর স্বামী দুলাল দাস৷ বিজেপি প্রার্থী প্রাক্তন আইপিএস সুজিত ঘোষ৷ এবং কংগ্রেস সমর্থিত বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিএম প্রার্থী প্রভাত চৌধুরি৷ ত্রিমুখি এই লড়াইকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজনীতির রঙে সেজে উঠেছে মহেশতলা৷ এই কেন্দ্রে কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে তা নিয়ে ইতিমধ্যেই জল্পনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে৷ পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী এখানে অনেকটাই পিছনে ফেলেছেন বিরোধীদের৷ ১৫৫, মহেশতলা বিধানসভা এলাকায় মোট ভোটার ২ লক্ষ ৪৮ হাজার ৭৫৪ জন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লক্ষ ২৭ হাজার ১৭৮ জন এবং মহিলা ভোটার ১ লক্ষ ২১ হাজার ৫৬৯ জন। এই কেন্দ্রে বুথের সংখ্যা ২৮৩।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুসারে মহেশতলায় তৃণমূল প্রার্থীর জয় শুধু সময়ের অপেক্ষা৷ মূলত, যে ৭টি কারণে এখানে বিরোধীদের থেকে অনেকটাই এগিয়ে তৃণমূল, তা নিয়ে আলোচনা করা হল–

(১) উপনির্বাচনে তৃণমূলের ঝড় ও শক্তিশালী সংগঠন : সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি উপনির্বাচনে দাপটের সঙ্গে জয় পেয়েছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস৷ সেই নিরিখে এবার মহেশতলাতেও হাওয়া বইছে তৃণমূলের৷ কাঁথি হোক কিংবা সবং, নোয়াপাড়া হোক কিংবা উলুবেড়িয়া উপনির্বাচন সর্বত্র ঘাসফুলের জয়জয়কার হয়েছে৷ শুধু জয় নয়, আগের থেকেও বেশি মার্জিনে উপনির্বাচনে জয় পেয়েছে তৃণমূল৷ বেড়েছে ভোট শতাংশো৷ মহেশতলাতে এমন কিছু ঘটেনি যে, এই ট্রেন্ডের পরিবর্তন হতে পারে৷ উপনির্বাচনে জনগণ সবসময়ই চায় সরকার পক্ষের দলকে নির্বাচিত করতে৷ তাছাড় মহেশতলায় তৃণমূলের সংগঠন বেশ শক্তিশালী৷

(২) সহানুভূতি তৃণমূলের পক্ষে: মহেশতলায় শেষ দু’বার বিপুল মার্জিনে জিতেছিলেন তৃণমূল প্রার্থী কস্তুরী দাস৷ গত ফেব্রুয়ারিতে তাঁর আকষ্মিক মৃত্যু ঘটে৷ পরিবর্তে এবার মহেশতলায় প্রার্থী প্রয়াত কস্তুরীদেবীর স্বামী দুলাল দাস৷ কস্তুরীদেবীর পরিবারের লোকের প্রতি এলাকার মানুষের একটা সহানুভূতি থাকা খুব স্বাভাবিক৷ তাই সহানুভূতির ভোট তৃণমূল প্রার্থীর পক্ষেই যাবে৷

২০১৬ সালের নির্বাচনে কস্তুরী দাস পেয়েছিলেন ৯৩ হাজার ৬৭৫টি ভোট৷ শতাংশের বিচারে যা ৪৮.৬০ শতাংশো৷ জিতেছিলেন ১২ হাজার ৪৫২ভোটে৷ ২০১১ সালে অবশ্য আরও বেশি মার্জিনে জিতেছিলেন তিনি৷

(৩) তৃণমূল প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত: দুলাল দাসের পরিচয় শুধুমাত্র প্রয়াত কস্তুরী দাসের স্বামী হিসেবে নয়, দুলালবাবু মহেশতলা পুরসভার দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান৷ শাসক দলের দক্ষ সংগঠক বলেই পরিচিত তিনি৷ খুব দক্ষতার সঙ্গে পুরসভা পরিচালনা করছেন৷ এলাকার মানুষের কাছে কাজের মানুষ, কাছের মানুষ বলেই পরিচিত তিনি৷ সুতরাং, মহেশতলা দুলাল দাসের খাসতালুক৷

অন্যদিকে, বিজেপি প্রার্থী সুজিত ঘোষ একজন প্রাক্তন আইপিএস অফিসার৷ কিন্তু এলাকার মানুষের কাছে অপরিচিত মুখ তিনি৷ রাজনীতিকভাবেও খুব বেশি পরিচিতি নেই সুজিতবাবুর৷ বাম প্রার্থী প্রভাত চৌধুরিও খুব লো-প্রোফাইল নেতা৷ অনেকেই তাঁর নামের সঙ্গে পরিচিত নন৷ সেক্ষেত্রে দুলাল দাস প্রার্থী হিসেবে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য মানুষের কাছে৷

