meeting

দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়: রোমান সভ্যতা তখন তুঙ্গে। অ্যারিস্টটল, পেল্টো, আর্কিমিডিস, সক্রেটিস রাস্তায় দাঁড়িয়ে সে দেশের মানুষকে বোঝাচ্ছেন, আইন কী, বিজ্ঞান কী, আর সেই সঙ্গে বক্তৃতা দিয়ে চলেছেন নানা সামাজিক বিষয়ে। রাস্তার মানুষ শুনছে আর ভাবছে এই সব নতুন ধরনের কথা। ছোট ছোট জটলা করে আলোচনা করছে নিজেদের মধ্যে বিষয়গুলো নিয়ে। জানি না সভা শুরুর বিবর্তন ওখান থেকে কি না– না গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ নিজেদের মধ্যে একজনকে নির্বাচিত করে তাকে বিজ্ঞ ঠাউরে তার বক্তৃতা শুনে চলেছে।

শীত এখনও ঠিকমত পড়েও পড়ছে না। এখনও বাসে ও ট্রেনেতে বেশি ভিড় হলে ঘাম হয়। সেটা বোঝা যায়, বাসে-ট্রেনে চাপলে কিছুক্ষণ পর পকেটে থাকা রুমালটা বারবার বার করার ইচ্ছে হয়। মেলা, সার্কাস এখনও জমেনি। তবে সভা জমেছে, কারণ মোটামুটি সূর্যের তাপনির্গত অবস্থা বেশ দুর্বল। বছরখানেকের মধ্যেই নির্বাচন। সভার চাপ এখন একটু বেশি। বাঙালির সভা, জনসভা মানেই একটি কর্মনাশা দিন।

সভার মূল অর্থের সঙ্গে বাঙালির সভা, রাজনৈতিক সভার প্রচুর অমিল। অভিধানে সভার মূল অর্থ হল, ‘যাহা সজ্জন দ্বারা ভাত’। অর্থাৎ সকলে মিলিতভাবে শোভা পায়, তাহাই সভা। সভার সকলে সভ্য। ধরে নেওয়া যায়, সভায় যোগদানের লোকজনেরা অবশ্য সমাজের সুস্থ রীতিনীতি মেনে চলা আর যার সঙ্গে সম্ভ্রমের যোগাযোগ রয়েছে। অপরের সর্বনাশ, কর্মনাশ করে এই সভা হবে না।

উনবিংশ শতাব্দীতে আমরা এই সভাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম। সভার মধ্যে ঢুকে পড়ল পরিষদ, জমিদার সভা, জ্ঞানার্জনী সভা ইত্যাদি। যাদের নিজেদের সভার জন্য বাড়ি তৈরির ক্ষমতা থাকল না, তাদের সভা বসত কারও বাড়িতে বা উঠোনে। অথবা কোনও নির্দিষ্ট বাড়ির নির্দিষ্ট ঘরে। আগে সভা ছিল প্রতিনিধিমূলক। প্রতিনিধিগণ উপস্থিত হয়ে কথা বলতেন। পরস্পরের সঙ্গে মতের বিনিময় হত এবং পারস্পরিক যোগাযোগের সেতুবন্ধন হত। এই ধরনের সভা প্রাচীন ভারতীয় গোষ্ঠীর বোধ ও উনবিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ ধারণার বৈশিষ্ট্যকে নষ্ট করেনি।

বাঙালির হাল আমলের সভা সম্পূর্ণভাবে অন্য অভিমুখে। প্রতিনিধিত্বমূলক কোনও ব্যবস্থা নেই। পারস্পরিক যোগাযোগ নেই– যেখান থেকে পারো লোক ধরে আনো, সে আমার বক্তব্য বুঝুক আর না বুঝুক অথবা শুনুক বা না শুনুক। শহর দেখার নেশায় তাকে বুঁদ করে দাও। বক্তার বক্তব্য শেষ হওয়ার আগে জায়গা ছেড়ে সে ইতিউতি ছুকছুক করবে যাবার জন্য ছটফট করুক– গ্রামের লোকেরা শহরের চমকানো ঝাঁ-চকচকে দৃশ্য দেখে থতমত খেয়ে বাড়ি ফেরার তোড়জোড় করুক। আর বাড়ি ফিরে আবার সেই মাটির হাঁড়িতে ভাত রান্না আর তার পরে দুটো গেলা।

মহানগরের মানুষের দুর্গতির আর শেষ নেই। কোনও সভা-জনসভা থাকলে বাঙালি তার প্রত্যেকদিনের কজের ছন্দ হারিয়ে ফেলে কাজহারা মানুষে রূপান্তরিত হয়। মাঝেমাঝে মনে হয়, এবার আর দরকার নেই সভা, জনসভা, অনেক হয়েছে। শহর বা গ্রামের লোকেদের নিয়ে ছোট ছোট জমায়েতে চলুক রাজনৈতিক বক্তিমে, কচকচানি আর কাদা ছোড়াছুড়ি। অন্য লোককে বিব্রত করে নিজের শক্তি দেখাবার রাজনীতি বন্ধ হোক– বাঙালির সভা অবশ্যই সভ্য হোক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here