galpo

সকাল থেকে আকাশের মুখভার ছিল অবোধ শিশুর মতো। বকুনি খাওয়ার পর গুমরে থাকা আর একটু আদর পেলেই সব জমাট বাঁধা আবেগ যেমন কান্না হয়ে ঝরে পড়ে অঝোর ধারায়, তেমনি করে বিকেলের পর থেকে শুরু হয়েছে মুষলধারায় বৃষ্টি। কোন মনভুলানো ছলনায় যেন সে ভুলবে না পণ করেছে। এমন দিনে বাইরে বেরনো, নিতান্ত জরুরি না হলে কেউ বেরয় না। ঘরে বসে হাল্কা চাদর মুড়ি দিয়ে আড্ডা জমানোটাই দস্তুর।
প্রেমিক থাকলে না হয় তার সাথে বৃষ্টি ভিজে রোমান্স করা যায়, বৃষ্টি তো তখন বৃষ্টি থাকে না, গলেপড়া মণিমুক্তো হয়ে যায়… কিন্তু বিভুঁইয়ে তেমন প্রেমিক জোটা কেবল দুষ্করই নয়, অসম্ভব বলা চলে। রাকা কিংবা নেহার সেসবের বালাই ছিল না। তাই দুই বান্ধবীতে মিলে ঘরের বাইরে প্রায় পা রাখেনি বললেই চলে। রাকার খুব তেলেভাজা-মুড়ি খেতে ইচ্ছে করলেও, নিজেদের বানিয়ে খেতে হবে বলে সে ইচ্ছেকে মাথা তুলতে দেয়নি।
কিন্তু খালিপেটে তো আর আড্ডা চলে না।
দুপুরে চালেডালে খিচুড়ি বানিয়েছিল, অনেক্ষণ পেট ভরা ছিল। এখন আবার রাতের খাবারের ভাবনা তো ভাবতে হচ্ছে। তাই যেটুকু সবজি ছিল, ইচ্ছে না থাকলেও সন্ধের পর তাই দিয়ে একটা মিক্স সবজি আর রুটি বানিয়েছে দু’জনে।
রাকা, জুনি আর নেহা পেয়িং গেস্ট থাকে পুণে শহরের একপ্রান্তে একটা বাড়িতে। ঘর বলতে বারো বাই চোদ্দোর একটা রুম। তিনটে সিঙ্গল না-চৌকি না-খাট গোছের তক্তপোষ, সঙ্গে একটা একটা করে ছোট কাঠের আলমারি। চৌকিগুলো এমন করে পাতা, মাঝখানে খানিকটা জায়গা ফাঁকা পাওয়া যায়। ওখানেই ওদের খেতে বসা, পড়তে বসা, আড্ডা দেওয়া।

galpoনেহা ইউপির মেয়ে, রাকা বাঙালি আর জুনি হায়দরাবাদের। তারা এখানে পড়াশুনার জন্য এসেছে প্রায় একবছর হয়ে গেল… বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে তিনজনের। বাড়িওয়ালা ভাইয়া-ভাবিজি মিশুকে ভালমানুষ আর নির্ঝঞ্ঝাট। তাই রাকাদের থাকতে কোনও সমস্যা হয় না।
জুনি দু’দিন হল বাড়ি গেছে। সপ্তাহখানেক বাদে ফিরবে। ও নেই বলে আড্ডাটা যেন জমে উঠছিল না। ওই পিয়ারা কেটে লবণের পাশাপাশি সামান্য লঙ্কাগুঁড়ো দিলে যেমন স্বাদটা অতুলনীয় হয়ে ওঠে, তিনজনের আড্ডাটা ঠিক তেমনি জমে। রাতের খাবার খেতে বসে তাই জুনির আলোচনাই করছিল ওরা।
এমন সময় বাইরের গেটে জোরে জোরে কেউ ধাক্কা দিচ্ছে মনে হল। দু’জন গল্প থামিয়ে একটু ভাল করে শোনার চেষ্টা করে।
ধাক্কাটা বেশ জোরেই দিচ্ছে বৃষ্টির আওয়াজ ভেদ করে শোনা যাচ্ছে… ঘড়িটা দেখে নেয়, পৌনে দশটা। বৃষ্টির বেগ একটু কমেছে বটে, কিন্তু এখন এই পৌনে দশটার সময় এ বাড়িতে কে আসবে! নিশ্চয় কোনও বিপদে পড়েছে কেউ, দু’জনেই বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। বাইরের গেটটা ওদের রুমের পাশের কমন প্যাসেজ দিয়েই যেতে হয়। ‘ম্যায় দেখতি হুঁ’ বলে শেষ রুটির টুকরোটা সব্জি সহ মুখে চালান করে, তাড়াতাড়ি রান্নাঘরের বেসিন থেকে হাত ধুয়ে আসে নেহা। দরজা খুলে বাইরের গেটের দিকে এগোয়। ওর একা যাওয়া ঠিক হবে না ভেবে খাবার ফেলে পিছু পিছু উঠে আসে রাকা। দোতলার ঘরে ভাইয়া-ভাবি টিভি দেখছে… তাই তাঁরা বোধ হয় আওয়াজ পাননি।

