নিজস্ব প্রতিবেদক, মেদিনীপুর: হুলা পার্টি, ইলেক্ট্রিক ফেন্সিং, খাদ্যের সংস্থান, লঙ্কার চাষ – সবই এখন হাড়ি তাড়াতে বিফল পদ্ধতি। জঙ্গলমহলে হাতি আটকাতে নতুন পদ্ধতি এখন জিআই তার। সরু অথচ মজবুত এই তার দিয়ে ঘিরে রাখা বেড়া হাতির নজরে ধরা দেয় না সহজে। অথচ হাতিকে জোরে আঘাত করার সমর্থ রাখে। প্রথমিক ভাবে সফলও হয়েছেন অনেকে। তাই কেজি কেজি জিআই তার কিনে গ্রামবাসীরা এখন নিজেদের মুড়িয়ে নিচ্ছেন হাতি থেকে বাঁচতে। আর এই পদ্ধতির আবিষ্কর্তা বনদফতর নয়, জঙ্গলমহলের লোকেরাই।

পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামে এই মুহুর্তে দুশোর বেশি বুনো হাতি রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। যারা এই দুই জেলার জঙ্গল থেকে যেতে চাইছে না কোন ভাবেই। এদের উপদ্রব আটকাতে হুলাপার্টি দিয়ে, ইলেকট্রিক ফেন্সিং, জঙ্গলের ভেতরে খাদ্যের সংস্থান, জঙ্গল সংলগ্ন জমিতে লঙ্কার চাষ করেও কোন লাভ হয়নি। সব কিছুকে পরাস্ত করে এই হাতির পাল রোজই কোন না কোন গ্রামে ঢুকে পড়ছে খাবারের সন্ধানে। প্রতিমাসেই গ্রামবাসীদের মরতে হচ্ছে হাতির হামলাতে। জঙ্গলের ভেতরে থাকা গ্রামগুলির বাড়িঘর ভেঙ্গে, বিদ্যালয়, অঙ্গনওয়াড়ী কেন্দ্রগুলিকেও ভেঙ্গে তছনছ করছে হাতির পাল। কারন সেখানে মিড ডে মিলের চালের খোঁজ করছে হাতিগুলি। চাঁদড়া রেঞ্জের অন্তর্গত জঙ্গলের পাশে থাকা বিদ্যালয় অঙ্গনওয়াড়ী কেন্দ্রগুলির বেশির ভাগই ভেঙ্গে ফেলেছে হাতি। বনদফতরের ব্যাখ্যা অনুসারে বলা যায়, এর পেছনে রয়েছে হাতির স্বাদ বদল ও হাতির সংখ্যা বৃদ্ধি। জঙ্গলের গাছ পাতা, এরপরে বনদফতরের তৈরী করা খাবার উদ্যান সবই খেয়ে সাবাড় করে ফেলেছে গজ বাহিনী। এসবই এক ঘেঁয়ে মনে করে প্রায়শই নতুন স্বাদের খাবারের খোঁজে লোকালয়ে ঢুকছে হাতি। বনদফতর ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কোন প্রতিরোধ, টোটকা কাজ করেনি। তাই নতুন পদ্ধতি জিআই তারের বেড়া।

লোহার সরু অথচ মজবুত এই তার দিয়ে জঙ্গলমহলের বাসিন্দারা বেশিরভাগই নিজেদের সম্পত্তি ও চাষকে বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলা শুরু করেছে। অনেকেই আবার এই তারে রাত হলেই বিদ্যুত সংযোগ দিয়ে দিচ্ছেন হাতিকে আটকাতে। কিন্তু মাঠের বেশির ভাগ এলাকাতে শুধু মজবুত খুঁটি দিয়ে জিআই তারের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলা হচ্ছে। এমন চিত্র, বাঘঘরা, ঝরিয়া, বেড়াপাল, শির্ষী, সুন্দরলাটা, কনকাবতী এলাকাগুলিতে হামেশাই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। চাঁপাশোলের বাসিন্দা ললিত মাহাতো জানালেন,’এই শক্ত লোহার তারগুলি ৪০ টাকা কেজি দরে কিনে আমিও চাষের জমিতে বেড়া দিয়েছি। হাতিরা এই তারগুলি রাতে বা বিকেলে বের হলে দেখতে পায় না। অথচ জমিতে ঢোকার চেষ্টা করলে অতর্কিত ভাবে জোরে আঘাত পায়। অনেকেই লাগিয়ে সফল হয়েছে।’ শুধু চাষের জমিতেই নয়, গ্রামের অনেকেই বাড়িঘর গুলিকেও নিরাপদ করতে সরু এই তারের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলেছেন। বেড়াপাল গ্রামের বাসিন্দা মদন সরেন জানালেন,’রাতের বেলা এই তারে ধাক্কা লাগলে বিদ্যুতের শকের কাজ করে হাতিদের ক্ষেত্রে। অনেকে তো সত্যিকারের বিদ্যুৎ ও লাগিয়ে দেন রাতে। এখন সকলের ভরোসা এটাই।’ বনদফতরে মেদিনীপুর ডিভিশনের ডিএফও রবীন্দ্রনাথ সাহা জানিয়েছেন,’শুধু তার দিয়ে রক্ষা করতে চাইলে ঠিক আছে, কিন্তু বিদ্যুৎ দিয়ে বেড়া দেওয়ার চেষ্টা করলে সেটা বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াবে। পাশাপাশি এই পদ্ধতি বেআইনিও। তাছাড়া গ্রামের বাচ্ছা ছেলেমেয়েরা খেলতে গিয়ে বা আনমনে হাত দিয়ে ফেললে বড় রকমের বিপদ হতে পারে। তাছাড়া বড়রাও নিজেরাই আনমনে শক খেতে পারেন। আমরা খোঁজ নিয়ে ব্যাবস্থা নিচ্ছি।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here