exclusive jamtara

Highlights

  • জামতারা যাওয়ার পরিকল্পনা শুনেই কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছিলেন পুলিশের বহু কর্তা
  • গোটা জেলা জুড়েই সাইবার অপরাধীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও খোদ জামতারা শহরে এদের উপস্থিতি তুলনামূলক একটু কম
  • “নমস্কার স্যার, আপনার ব্যাঙ্কের হেড অফিস থেকে বলছি…….।”

রাজেশ সাহা, জামতারা : কলকাতা থেকে রেলপথে গতকাল রাতেই আসানসোল এসে পৌঁছেছি। প্রধান ও একমাত্র গন্তব্য, পাশের রাজ্য ঝাড়খণ্ডের জামতারা জেলা। উদ্দেশ্য, সংগঠিত সাইবার অপরাধ ও অপরাধীদের নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করে খবর সংগ্রহ করা। জামতারায় সাইবার অপরাধের খুঁটিনাটি আগের পর্বেই ব্যক্ত করেছি বিস্তারিত ভাবে। কিছুদিন আগে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় জামতারা যাওয়ার পরিকল্পনা শুনেই কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছিলেন পুলিশের বহু কর্তা। সেসব সতর্কতা মাথায় রেখেই আসানসোল থেকে ট্রেন ধরে জামতারার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া। আসানসোল থেকে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার দূরে, চিত্তরঞ্জনের ঠিক পরেই জামতারা স্টেশন। চারটি প্ল্যাটফর্ম বিশিষ্ট সাদামাটা একটা রেল স্টেশন। পাশেই ভিড়ে ঠাসা জমজমাট রাস্তা ও বাজার। মোটামুটি ব্যস্ত জনজীবন। এটিই জেলার সদর শহর। তাই কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের সব সদর কার্যালয়। চারিদিকে কড়া নজরদারি নিরাপত্তাবাহিনীর। তবুও পুলিশের চোখ রাঙানি এড়িয়েই এই স্থান থেকে অনবরত ঘটে চলেছে দেশজুড়ে কোটি কোটি টাকার ব্যাঙ্ক জালিয়াতির মতো সংগঠিত অপরাধ। যদিও জামতারা পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, এই গোটা জেলা জুড়েই সাইবার অপরাধীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও খোদ জামতারা শহরে এদের উপস্থিতি তুলনামূলক একটু কম। এই জেলায় ছটি ব্লকের অন্তত ৪টি ব্লক সাইবার অপরাধের জন্য কুখ্যাত। তার মধ্যে প্রথম স্থানেই রয়েছে কর্মাটাঁড় গ্রাম, দ্বিতীয় নারায়ণপুর।

জামতারা সদর শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরেই কর্মাটাঁড় গ্রাম। ট্রেন ও সড়ক পথে যুক্ত এপার ওপার। আরও সাদামাটা ন্যাড়া একটি স্টেশন। রেল লাইনের দুই পাড়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য উঁচু উঁচু টিলা। দূর থেকে আচমকা দেখলে যা ছোটখাটো পাহাড়ই বলে মনে হবে। আশেপাশে মাইলের পর মাইল ফাঁকা জমির পরিমাণই বেশি। কিছুটা আবার জঙ্গলে ঘেরা। তবে ট্রেন থেকে স্টেশনে পা দিতেই অবাক হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা। বাংলা নয়, প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত এই স্টেশনটির নাম ‘বিদ্যাসাগর’! কৌতূহল নিরসনে এগিয়ে এলেন স্টেশনের ঠিক পাশেই মটোরবাইকের শোরুম চালানো এক বাঙালি ব্যাবসায়ী। ঘুরতে এসেছি বলতেই খানিকটা নিজে থেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন তিনি। আদতে চিত্তরঞ্জনের রূপনারায়নপুরের বাসিন্দা নিরঞ্জন বাবুই জানালেন, “এক সময় এই গ্রামেই থাকতেন খোদ ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর। এই গ্রামে থেকে অনেক কাজ করেছিলেন তিনি, যার সামান্য কিছু নিদর্শন এখনও এই গ্রামে বর্তমান”। ছাপোষা এই বাঙালি ব্যাবসায়ীই খোঁজ দিলেন, স্টেশনের খুব কাছেই অবস্থিত মালিবাগান নামের এক স্থানে এখনও ভগ্নপ্রায় অবস্থায় পড়ে রয়েছে বিদ্যাসাগরের ফেলে যাওয়া বেশ কিছু স্মৃতি। জানা যায়, নিজের শেষ জীবনের গোটা আঠেরোটি বছর এই গ্রামেই কাটিয়েছিলেন ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর। মালিবাগানের ছোট্ট একটি ঘরে পড়ে থেকে কাজ করে গিয়েছেন শিক্ষার বিস্তারের জন্য। এখনও সেই স্থানেই অযত্নে সকলের অলক্ষ্যে পড়ে রয়েছে বেশ কিছু স্মৃতি।