গেটে তালা দেওয়া… কিন্তু ছোট একটা ফাঁকা রাখা আছে, সেখান থেকে বাইরের লোকজনকে দেখা যায় কিংবা কথা বলা যায়। বাইরের স্ট্রিট লাইটের আলোয় রাকা দেখাল একটা রোগাপাতলা চেহারার মেয়ে খুব অস্থিরভাবে বৃষ্টির মধ্যে বাইরে দাঁড়িয়ে… মাথার চুল গায়ের পোশাক মোটামুটি ভিজে উঠেছে।
রাকা পেছনে দাঁড়িয়ে ওদের কথোপকথন শুনল… বাংলা করলে এরকম হয়-
– কে আপনি? কাকে চাই?
–দরজাটা খুলবেন একটু প্লিজ। খুব বিপদে পড়েছি… এখানে আমার কেউ নেই চেনাজানা… দিন-তিনেক থাকতে দেবেন প্লিজ।
নেহা একটু ইতস্তত করে বলে– থাকবেন!! কোথা থেকে আসছেন? আচ্ছা একটু অপেক্ষা করুন। ভাবিকে ডেকে আনি। রাকা আর একবার ভাল করে মেয়েটাকে দেখে নিয়ে নেহার সঙ্গে চলে যায়।
ভাবিকে সব কথা বলে ডেকে নিয়ে আসে।
মেয়েটার অনেক অনুরোধের পর সবাই আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়, জুনির সিটটা ফাঁকা আছে… ওটাতেই থাকবে তিনদিন। ‘প্রথমে উটকো ঝামেলা মনে হলেও দু’-তিনদিন নতুন বান্ধবী পাওয়া যাবে ভেবে ভালই লাগে তাদের।
মেয়েটা ঘরে আসে ওদের সাথে… ধন্যবাদ জানায় সবাইকে। এবার ঘরের আলোতে ভাল করে দেখতে পায়। কাঁধ অবধি কোঁকড়া চুল… ফর্সা গায়ের রং। মুখটার ছাঁদ একটু অদ্ভূত… নাকটা টিকালো… কিন্তু মাঝ বরাবর কেমন যেন চূড়ার মতো হয়ে আছে মুখটা, তবে দেখতে ভালই। চোখ দুটো সামান্য কটা।