(৪) নিশ্চিহ্ন কংগ্রেস, বামেরা বিলুপ্তপ্রায়: দক্ষিণবঙ্গে বিশেষ করে কলকাতা ও তৎসংলগ্ন জেলাগুলিতে কংগ্রেস সাইনবোর্ড৷ তাদের কোনাও অস্তিত্বই নেই৷ পাশাপাশি, এই নির্বাচনের আগে পঞ্চায়েতের যা ফল, তাতে সিপিএমও রাজ্য থেকে মুছে গেছে৷ সুতরাং, এই দুটি দলের কোনও গ্রহণযোগ্যতা নেই মানুষের কাছে৷ কিছু পকেট ভোট থাকলেও, বামেদের সিংহভাগ ভোটে থাবা বসিয়েছে বিজেপি৷ মহেশতলায় যা পরিস্থিতি, তাতে বামেদের খুব খারাপ ফলাফল হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই৷ তবে এখনও মহেশতালায় বামেদের ভিত বিরোধীদলগুলির মধ্যে বেশি৷ ২০১৬ সালে এখানে বাম-কংগ্রেস জোটপ্রার্থী ছিলেন সিপিএম জেলা সম্পাদক শমীক লাহিড়ি৷ ৪২ শতাংশো ভোট পেয়েছিলেন তিনি৷ সংখ্যার বিচারে যা ৮১ হাজার ২২৩টি ভোট৷ এবার সিপিএম সেটা কতটা ধরে রাখতে পারবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে৷

(৫) উত্থান হলেও দুর্বল সংগঠন বিজেপির: বাংলার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিজেপির উত্থান নিয়ে অস্বীকার করার জায়গা নেই৷ সদ্য সমাপ্ত পঞ্চায়েত নির্বাচনে বামেদের পিছনে ফেলে সর্বত্র দ্বিতীয়স্থানে উঠে এসেছে গেরুয়া শিবির৷ বাংলায় বিজেপিই এখন প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে৷ তবে সংখ্যা বা শতাংশের বিচারে ‘ফার্স্ট বয়’ তৃণমূলের চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে তারা৷ সেক্ষেত্রে তৃণমূলকে টেক্কা দিয়ে মহেশতালার বৈতরণী পার হওয়া দিলীপ ঘোষদের পক্ষে এখনই অসম্ভব৷ দলীয় নেতৃত্বের সেটা অজানা নয়৷ বিজেপি এখানে দ্বিতীয়স্থান পেতে লড়ছে৷ সেটাও যে খুব সহজ হতে তাদের কাছে এমনটা নয়৷

২০১৬ সালে বিজেপি প্রার্থী কার্তিক ঘোষ তৃতীয় স্থানে থাকলেও পেয়েছিলেন মাত্র ১৪ হাজার ৯০৯টি ভোট। শতাংশের বিচার ৮ শতাংশের একটু কম৷ যা তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় অনেক কম। স্বভাবতই প্রায় ৬৭ হাজার ভোটের ব্যবধান কমিয়ে আসন্ন উপনির্বাচনে দ্বিতীয় স্থান পেতে রীতিমতো ঘাম ঝরাতে হবে গেরুয়া শিবিরকে। তাছাড়া সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে এখন বিজেপির কোনও গ্রহণযোগ্যতা নেই৷ তারা পদ্ম শিবির থেকে মুখি ফিরিয়ে নেবে এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই৷

(৬) সংখ্যালঘু ফ্যাক্টর: মহেশতলা বিধানসভা এলাকায় প্রায় ৩৮ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন৷ যাঁদের একটি বড় অংশ তৃণমূলকেই ভোটে দেবেন বলে মনে করা হচ্ছে৷ বাকিটা যেতে পারে বামেদের পক্ষে৷ সুতরাং, তৃণমূল তাদের পকেট ভোট ধরে রাখতে পারলেও বিজেপি ও বামেদের মধ্যে ভোট ভাগাভাগির প্রবল সম্ভাবনা৷ যা অ্যাডভান্টেজ শাসক দলের কাছে৷

(৭) প্রচারে ঘাসফুলের ঝড়: মহেশতলায় সামান্য একটি উপনির্বাচন হলেও শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস তাকে সহজ করে নিচ্ছে না৷ পঞ্চায়েতে বিপুল সাফল্যের পরও আত্মতুষ্টিতে ভুগতে নারাজ ঘাসফুল শিবির৷ তাই রবিবার ছুটির দিনেই প্রচারে ঝড় তুললো তৃণমূল কংগ্রেস৷ তারকাদের দিয়ে প্রচার করল শাসক দল৷ রাজ্যের মন্ত্রী ববি হাকিম দলীয় প্রার্থী দুলাল দাসকে নিয়ে বিভিন্ন এলাকা জুড়ে রোড শো করেন৷ আরেক মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জনসভা করেন৷ মনে রাখা দরকার, এই শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরেই এবার পঞ্চায়েত নির্বাচনে মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুর দখল করেছে তৃণমূল৷ এখনও পর্যন্ত শুভেন্দু অধিকারী যেখানে যেখানে হাত দিয়েছেন সোনা ফলিয়েছেন৷

অন্যদিকে, সংগঠনে তৃণমূলের ধারেকাছে নেই বিজেপি ও বামেরা৷ মিছিল-মিটিং তো দূরের কথা ব্যানার-ফেস্টুন লাগানোর লোক পাচ্ছে না সিপিএম৷ বিজেপি প্রচারে বামেদের থেকে কিছুটা এগিয়ে থাকলেও তৃণমূলকে কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেওয়ার জায়গায় নেই তারা৷

সুতরাং, উপরের ৭টি কারণ বিশ্লেষণের মধ্যেই স্পষ্ট মহেশতলায় তৃণমূল প্রার্থী দুলাল দাসের জয় শুধু সময়ের অপেক্ষা৷ এখানে বিরোধীদের থেকে অনেকটাই এগিয়ে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস৷

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here