যদিও বিদ্যাসাগর এই গ্রামের বাসিন্দাদের একেবারেই চর্চার বিষয় নন। এই এলাকার যুব সম্প্রদায়ের সদস্যদের অধিকাংশই নামই শোনেনি তাঁর। শোনেনি কারণ দরকারও পড়ে না। বরং এদের একমাত্র চর্চার বিষয় – সাইবার, ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড, পেটিএম, ইউপিআই, সিভিভি, ওটিপি। এই কয়েকটি শব্দেই সীমাবদ্ধ এই গ্রামের যুব সমাজের অধিকাংশ। কারণ, জামতারা জেলার এই গ্রামেই সাইবার অপরাধীদের সব থেকে বেশি বসবাস। এই মুহুর্তে এমন কোন রাজ্যের পুলিশ হয়তো নেই যাদের একবারও পা পড়েনি কর্মাটাঁড় গ্রামে। জেলা পুলিশ সূত্রে খবর, এই গ্রামের অন্তত ৭০ শতাংশ বাড়িতে বিভিন্ন ব্যবসার আড়ালে চলে ব্যাঙ্ক প্রতারণার কারবার। যা সাইবার ক্রাইম বা ব্যাঙ্ক জালিয়াতি এই গ্রামের কার্যত কুটিরশিল্প। সাম্প্রতিক কালে কর্মাটাঁড়েরই ঝিলুয়া এলাকাতে অভিযান চালিয়ে অসংখ্য অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ। এদিন সেই কুখ্যাত ঝিলুয়া এলাকাতে যেতেই চোখে পড়ল চারিদিকে ঘনঘন বাঁশঝাড়, জঙ্গল ও ফাঁকা জমি। গোটা গ্রামে বেশিরভাগই গায়ে আল্পনা আঁকা মাটির বাড়ি। প্রায় সব বাড়িতেই গোয়াল ঘরে গরুর উপস্থিতি চোখে পড়ে। বাড়ির দেওয়ালে ঘুটে দিতে ব্যস্ত গৃহিণীরা। বেশিরভাগই কাঁচা ও ছোট ছোট বাড়ি। বাড়ির জানালা গুলি তুলনামূলক অনেকটা ওপরে, ভীষণ ছোট। অধিকাংশ রাস্তাতেই ছাগল ও মুরগি চড়ে বেড়াচ্ছে।

কলকাতা পুলিশের এক আধিকারিকের কথায়, “আপাত দৃষ্টিতে দেখতে অতি সাধারণ ওই বাড়ি গুলোই সাইবার ক্রাইমের আঁতুড়ঘর। বাইরে থেকে দেখে বিন্দুমাত্র বোঝার উপায় নেই কোন বাড়িতে বসে মাত্র একটি ফোন কলেই কোটি কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে নিমেষে। বাইরে বিলাসবহুল জীবনযাপন করলেও পুলিশের সন্দেহ এড়াতে এরা এমন বাড়িতেই থাকে”। আরেক তদন্তকারী আধিকারিক জানান, “এমন বাড়ি হওয়ায় বাড়িতে পুলিশ পড়লেই সহজে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় অভিযুক্তরা। আবার চট করে কিছু লুকিয়েও ফেলা যায় যত্রতত্র। ফলে আমাদের অভিযুক্তকে পাকড়াও করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়।” পুলিশ সূত্রে খবর, এই গ্রামের একাধিক ফাঁকা জমি, কালভার্ট, বাঁশবাগান, জঙ্গল ও ঝোপঝাড়ই দিনের বেলায় হয়ে ওঠে বিভিন্ন ‘ব্যাঙ্কের হেড অফিস’। এই সব জায়গাতেই দলবেঁধে বসে ব্যাঙ্ক কর্মীর পরিচয় দিয়ে প্রতারণার জাল বোনে সাইবার অপরাধীরা। এক নিমেষে লুঠ করে নেয় সাধারণ মানুষের কষ্টে অর্জিত কোটি কোটি টাকা। এদিন ঝিলুয়া এলাকায় ঘুরতে গিয়ে আখেরেই চোখে পড়ল অদূরে ঝোপঝাড়ে কোলে ল্যাপটপ ও গাদাগুচ্ছের মোবাইল হাতে নিয়ে গোল হয়ে বসে থাকা যুবকদের একাধিক গ্যাং। দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে ক্যামেরা বন্দি করা গেলো কোনক্রমে। কাছে গেলেই হয়তো কানে ভেসে আসতো, “নমস্কার স্যার, আপনার ব্যাঙ্কের হেড অফিস থেকে বলছি…….।”
চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here