রাকা আর নেহার খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, তাই ভাবিজিই মেয়েটার জন্য রুটি-তরকারি পাঠিয়ে দেন।
রাত হয়ে গেছে… বৃষ্টি বাইরে… তাই বেশি আলাপ-পরিচয় এগোয় না… তিনজন শুয়ে পড়ে। নেহার খাটের পাশের জানালাটার কাচ একটু ভাঙা… সারানো হয়নি। শোয়ার সময় ওই জায়গায় আড়াল দেওয়া কাগজটাকে গ্রিল বরাবর একটু ভাল করে সেট করে দেয়। সরে গেলে জোরালো বৃষ্টির ঝাপটা আসতে পারে তাই।
সকালে ঘুম থেকে উঠে মেয়েটার সাথে আলাপ করার সময় হয় না, ওদের ক্লাসে যাওয়ার তাড়া। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে খেয়ে বেরিয়ে যায়। বিকেলে ফিরে আসে যখন, মেয়েটা খাটের উপর বসে একটা ম্যাগাজিন পড়ছিল। ওদের দেখে বলে– ‘হাই’!
ওরাও এবার ফ্রেশ হয়ে গল্পে বসে যায়।
মেয়েটার নাম মায়া…কাশ্মীরের মেয়ে। বাড়িতে কেবল সে আর তার বাবা। বাড়িটা প্রায় একটা ফার্ম হাউসের মতো। বিভিন্ন ধরনের পশু প্রতিপালন করে। মেয়েটা এও বলে, তার প্রিয় হল সাপ। সাপগুলোকে নিজে দেখভাল করে… খেতে দেয়… আদরও করে সে। সাপগুলোও তার ভীষণ অনুগত… হাতেপায়ে জড়িয়ে আদর প্রকাশ করে।
রাকার গা-টা কেমন গুলিয়ে ওঠে। চেপে রাখতে না পেরে বলে– অন্য পশু রাখো রাখো, তা বলে সাপ! ইসস্ ছ্যা ছ্যা…
রাকা স্পষ্ট দেখল মেয়েটার চোখ দপ করে জ্বলে উঠল। তারপর কঠিন স্বরে বলল– ‘সাপ মোটেও ঘৃণার প্রাণী নয়, আমি খুব ভালবাসি ওদের। আর কখনও ওসব বলো না। আমার ভাল লাগে না।’

galpoরাকা কেমন ঘাবড়ে যায়। অপ্রস্তুত মুখে বলে–‘ওকে, সরি।’
ওরা প্রসঙ্গান্তরে চলে গিয়ে মায়ার আসার কারণ জানতে চায়। কিন্তু তাতে যা বলে, কথাগুলো ঠিক সামঞ্জস্যপূর্ণ না লাগলেও বেশি কিছু জিগ্গেস করা যাচ্ছে না। অশোভনীয় দেখায়। তাছাড়া রাকার কেমন ভয়-ভয় করে ওকে।
মাঝরাত্তিরে একটা অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে যায় রাকার। অন্ধকারে থাকতে থাকতে অন্ধকারটা তরল হয়ে যায় আর চোখটাও সয়ে আসে। তাই অন্ধকারের সেই ঘনত্বটা হালকা হয়ে গেছে। চোখ ফেরাতে দেখে, জুনির বিছানাটা, মানে যেটায় ওই নতুন মেয়েটা শুয়েছিল, সেটা ফাঁকা।
বাথরুমে গেছে ভেবে চুপচাপ শুয়ে থাকে রাকা, অনেকক্ষণ হয়ে গেলেও ফিরছে না দেখে আস্তে আস্তে মাথাটা ঘুরিয়ে দরজার দিকটায় তাকায়। বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়… ছিটকিনিটা যেমন বন্ধ ছিল ভেতর থেকে, তেমনই আছে। চোখে একটা তীব্র আলো এসে লাগে। ওই ভাঙা জানালাটার কাগজটা সরানো। নেহাকে ডাকতে গিয়েও গলা থেকে স্বর বেরয় না। রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে করতে কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়াল নেই।

সকালে ঘুম ভাঙতেই প্রথম তাকায় জুনির খাটটার দিকে। মায়া বসে বসে ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাচ্ছে। রাকার নড়াচড়ার আওয়াজে মুখ তুলে বলে– ‘গুড মর্নিং’।
রাকা কোনও রকমে বলে– ‘গুড মর্নিং’। ভেতরে ভেতরে ভয় করতে থাকে। উঠে বসে জিগ্গেস করে, ‘আচ্ছা, কাল রাতে তুমি কোথায় ছিলে? বিছানায় দেখতে পাইনি অনেকক্ষণ…’! হঠাৎ মায়ার চোখমুখ একঝলক বদলে গেল মনে হল, স্পষ্ট দেখতে পেল মুখের চামড়াটা জালিকাকার হয়ে উঠল… সারা মুখটা হালকা সবুজাভ আর চোখ দুটো সাদা। আঁতকে উঠতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল– ‘না মানে বাথরুমে গেছিলে বোধ হয়…’!
মেয়েটা মুচকি হেসে আবার ম্যাগাজিনে মন দিল।
রাকা ভাল করে দেখল এবার… না তো, মুখে কোনও পরিবর্তন নেই। আশ্চর্য! সে একটু আগে স্পষ্ট দেখেছে।
ইতিমধ্যে রেডি হওয়ার জন্যে নেহা তাড়া লাগায়।
একসাথে রাস্তায় বেরিয়ে নেহাকে রাতের ঘটনাটা বলে… এমনকী জানালার কাচের কাগজটা খোলা ছিল সেটাও জানায়। সকালে তার অস্বাভাবিক মুখাবয়বের পরিবর্তনের কথাটাও বাদ দেয় না।
নেহা ঠিক বিশ্বাস করে না। বলে, ‘রাতে ঘুমচোখে কী দেখতে কী দেখেছিস তার ঠিক নেই। আর রাতের ওই আতঙ্ক সকালে থেকে গেছিল বলে ভ্রমবশত ওরকম দেখেছিস।’
রাকা কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারল না। ভেতরে একটা আতঙ্ক আর জিজ্ঞাসা রয়ে গেল। বিকেলে ফিরে মেয়েটার সাথে রাকা আর বেশি কথা বলেনি, এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে। নেহা খুব স্বাভাবিক আচরণ করছে।
রাকা মনেমনে ভাবে, আজ রাতে সে আর কিছুতেই ঘুমাবে না। কী হয় দেখতেই হবে… ভুল সে দেখেনি, সেটা নেহার কাছে প্রমাণ করতে হবে। ও মেয়েকে স্বাভাবিক মনে হয়নি তার।

galpoসেদিন রাতে আবার খাওয়াদাওয়া করে শুয়ে পড়ে তিনজন। রাকা ঘুমায় না। চুপচাপ চোখ বন্ধ করে অপেক্ষা করে সময়ের। বেশি এদিক-ওদিক পাশ ফেরে না। মাঝেমাঝে আড়চোখে মেয়েটার বিছানাটার দিকে তাকায়, আবার চোখ বন্ধ করে নেয়। রাত আড়াইটা মতো হবে, আড়চোখে বিছানাটার দিকে তাকিয়ে দেখে বিছানা ফাঁকা। ঝটিতে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে, যথারীতি সেটা ভেতর থেকে লক। ভয়ে চাদরটা গায়ে জড়িয়ে উঠে বসে নেহাকে ডাক দেয়। দু’বার ডাকতেই নেহা উঠে পড়ে। রাকা আলোটা জ্বালিয়ে দেখতে বলে। নেহা আলো জ্বালিয়ে বিস্ফারিত চোখে বিছানাটার দিকে তাকিয়ে থাকে।
কেউ নেই… ঘর বন্ধ। রাকা চলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, গায়ের বেডশিটটা আরও জড়িয়ে নিয়ে সিটিয়ে বসে থাকে।
নেহা প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে দোতলা গিয়ে ভাবিজিকে ডেকে আনে। তিনজন অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে, শুধু জানালার ভাঙা কাচের অংশ থেকে কাগজের আড়ালটা সরানো।
সেদিন রাতে আর ঘুমায়নি তারা। ভাবিজি কথায় কথায় জানান, সেদিন শিবের পুজো ছিল, তিনি পুজো দিয়েছেন। কিন্তু মেয়েটার সাপ পোষা, এ বাড়িতে শিবের পুজো দেওয়া… এসবের মধ্যে কি আদৌ কোনও যোগসূত্র আছে? তা যদি না হয়, তবে মেয়েটা গেল কোথায়? ওইটুকু ছোট একটা ফাঁকা অংশ দিয়ে কীভাবে বেরোনো সম্ভব? একসময় ভাবল কোনও ভ্রম হচ্ছে তাদের, মেয়েটা হয়তো আগের দিনের মতো ফিরে আসবে। নাহ ফিরে আসেনি সে।
কোথায় গেল? কেন গেল? কীভাবে গেল? এমন অনেক রহস্যময় প্রশ্ন রেখে অলৌকিকভাবে চিরদিনের মতো হারিয়ে গেল মেয়েটা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here